সুদীপনারায়ণ ঘোষ

ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে চলে যেতেই হত একদিন না একদিন। তাদের ভারত ছাড়ার মুখ্য উৎপাদক (Factor) ছিল বিশাল ভৌগোলিক দূরত্ব, সম্পূর্ণ বিপরীত জলবায়ু এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক পার্থক্য। অত দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা এক দুরূহ কাজ। যেসব ব্রিটিশ নাগরিক এখানে আসতেন, তাঁরা এসেই পালাই পালাই করতেন। বেশিরভাগ ব্রিটিশ আধিকারিক ও কর্মচারী পরিবার সঙ্গে আনতেন না। তাঁরা একাকীত্ব ও হোম সিকনেসে ভুগতেন। তাঁদের এখানে যাতায়াত ও রাহাখরচ বিপুল ছিল। তার ওপর তাঁরা প্রতিবছর চার-পাঁচ মাস ছুটি কাটাতে স্বদেশে যেতেন। কয়েক বছর কাজ করার পর চাকরি থেকে অব্যাহতি চাইতেন। একবার ছাড়তে পারলে আর এমুখো হতেন না।
পক্ষান্তরে ভারতীয়রা অনেক কম মাইনেতে কাজ করতেন, অনেক বেশি প্রভুভক্ত হতেন, আর চাকরি ছাড়তেন না। ব্রিটিশরা প্রমাদ গুনল সিপাই বিদ্রোহের পর। শুরু হল অবিশ্বাস। ভারতীয়রা ইতিমধ্যে ইউরোপীয়দের বৌদ্ধিক অর্জনের অংশীদার হয়ে নবলব্ধ জাতীয়তাবাদী বোধে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসের গৌরবের উত্তরাধিকারী হিসাবে নিজেদের আত্মগরিমাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছিলেন। নিজেদের জন্য আরও সামাজিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার দাবি করছিলেন। বাংলায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহারাষ্ট্রে তিলক প্রমুখ এর প্রধান মুখ ছিলেন। সুরেন্দ্রনাথের ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের চূড়ান্ত পরিণতি ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। এই মুক্ত মঞ্চ শাসকের থেকে নানা দাবি আদায় করতে থাকে সংসদীয় পথে। আবেদন-নিবেদন, তদ্বির-তদারকির মাধ্যমে তারা সংসদীয় সংস্কার ঘটায়, যার ফলশ্রুতিতে আসে অনেক জনমুখী আইন, আসে মর্লি-মিন্টো সংস্কার ১৯০৯, মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার ১৯১৯। স্বরাজ পার্টির (কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত একটি গোষ্ঠী) সম্পাদক হিসাবে সুভাষচন্দ্র বসু তৈরি করেন একটি রিপোর্ট, যা সভাপতি মতিলাল নেহরুর নামে নেহরু রিপোর্ট হিসাবে পরিচিত। তাতে ছিল পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনভিত্তিক প্রশাসনের প্রস্তাব। তার ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ভারত সরকার আইন ১৯৩৫। ভারতের যে সংবিধান, তা মূলত ওই ভারত শাসন আইনের পরিণত রূপ।
সংসদীয় সংস্কারের সমান্তরাল ধারায় প্রবাহিত হয়েছিল আর এক ধারা। মূলত বাংলা ভাগের কুচক্রী পরিকল্পনা থেকে বাংলায় শুরু হয় জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র আন্দোলন। ওই আন্দোলন ছড়িয়েছিল মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে। নানা অভাব, ক্ষোভ থেকে সঞ্জাত ওই আন্দোলনগুলো সাংগঠনিকভাবে একীভূত না হলেও একে অন্যকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি জোগাত। সুদূর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ব্রিটেন, কানাডা, জাপান ও মালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাদের বৈদেশিক শাখা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তারা সক্রিয় ছিল।
