Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

মহাকুম্ভে অন্যরকম শাহিস্নান

Share Links:

কাজল মুখার্জি

প্রয়াগরাজে ত্রিবেণী সঙ্গমের মহাকুম্ভে তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে মন্ত্রোচ্চারণ, কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ আর ভক্তদের ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি। চারপাশে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল। সাধু সন্ন্যাসীরা, সাধারণ মানুষ, নামী-দামি ব্যক্তিত্ব, সকলেই মহাকুম্ভের অমৃতযোগে স্নান করে পাপমুক্ত হয়ে পুণ্যলাভের আশায় সমবেত হয়েছেন। মহাকুম্ভের জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে চলেছেন স্নানার্থী শ্যামলী দেবী, আর তাঁর হাত ধরে পাশাপাশি চলেছে একমাত্র কিশোর সন্তান, বিশেষভাবে সক্ষম অরুণ।

অরুণ জন্ম থেকেই দিব্যাঙ্গ। সে ভালো করে কথা বলতে, মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না। তার বুদ্ধির স্বাভাবিক বিকাশ ঘটেনি। তবে তার চোখ দুটো যেন বলে দেয়, সে বোঝে, অনুভব করে। শ্যামলী দেবী অরুণকে নিয়ে এই মহাকুম্ভে এসেছেন। তাঁর একমাত্র ইচ্ছে, অরুণকে মহাকুম্ভে ত্রিবেণী সঙ্গমের পবিত্র জলে স্নান করাবেন। জীবনের সব কষ্ট, অপমানের পর অন্তত মহাকুম্ভে একটিবারের জন্যও যেন তাঁর ছেলে স্নান করতে পারে।

কিন্তু প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভে মানুষের বিশাল ঢল দেখে শ্যামলী দেবী রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলেন। এত মানুষের ভিড় ঠেলে কীভাবে তিনি তাঁর সন্তানকে নিয়ে মহাকুম্ভে ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান করবেন!

কোনওভাবে ভিড়ের স্রোতের মধ্য দিয়ে ত্রিবেণী সঙ্গমের কাছে যাওয়ার পর কিছু মানুষ তাঁদের লক্ষ করছিলেন। কেউ কেউ অবাক দৃষ্টিতে অরুণের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলেন কয়েকজন, ওই বৃদ্ধা এরকম দিব্যাঙ্গ ছেলেকে নিয়ে কুম্ভ স্নানে এসেছেন!

কয়েকজন তো সরাসরি বিরক্তির স্বরে বলেই ফেলেছিলেন, এমন অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে এখানে আসার দরকার কী ছিল?

এ কথা শ্যামলী দেবীর কাছে নতুন কিছু নয়। সারাজীবন তিনি এভাবেই মানুষের কটাক্ষ সহ্য করেছেন। কিন্তু আজ তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল। তিনি কি ভুল করেছেন এত কষ্ট সহ্য করে এখানে এসে? তিনি কিন্তু পিছিয়ে গেলেন না। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললেন, আমি শুধু চাই, অরুণ যেন যেভাবেই হোক এই মহাকুম্ভে স্নান করতে পারে। দিব্যাঙ্গ বলে মহাকুম্ভে স্নান করার অধিকারটুকুও কি তার নেই!

শ্যামলী দেবী ভিড় ঠেলে এগোতে গিয়ে হোঁচট বারবারই হোঁচট খাচ্ছিলেন। বয়সের ভারে শরীর দুর্বল। তবে অরুণকে শক্ত করে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন।

ওই ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ একটি হাত অরুণের কাঁধ ধরল। মা, আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

শ্যামলী দেবী তাকিয়ে দেখলেন এক মাঝবয়সি মানুষ। সাদা ধুতি, কপালে চন্দনের তিলক, চোখে শান্ত দৃষ্টি। তিনি কিছু বলার আগেই লোকটি বললেন, মহাকুম্ভে ঈশ্বরের কৃপা সবার জন্য, মা। আপনার ছেলেও নিশ্চয়ই তাঁর আশীর্বাদ পাবে। তারপর তিনি অরুণের হাত ধরে জলে নামলেন স্নানের জন্য।

ত্রিবেণী সঙ্গমের ঠান্ডা জল গায়ে লাগতেই অরুণের মুখটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এক নিষ্পাপ শিশুর মতোই তার ঠোঁটে হাসি ফুটল। চোখ দু’টি বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। শ্যামলী দেবীও জলে নেমে তখন ছেলেকে কাছে নিয়ে তার হাত ধরে ত্রিবেণী সঙ্গমের জলে ডুব দিলেন। তিনবার ডুব দেওয়ার পর তিনি যখন উঠলেন, তখন তাঁর মনে হল, যেন শরীর আর মনের সমস্ত ক্লান্তি কোথায় হারিয়ে গিয়েছে আজ আর কিছু চাওয়ার নেই তাঁর। তাঁদের পাশ থেকে একজন যেন বলে উঠলেন, আজ মহাস্নান দেখলাম!

শ্যামলী দেবী তাকিয়ে দেখলেন, যাঁরা একটু আগে নানারকম কথা বলছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকেই একজন কথাটা বললেন।

শ্যামলী দেবী জল থেকে উঠে অরুণের ভেজা শরীরটা পরম যত্নে মুছে দিলেন। আজ তিনি তৃপ্ত। মহাকুম্ভে তিনি আর অরুণ স্নান করতে পেরেছেন, এটাই তাঁর কাছে অনেক প্রাপ্তি। তিনি ধীরে ধীরে অরুণকে নিয়ে ফেরার পথ ধরলেন। উপস্থিত অনেকেই শ্যামলী দেবী আর অরুণের আজকের মহাকুম্ভ স্নানের সাক্ষী হয়ে থাকলেন।

এক মা তাঁর বিশেষভাবে সক্ষম সন্তানের জন্য সব বাধা-বিপত্তি, ভয় কাটিয়ে মহাকুম্ভে নিয়ে এসে তাকে স্নান করালেন। এটাও তো মহাকুম্ভের শাহিস্নান, অন্তত তাঁদের কাছে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

নববর্ষ

একুশে ফেব্রুয়ারি

গদ্যের বারান্দা ৪৩-৬০

গদ্যের বারান্দা ৪২

গদ্যের বারান্দা ৪১

গদ্যের বারান্দা ৪০

প্রিন্টআউট

গদ্যের বারান্দা ৩৬-৩৮

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল শিখা দীপ মুখোপাধ্যায়

গদ্যের বারান্দা ২৬-৩৫