বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়
প্রধান শিক্ষক, চিত্তরঞ্জন হাইস্কুল, পুরুলিয়া

বৈধ-অবৈধ সমাজসাপেক্ষ এক ধারণা। রক্ষণশীল গোঁড়া সমাজে যা অবৈধ, মুক্ত ও উদার সমাজে তা-ই আবার বৈধ। ভারতীয় সমাজ ঐতিহ্যগতভাবে গোঁড়া ছিল, তা ভারতীয় পুরাণ, মহাভারত, রামায়ণ থেকে প্রমাণিত হয় না। রাক্ষস রাবণের পিতৃপরিচয়, কর্ণের জন্ম ইতিহাস, দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামী ইত্যাদি কী প্রমাণ করে? সমাজ দ্বারা স্বীকৃত নয়, এরকম যৌনতাগন্ধী নারী-পুরুষ সম্পর্ককে আমরা পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্ক বলি। প্রাচীন যুগে ভারতীয় সমাজে যৌনতা নিয়ে এত স্পর্শকাতরতা, রাখঢাক ছিল না।
বাৎস্যায়নের কামসূত্র ছিল সেকালের এক বহুপঠিত শাস্ত্র। আসলে প্রাচীন ভারতে আমাদের পূর্বপুরুষরা (পূর্বনারী হয় না!) নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ককে বিজ্ঞানসম্মত ও স্বাস্থ্যবিধির আধারে জীবনশৈলী রূপে দেখেছেন। আজ যখন স্কুলশিক্ষায় কিশোর-কিশোরীদের যৌন জিজ্ঞাসাকে উৎসাহিত করা হয়, তাকে বৈধতা দিয়ে তাদের বয়সোচিত তথ্যনিষ্ঠ যৌনজ্ঞান বর্ধনের জন্য ‘জীবনশৈলীর শিক্ষা’ দেওয়া হয়, তখন তো যৌনতা নিয়ে প্রাচীন ভারতের সিদ্ধান্তকেই আমরা মেনে
নিই। মন্দিরগাত্রে খোদিত রতিক্রিয়া ভাস্কর্য ছিল কামসূত্রের যৌনবিজ্ঞানকে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস। সঠিক, স্বাস্থ্যসম্মত, কু-অভ্যাস বিবর্জিত যৌনতা প্রত্যক্ষভাবে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কের স্থায়িত্বের চাবিকাঠি এবং পরোক্ষে মাধুর্যে ভরা, সুখী দাম্পত্য জীবনের নিশ্চয়তা। যৌনতা ভারতবর্ষে সেকালে ট্যাবু ছিল না। কালক্রমে আমরা গোঁড়া হয়ে উঠলাম। সমাজ নানাবিধ বাধানিষেধ আরোপ করল এবং তা আরোপিত হল শুধু নারীদের ওপর। পুরুষতান্ত্রিকতার ঘেরাটোপে নারী সমাজ বাঁধা পড়ল, হয়ে গেল পুরুষের গোলাম, সমাজের অতি স্পর্শকাতর অংশ।
আমাদের ভ্রান্ত ধারণা, বহমান সামাজিক রীতিনীতি, ধ্যান-ধারণার মধ্যেই আছে বৈধতা, তা যতই ব্যাকডেটেড, অনাধুনিক, অবৈজ্ঞানিক ও অমানবিক হোক না কেন। একজন বিবাহিত নারীকে হতে হবে পতিব্রতা সতী, যদিও বিবাহিত পুরুষটির সে দায় নাই। এই চিরাচরিত সেকেলে ধারণা দিয়ে পরকীয়ার অবৈধতা নিরূপিত হয়! পুরুষ সমাজ কি পরকীয়া আবিষ্ট কোনও এক ললনার প্রতি যতখানি খড়্গহস্ত, উলটোদিকের তার পুরুষ সঙ্গীর প্রতি ঠিক ততখানিই বিরূপ? একেবারেই না। আমাদের আরাধ্য রাধা-কৃষ্ণের প্রেমও তো প্রচলিত অর্থে পরকীয়া প্রেম। দীর্ঘ প্রবাসে থাকা কোনও পুরুষের স্ত্রী যখন জৈবিক তাড়নায় অভিসারিণী হয়ে বসেন, তখনই যত বিপত্তি। স্বাভাবিক জৈবিক প্রবৃত্তিসঞ্জাত পরকীয়া এবং বহুগামিতা (polygamy) কখনওই এক হতে পারে না। বহুগামিতা যেখানে নিশ্চিতভাবেই এক মনোবিকার (pervertion), সেখানে পরকীয়া হল দেহ-মনের প্রয়োজনে সম্পর্ক স্থাপন। পরকীয়া প্রেম অনেক সময় কৈশোরের প্রেম অপেক্ষাও গভীর ও একরোখা হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের শুরুর দিকে আমরা তার প্রধান চরিত্র বিমলাকে দেখলাম এক ভাবে। ভারতীয় আদর্শ নারীর মতো সে পতিনিষ্ঠ, ভক্তিপ্রাণা ও সেবাপরায়ণ। পরে তাদের পরিবারে স্বামী নিখিলিশের হাত ধরে যখন স্বদেশিওয়ালা সন্দীপের আবির্ভাব ঘটে, তখন পরিবার ও সমাজের চোখে আদর্শ স্ত্রী বিমলা হয়ে ওঠে এক আধুনিক নারী, যার দৃষ্টি প্রসারিত হয় পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের ভালো-মন্দে। পরিবার পরিসরে যুবক সন্দীপের সঙ্গে তার নিয়ন্ত্রিত, অথচ প্রভাবী মেলামেশা পতিঅন্তপ্রাণা বিমলার মানসরাজ্যে ঝড় তোলে। বিমলা আন্তরিকভাবে পালটে যেতে থাকে। সে সন্দীপের উদ্দেশে বলে ওঠে, রাজা আমার, দেবতা আমার, তুমি আমার মধ্যে যে কী দেখেছ, তা জানিনে, কিন্তু আমি আমার হৃদপদ্মের উপরে তোমার বিশ্বরূপ দেখলুম। তার দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন, নারীমানস পরিসরে এক অবৈধ রবাহূত পুরুষের স্থাপনা সমাজের আয়নায়, পরিবারের চোখে অবৈধ হলেও এটা মানবিক এবং জৈবিকও বটে। নারী যে একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, পৃথক এক মানব হিসাবে তারও একটি ভিন্ন দর্শন হয়, ভাবনারাজ্য তার আলাদা, এটা স্বীকার করতে আমরা পারি না। সে কারণে অল্পেই তাদের ওপর বৈধ-অবৈধের ফতোয়া জারি করে আমরা পৌরুষ ফলাই।
পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্রে আমাদের কথাবার্তা, চালচলন, পোশাক-আশাক, খানাপিনা, পছন্দ-অপছন্দ, সবকিছুকেই আমরা বৈধ-অবৈধর নিক্তিতে ওজন করে থাকি। বিদ্যাস্থানে শিক্ষকের জিন্স পরা, মন্দিরে দর্শনার্থীর বারমুডা পরা, ধর্মীয় উৎসবে আমিষ ভক্ষণ, ধর্মস্থানে হুল্লোড়বাজি— সমকালের মাপকাঠিতে এগুলি সবই কুরুচিপূর্ণ বা অবৈধ।
অন্য পোস্ট: পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে এত আপত্তি কেন
আমি এ নিবন্ধে মোটেই এসব নিয়ে আলোচনা করব না। আমার আলোচনার বিষয় মানব-মানবীর সম্পর্কের বৈধতা ও অবৈধতা। মানব-মানবীর সেরা সম্পর্ক মাতা-সন্তানের সম্পর্ক। এরপরে আসতে পারে পিতা-পুত্রী ও ভ্রাতা-ভগিনীর সম্পর্ক। বাকি সমস্ত সম্পর্ককেই বৈধ-অবৈধর মাপকাঠিতে মাপা হয়, আড়চোখে দেখা হয়, যখন তা প্রচলিত সামাজিক মানদণ্ডে স্বাভাবিকতার গণ্ডি পেরোয় বা পেরোতে চায়। দেশে দেশে, কালে কালে মানব সমাজে এরকম অনেক মানব-মানবী থাকে, যারা সোজা, বিবর্ণ, একঘেয়ে জীবনপথে চলতে চলতে হাঁপিয়ে ওঠেন এবং তখন অন্য জীবনের মদির রঙিন স্বপ্ন দ্বারা তারা