ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
স্বপ্ন মানুষের জীবনকে প্রলম্বিত করে। বেঁচে থাকার রসদ সরবরাহ করে। যে সমাজ স্বপ্ন দেখে, তা এগিয়ে চলে। আর স্বপ্নের রঙে, চিন্তার গভীরতায় ও বাক-অভিব্যক্তির শিল্পরসে যে মাধ্যম নিজেকে গড়ে তোলে, তার নাম ম্যাগাজিন। ‘mahashorgol.com’ হল সেরকম একটি প্রমিসিং ই-ম্যাগাজিন। এখানে একদিকে যেমন সময়ের প্রতিবিম্বিত চিত্র তুলে ধরে সমাজ-দর্পণের আদর্শ নজির চিত্রিত হয়, তেমনই ভবিষ্যতের নির্মাণের পথেও এক আশাপ্রদ পদসঞ্চারের ইঙ্গিতবাহী। সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজ, সংস্কৃতি ও মননের সুনিপুণ সংমিশ্রণে নির্মিত একটি সজীব মাধ্যম, যা যুগের সঙ্গে কথা বলে, মানুষের আত্মাকে স্পর্শ করে। এই অনলাইন পত্রিকাটি সে মহৎ অভিপ্রায়কে ধারণ করে জন্ম নিয়েছে। এটি কেবল একটি প্রকাশনা নয়, বরং অন্তরঙ্গ আত্মিক যাত্রার দলিল। প্রতিটি সংখ্যা, প্রতিটি লেখা, প্রতিটি ছবি বা কলাকৌশল যেন এই অস্থির, দ্রুত বদলে যাওয়া জগতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে ভাবার একটা জায়গা করে দেয়। পাঠকের মননে আলোড়ন তোলে, আলো দেয়, আবার প্রশ্নও তোলে। এ ম্যাগাজিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার সাংস্কৃতিক বিবেক। আধুনিকতা ও প্রাচীনতার সেতু রচনা করে, এটি যেমন স্থানিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে আনে, তেমনই বৈশ্বিক চিন্তাকে গ্রহণ করে এক পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
mahashorgol.com-এর বিভিন্ন পোস্টে বর্তমান সময়ের নানা বিষণ্ণ অনুভব ফুটে উঠলেও এটি রাজনৈতিক দূষণমুক্ত, তবে আমজনতার অনুভবকে স্পর্শ করার এক অদম্য ইচ্ছায় পরিচালিত। এখানে স্থান পেয়েছে প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, স্মৃতিকথা, চিত্রকলার আলেখ্য এবং তরুণ ও বরিষ্ঠ লেখকদের অভিজ্ঞতার দিনলিপি। লেখাগুলি দার্শনিকতায় ভরপুর এবং সময়ের সাক্ষী। এ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগ প্রতিনিয়ত যে শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। প্রতিটি লেখা নির্বাচনের পিছনে যে মননের সূক্ষ্মতা কাজ করেছে, প্রতিটি অলংকরণের পিছনে যে শিল্প অভিব্যক্তি রয়েছে, তা পাঠকের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে বলেই বিশ্বাস করি। সম্পাদক ও লেখকদের সমবেত প্রয়াসই mahashorgol.com-এর বিভিন্ন পোস্টকে অনন্য করে তুলেছে। এ পত্রিকা শুধু কিছু পাঠযোগ্য উপস্থাপন নয়, বরং এটি বৌদ্ধিক মননের এক পরীক্ষাগার, সংস্কৃতির এক খোলা মঞ্চ, সমাজের নীরব ব্যথার এক সরব দলিল।
পাঠকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সঙ্গে এখানে প্রকাশিত লেখাগুলির মেলবন্ধন ঘটাতে পারেন। একটি লেখা পড়ে মনে হয়, ‘এই কথাগুলি তো আমিও ভাবছিলাম!’ আর সে ভাবনার সেতু তৈরি করতে mahashorgol.com প্রকৃত অর্থেই শোরগোল তুলে নিজের দায়িত্বে সফল হয়েছে। আশা করা যায়, এ পোর্টালের ভবিষ্যৎ পোস্টগুলি আরও গভীর, আরও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ, আরও বহুমাত্রিক হবে। আজকের দুনিয়ায়, যেখানে তথ্যের গতি প্রবল, অথচ মননের শ্লথ, সেখানে এ ধরনের পত্রিকা সত্যিই এক আশার আলো। এটি কেবল একটি ম্যাগাজিন নয়, বরং বোধ, মনন, স্পন্দন।