অশোক বসু

উদ্দেশ্য আর বিধেয় হাতখরচ চালানোর জন্য টিউশনি খুঁজছিল। বাড়ি থেকে রোজ টাকা চাইতে লজ্জা করে।
সকালে উদ্দেশ্য বাড়ির বাজার করতে বেরিয়েছে। দেখল, প্রাণের বন্ধু হনহন করে ওর দিকে আসছে। এ সময় বিধেয়ও ওদের বাড়ির বাজার করতে বেরোয়। আজ কিন্তু বিধেয়র হাতে বাজারের থলি নেই।
হাসি হাসি মুখ করে বিধেয় বলল, ‘উদ্দেশ্য, তোকে আর বলার সুযোগ হয়নি। কাল রাতে হরির বাবা আমাদের বাড়িতে এসেছিল। হরির প্রাইভেট টিউটর কী একটা কাজে হঠাৎ মাস দু’য়েকের জন্য দূরে অন্য কোনও জায়গায় গিয়েছে। আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে হরিকে দু’মাসের জন্য পড়ানোর। আজ থেকেই। তাই এখনই যাচ্ছি।’
– আরে, দারুণ খবর! ভালোভাবে পড়াস। হয়তো টিউশনিটা পার্মানেন্টলি হয়ে যেতে পারে।
– তোর মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
বিধেয় যখন হরিদের বাড়ি পৌঁছল, হরি তখন সোফায় আরামে বসে টিভি দেখছে। হরির মা বিধেয়কে চেনেন। বলেলেন, ‘এই যে, বাবা এসে গিয়েছ। দেখো না, হরিটা বড্ড ফাঁকি দিচ্ছে।’
কিছুক্ষণ পরে পড়ানো শুরু হল। হরি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। বিধেয়র এটি প্রথম টিউশনি। তাই বেশ নার্ভাস লাগছিল। কিন্তু অত ভয় পেলে চলবে না। ভালো টাকা পাওয়া যাবে। তার ওপর গরম গরম জলখাবার। হরিদের যথেষ্ট টাকা আছে।
হরি পড়তে বসেই স্মার্টলি বলল, ‘বিধেয়দা, আমার একটাই প্রবলেম।’
– কী প্রবলেম?
– ইংরেজি আমার কাছে বিষ।
বিধেয় মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ছাত্র আর শিক্ষকের কী মিল! বিধেয় এই ভেবে খুব রিলিফ পেল যে, শিক্ষকের ইংরেজি ভুল হলে ছাত্র ধরতে পারবে না।
সেই সঙ্গে অবশ্য এটাও বলা যায়, ছাত্রের ইংরেজি ভুল হলে শিক্ষক ধরতে পারবে না। তবুও বিধেয় বলল, ‘ইংরেজি আর এমন কী! তোমায় সব শিখিয়ে দেব।’
এরপর মিনিট ১৫ নানা কথায় কেটে গেল। হরি পড়াশোনার চেয়ে গল্প করতেই বেশি ভালোবাসে। তাড়াতাড়ি জলখাবারও চলে এল। সকাল সাড়ে আটটা বাজে। গরম সিঙাড়ায় কামড় দিয়ে বিধেয় বলল, ‘হরি, এগুলো কোন দোকানের? বেশ মুচমুচে।’
– এগুলো একমাত্র মতিরানির দোকানে পাওয়া যায়।
– কিন্তু এ নামে তো এই চত্বরে কোনও সিঙাড়ার দোকান নেই!
– এগুলো মায়ের হাতে তৈরি। আমার মায়ের নাম মতিরানি।
– হরি, তুমি তো বেশ রসিক দেখছি।
জলখাবার খেয়ে ও গল্প করে প্রায় ৪৫ মিনিট কেটে গেল। বিধেয় প্রায় ভুলেই গিয়েছিল যে, ও পড়াতে এসেছে। মাথা চুলকে বলল, ‘তোমার আগের মাস্টার রোজ ক’টা করে সিঙাড়া খেতেন?’
– মা প্রথমে তিনটে দিত, যেমন তোমাকে দিয়েছে আজ। ভটাদা সস দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি খেয়ে নিত। তারপর হাত চাটত। তা দেখে আমি মাকে বললে মা আরও দুটো পাঠিয়ে দিত।
– ভটাদা তারপর আর হাত চাটতেন না?
– ভটাদা তারপর হাত চাটলেও আমি না দেখার ভান করতাম। পরে একথা বললে মা বলত, পাঁচটা জায়েন্ট সাইজের সিঙাড়া খাওয়ার পরেও অসভ্যের মতো কী করে যে হাত চাটে! আচ্ছা, বিধেয়দা, তুমি কি আর সিঙাড়া খাবে?
– আরে, না না।
বিধেয় বেশ লজ্জা পেল। সময় হু-হু করে চলে যাচ্ছে দেখে বিধেয় বলল, ‘হরি, স্কুলে আগামিকাল ইংরেজির পড়া আছে?’
– হ্যাঁ। ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ।
– বেশ। এবার তুমি একে একে বলো।
– আমি শুধু তিনটে পারিনি।
– ঠিক আছে, ওগুলো বলো। আমি একে একে বলে দিচ্ছি। শুরু করো।
– প্রথমটা হল, They discussed the matter in camera.
– লিখে নাও হরি, তারা ক্যামেরার মধ্যে বিষয়টি আলোচনা করল।
– কিন্তু ক্যামেরার মধ্যে কী করে করবে?
– হরি, এখানে তারা মানে ধরে নিতে হবে লিলিপুট।
– ঠিক আছে বিধেয়দা। পরেরটা হল, He is a noted political leader.
– এর অনুবাদ রাজনৈতিক নেতাটি কামান।
– কামান?
– হ্যাঁ।
– মানে যুদ্ধের কামান না দাড়ি কামান?
– টাকা কামান।
– কিন্তু টাকার বিষয়টা আসছে কেন?
– হরি, ভালো করে শোনো। Money মানে টাকা, আর Moneyed মানে যার টাকা আছে। তেমনই Note মানে টাকা, আর Noted মানে যার টাকা আছে। এবার পুরো মানে পরিষ্কার হয়ে গেল।
– আর একটা আছে, The City of joy has earned international fame.
– জয়নগর আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে।
– কিন্তু বিধেয়দা, কীসের জন্য এই সম্মান পেয়েছে?
– হরি, তুমি GK-তে বেশ কাঁচা। জয়নগরের মোয়ার কথা শোনোনি?
পড়ানো শেষ করে বিধেয় খোশমেজাজে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। হঠাৎ শুনতে পেল হরির বড়দা গম্ভীর স্বরে বলছেন, ‘বাবা, আমি হরির পড়ার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। বিধেয় বলে City of joy মানে নাকি জয়নগর! সামনে হরির পরীক্ষা। বিধেয় পড়ালে হরির ভাগ্যে জয়নগরের মোয়াই জুটবে। বাবা, ওকে বাতিল করো।’
বিধেয় আর দাঁড়াল না।