প্রলুদ্ধ হয়। তাদের মধ্যে একটি অ্যাডভেঞ্চারাস মন থাকে, যা রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর। আমাদের সমাজ রক্ষণশীল, তাই এ প্রজাতির নরনারী প্রবৃত্তিগতভাবেই প্রলোভনের শিকার হয় বেশি। কোনও সমাজ উদার ও মুক্ত হলে প্রলোভন বিনোদনে সংজ্ঞায়িত হয়। সেখানে সবকিছুই স্বাভাবিক সাধারণ খোলামেলা। তাই বিপরীত লিঙ্গের পরস্পর পরস্পরের প্রতি টান অনুভবটাও কম। মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য নিষিদ্ধ অবৈধ জিনিসের প্রতি টান অনুভব করা। যারা চরিত্রগত দিক দিয়ে প্রবৃত্তিগতভাবে একটু উদ্দাম, বেপরোয়া হয়, তারা সহজেই অবৈধ মনতনুরঞ্জনের তথাকথিত অবৈধতায় আকৃষ্ট হয় বেশি। সমাজে অবশ্য সংখ্যাধিক্য তাদের, যারা শিক্ষাদীক্ষা, নিজস্ব বোধবুদ্ধি দ্বারা এই অবৈধ (?) আবেগকে দমন করতে পারে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে আবেগতাড়িত প্রতিটি ক্রিয়াকলাপকে।
মানব-মানবীর মধ্যে পরকীয়া সম্পর্ক এখন ভারতে অবৈধ নয়। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া আইনত দণ্ডনীয় নয়। সুপ্রিম কোর্ট ৪৯৭ ধারা বাতিল করে পরকীয়াজনিত ফৌজদারি অপরাধ বাতিল করেছে। তবে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক বিবাহবিচ্ছেদে নির্ণায়ক রায়দানে কার্যকরী ভূমিকা নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কুমারীদের (অবিবাহিতা) গর্ভপাত ইতিপূর্বে আইনসিদ্ধ ছিল না। এখন আইন সংশোধন করে সেখানে কুমারীদের গর্ভপাত আইনসিদ্ধ করা হয়েছে। ফলস্বরূপ সমাজে ক্রাইমের মাত্রা কমেছে। এখন পরিপূর্ণ ভ্রুণের স্খালন (abortion) গোপনে এবং অনভিজ্ঞ হাতে করানোর ঝুঁকি নেই।
ফলে কুমারী মায়ের ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবকালীন অকালমৃত্যু কমেছে। সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করতে না চাওয়া কুমারী মায়ের ওপর পুরুষ সঙ্গীর সহিংসতাও এখন আর নেই। কারণ এখন গর্ভপাত সহজ হয়ে যাওয়ায় পুরুষ সঙ্গীকে অবাঞ্ছিত পিতৃত্বের ভার গ্রহণ করতে হয় না। এজন্য কোনও কুমারী মাকে লুকিয়ে কিছু করতে হয় না বা তার পুরুষ সঙ্গীর সমর্থন সাহায্যের প্রয়োজন হয় না। পাশ্চাত্যের সমাজ অনেক উদার (মাতা মেরি বস্তুত এক কুমারী মা ছিলেন, যিনি ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিস্টের জন্মদাত্রী।) প্রাকবিবাহ গর্ভপাতকে সেখানে অন্য চোখে দেখাও হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে পরকীয়া সম্পর্ক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ না হওয়া সত্ত্বেও এ সম্পর্কিত ক্রাইম দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এর প্রধান কারণ আইন পাশ হয়েছে বটে, কিন্তু সমাজ তাকে এখনও মেনে