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পাঠ সংস্কৃতিতেও এসেছে বিপুল পরিবর্তন। ছাপার কালি আর কাগজের গন্ধের নস্টালজিয়া আজ ডিজিটাল পরদার উজ্জ্বলতায় রূপান্তরিত। সে পরিবর্তনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রূপ হল অনলাইন ম্যাগাজিন বা ই-ম্যাগাজিন। এটি শুধু ছাপা ম্যাগাজিনের বিকল্প নয়, বরং এক নবতর পাঠ আঙ্গিক। অনলাইন ম্যাগাজিনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, যে কোনও সময়, যে কোনও স্থান থেকে সহজে পড়ার সুযোগ। শুধু একটি স্মার্টফোন, ট্যাব বা কমপিউটার থাকলেই পাঠক মুহূর্তে বিশ্বসাহিত্য, প্রবন্ধ, কবিতা বা সমকালীন আলোচনার নাগাল পেয়ে যান। অফিসে বসে, ট্রেনে যাত্রাকালে অথবা অবসরকালে একটি ক্লিকেই পছন্দের লেখা হাতে চলে আসে। এভাবে অনলাইন ম্যাগাজিন সময় সাশ্রয়ী এবং পরিস্থিতি সহায়ক। প্রিন্ট ম্যাগাজিন তৈরিতে প্রচুর কাগজ, কালি, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণ লাগে। এ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় হয়, বনাঞ্চল ধ্বংস হয়। অনলাইন ম্যাগাজিন এ ক্ষতির বড় অংশ রোধ করে। এটি পরিবেশবান্ধব, কারণ কাগজবিহীন (paperless), ছাপার খরচ নেই, বর্জ্য নেই। এ কারণে বর্তমান সময়ের পরিবেশ সচেতন সমাজের কাছে ই-ম্যাগাজিন আরও বেশি গ্রহণযোগ্য। অনলাইন ম্যাগাজিনে যে কোনও লেখায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তন, আপডেট বা সংশোধন আনা যায়, যা প্রিন্টের ক্ষেত্রে একবার ছাপার পর আর সম্ভব হয় না। প্রিন্ট ম্যাগাজিন ছাপাতে যা খরচ হয়, অনলাইন ম্যাগাজিনে তার তুলনায় খরচ অনেক কম। লেখকদের লেখাও দ্রুত পৌঁছয় বিশাল পাঠকগোষ্ঠীর কাছে। আন্তর্জাতিক পাঠকরাও সহজেই পড়তে পারেন, যেখানে ছাপা ম্যাগাজিন পৌঁছনো কঠিন। এর ফলে অনলাইন ম্যাগাজিন গ্লোবাল পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে ওঠে।
mahashorgol.com নতুন লেখকদের জন্য এক সুবৃহৎ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। লেখা প্রকাশ করা তুলনামূলকভাবে সহজতর হয়েছে। আর এর মস্ত সুবিধা হল, একবার অনলাইনে প্রকাশিত হলে লেখাটি সহজেই সংরক্ষণযোগ্য। ভবিষ্যতে যে কোনও সময় তা পাওয়া যায়। গুগল সার্চ, লিংক শেয়ারিং ইত্যাদির মাধ্যমে তা বহু পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। প্রযুক্তির যুগে এই অনলাইন ম্যাগাজিনটি নিঃসন্দেহে এক আশ্চর্য সম্ভাবনার নাম। এটি কেবল পাঠের মাধ্যম নয়, বরং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অংশ, যেখানে কণ্ঠস্বর মুক্ত হয়, পাঠক হয়ে ওঠেন সক্রিয় সঙ্গী, আর লেখালেখি ছড়িয়ে পড়ে সীমাহীন আকাশে। এ কারণে পত্রিকার জন্মদিনে (১৫ আগস্ট) তার দীর্ঘায়ু কামনা করি। mahashorgol.com রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিকল্প ভাবনার এক মোহময় আবেদন তৈরি করুক, এটাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি।
