শম্পা দেব
কমলা অনেক কষ্টে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে দিনযাপন করছে। সুবল গিয়েছে বেঙ্গালুরু কাজের সন্ধানে। প্রথমদিকে তো বেশ ভালোই চলছিল, কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসারে দুর্যোগ নেমে এল। সুবল অনেক জায়গায় ছোটাছুটি করল কাজের জন্য, কিন্তু তার আগেই অন্যরা লাইন দিয়ে রয়েছে। তার নম্বর আসতে দেরি আছে।
কমলা বলেছিল, আমি কয়েকটি জায়গায় কাজ নিয়ে নিই। কিন্তু সুবলের আপত্তি। বলে, দেখ, কমলা, আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু তাই বলে বাবুদের বাড়িতে বাসন মাজবি, আর বাবুরা চোখ দিয়ে চেটে খাবে, তা আমি সহ্য করতে পারব না। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হয়। কমলা বলে, খেতে দিতে পারো না, আর মরদগিরি!
ছেলেমেয়ে দুটোর স্কুল থেকে নাম কেটে যায়। সুবল বলে, কমলা, আমি বেঙ্গালুরু যাব। সেখানে অনেক কাজ আছে।
পাড়ার মদনদা বলল, তার দাদার ছেলে বেঙ্গালুরু গিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করছে, যেন দেখা করে। তারপর সুবল কাজের সন্ধানে বেঙ্গালুরু চলে গেল।
সামনে নতুন বছর আসছে। কমলা মনে মনে ভাবে, গত বছর এই দিনে কত আনন্দ করেছিল! কারখানায় যা বেতন পেত, সুবল পুরোটাই কমলার হাতে তুলে দিত। তার থেকে অল্প টাকা লক্ষ্মীর ঘটে জমিয়ে জমিয়ে এই চৈত্রসংক্রান্তির দিন সেটা ভেঙে ছেলেমেয়ের জন্য সস্তায় চৈত্র সেলে জামা, সুবলের জন্য শার্ট নিয়ে আসত। পয়লা বৈশাখ সুবলকে পাঠাত অল্প মাংস নিয়ে আসতে। সেদিন বাচ্চা দুটোর যে কী আনন্দ হত! সেসব কথা ভেবে কমলার চোখে জল এসে যায়।
একদিন রাতে প্রবল ঝড়-তুফান হতে থাকে। মেঘের গর্জনে কমলা বাচ্চাদের নিয়ে জাপটে বসে থাকে। ঘরের ফুটো চাল থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে ঘরে। ঝড়ের দাপটে অনবরত দত্তদের বাড়ির গাছ থেকে কচি আমগুলি টুপটাপ করে কমলার চালে পড়ছে।
ভোরের দিকে ঝড় থেমে আসে। কমলা বাইরে এসে দেখে চারদিক জলে থইথই। তারই মধ্যে তাড়াতাড়ি আমগুলি কুড়িয়ে নেয়। দত্তগিন্নি জেগে গেলে সব আম নিয়ে যাবে। পাড়ার সব ধনী বাড়িতে এই আম বিলোবে। কমলা একটিও পাবে না।
কমলা মনে মনে ভাবে, আজ আম দিয়েই টক বানিয়ে চৈত্রসংক্রান্তি পালন করবে। কিন্তু কাল বছরের প্রথম দিন ছেলেমেয়ে নুনভাত খাবে! এসব ভাবতে ভাবতে কমলা ঝাড়ু দিয়ে ঘরের জল সরাতে থাকে। তারপর স্নান করে এসে গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেয়ে খুলে দেখে, সুবল দু’হাত ভর্তি জিনিস নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
পয়লা বৈশাখ ছেলেমেয়ে নতুন জামাকাপড় পরেছে। সুবলও নতুন শার্ট পরেছে। আর কমলা সুবলের দেওয়া লাল টুকটুকে শাড়ি পরেছে। সবাই মিলে মাংস-ভাত খাচ্ছে। কে বলে, গরিবের ঘরে আনন্দ নেই! বসুন্ধরা এই দিনটিতে কাউকে বিমুখ করেন না।