ব্রিটিশরা ওই সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত, তাই অকথ্য নির্যাতন চালাত। আর দুটো মারাত্মক রাজনৈতিক কূটকৌশল অবলম্বন করেছিল। প্রথমত, বিপ্লবীদের সশস্ত্র সংগ্রামকে ভ্রান্ত পন্থা বলে দাগিয়ে অবমূল্যায়ন করা হত। এভাবে তাঁদের মনোবল ভেঙে জনবিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁদের বোঝানো হয়েছিল যে, জাতীয়তাবাদ একটি সংকীর্ণ চিন্তাধারা, মানবতাই আসল। অল্প সংখ্যক ধনীর বিরুদ্ধে বৃহৎ সংখ্যক দরিদ্রের সংগ্রামই করণীয়।
অন্য পোস্ট: স্বাধীনতা বহু দেশবাসীকেই স্বদেশে পরবাসী করেছে
১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সব নেতাকে জেলে পুরে এবং দমনপীড়নের মাধ্যমে তা শেষ করে দেওয়া হয়। আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের মূল ভূখণ্ডের পূর্ব প্রান্তে মণিপুরে পৌঁছে যায়। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ আজাদ হিন্দ ফৌজের অধীনে চলে যায়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে আমেরিকা নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসলীলা চালায় জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলে। জাপান আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। আর আজাদ হিন্দ ফৌজও পিছু হটতে বাধ্য হয়।
কিন্তু কফিনে শেষ পেরেকটি ছিল ১৯৪৬ সালের নৌবাহিনীর বিদ্রোহ। আজাদ হিন্দ বাহিনীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীর সদস্যরা ওই বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তার ফলে ব্রিটিশ সরকার অবশেষে ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশ সরকার যে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করে এদেশ চালাত, তাদের আর ভরসা করা গেল না। তাই বলা যায়, আজাদ হিন্দ বাহিনীর আন্দোলন বৃথা যায়নি।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে স্বাধীনতা এল। ১৪ আগস্ট রাত ১২টার পর মূল অনুষ্ঠান হল সংসদ ভবনে। পণ্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুর গাইলেন ২২ পঙ্ক্তির পুরো বন্দে মাতরম ৯ মিনিট। নেহরু দিলেন স্বভাবসিদ্ধ কাব্যিক ভাষণ, ‘বহু বছর আগে আমরা নিয়তির সঙ্গে অভিসার যাত্রা করেছিলাম। আজ আমরা নতুন করে শপথ নেব সামগ্রিকভাবে বা পূর্ণ মাত্রায় নয়, কিন্তু সারগর্ভভাবে। মাঝরাতের লগ্নে যখন বিশ্ব নিদ্রামগ্ন, তখন ভারত জেগে উঠবে জীবন ও স্বাধীনতায়। এরকম মুহূর্ত ইতিহাসে আসে কদাচিৎ, যখন আমরা পদার্পণ করব পুরোনো থেকে নতুনে। যখন একটা যুগের অবসান হয়, দীর্ঘদিন নিপীড়িত একটি জাতির আত্মা ভাষা খুঁজে পায়, সেই পবিত্র মুহূর্ত সবচেয়ে উপযুক্ত হবে ভারত ও তার জনগণের এবং আরও বৃহত্তর মানবতার সেবায় উৎসর্গ করার শপথ নেওয়ার জন্য।’
কিন্তু এই স্বাধীনতা ছিল কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের অনেক দূরে। তা এসেছিল কয়েক কোটি মানুষের দেশত্যাগ, কয়েক লক্ষ মানুষের প্রাণহানি, অনেক অশ্রু, ঘাম, গ্লানির বিনিময়ে। গান্ধী লিখেছেন, ‘আগামিকাল আমরা ব্রিটিশ শাসনের বন্ধন থেকে মুক্ত হব। কিন্তু আজ মধ্যরাত থেকে আমরা দ্বিধাবিভক্তও হব। কাজেই আগামিকাল আমাদের যেমন আনন্দের দিন, তেমন দুঃখেরও। এটা আমাদের ওপর ভারী দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেবে। ঈশ্বরের কাছে আমরা প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এটা বহন করার শক্তি দেন।’

Good