নিতে পারেনি। আসলে তেতো ট্যাবলেট গলাধঃকরণে সমাজ মনের প্রস্তুতি প্রয়োজন এবং সময় হল সবচেয়ে বড় প্রস্তুতকারক। তাই একটু সময় লাগছে। পরকীয়া সম্পর্কে যুক্ত নরনারীর গোপন অভিসার প্রকাশ্যে এলে সমাজ তাঁদের কীভাবে শাস্তি দেয়, আমরা জানি। অনেক সময় মহিলাটির চুল কেটে অর্ধনগ্ন করে ঘোরানো হয়। পুরুষ সঙ্গীকে দড়ি দিয়ে খুঁটিতে বেঁধে পেটানো হয়। এরকম ঘটনা ঘটছে, কিন্তু মিডিয়ায় ক’টাই বা প্রকাশিত হয়! সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া এরকম একটি ঘটনা আলোড়ন ফেলে। আমাদের রাজ্যের মালদায় পরকীয়া অনুরক্ত এক
জুটিকে জেসিবি নাম্নী এক মস্তান প্রকাশ্য রাস্তায় জনসমক্ষে অত্যাচার চালায়। পরকীয়া সমাজের চোখে এখনও স্বাভাবিক নয় বলেই আজ দেখা যায় স্ত্রী প্রেমিকের সাহচর্যে স্বামীকে হত্যা করছে, উলটোদিকে স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে। পরকীয়া সম্পর্ককে সমাজ যেদিন স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে, সেদিন কোনও মানব-মানবীকে এ সম্পর্ক লুকোনোর জন্য বা একে অগ্রাধিকার দিতে ক্রাইম করতে হবে না।
কয়েকদিন আগে উত্তরবঙ্গের এরকম একটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। এক বিবাহিতা মহিলা প্রেমিক পুরুষের আবদারে তাঁকে নিয়ে ঘর ছাড়তে রাজি না হওয়ায় পুরুষ সঙ্গী পীড়াপীড়ি করলে বাধ্য হয়ে হত্যা করে। আসলে পারতপক্ষে বিবাহিত নারী পরকীয়া সামঞ্জস্য রেখে চলতে চায়। একেবারেই বাধ্য না হলে কুলত্যাগ করে না। সমান্তরালভাবে স্বামী প্রদত্ত আর্থিক নিরাপত্তা স্বাচ্ছন্দ্য এবং প্রেমিকের দুর্নিবার প্রেম, দুটোই উপভোগ করতে চায়। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি করে প্রেমিক। সে তার প্রেমাসক্ত নারীকে সব সময়ের জন্য কাছে পেতে চায়। আর এখানেই বাধে যত গোল। বেগবান স্রোতস্বিনী যেমন তার সামনে পড়া বাধাকে জলোচ্ছ্বাস দ্বারা ভাসিয়ে নিয়ে যায়, বৃহৎ বাধার মুখে দু’কূল ছাপিয়ে শুষ্ক ভূমিকে প্লাবিত করে, তেমনই যৌবনের পরকীয়া কোনও বাধা মানে না। বেয়াড়া প্রেমোচ্ছ্বাস আশপাশকে পুড়িয়ে খাক করে দেয়। অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন ও তা রক্ষায় দু’টি তরতাজা প্রাণ তখন ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো আচরণ করে। ইন্দোরের সোনম-রাজ কাণ্ড এবং উত্তর ২৪ পরগনার মনুয়া কাণ্ড এরকমই দু’টি ঘটনা, যেখানে পরিবার দ্বারা নির্বাচিত বৈধ স্বামী স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্কের শিকারে পরিণত হন। প্রাকবিবাহের গোপন প্রেম বিবাহ পরবর্তী সময়ে যখন অবৈধতার মানদণ্ডে মূল্যায়িত হয়, একটু দর্শনাভিলাষের জন্য যুগল ছটফট করে, তখন তাদের প্রেমোচ্ছ্বাস আরও বেশি তীব্র হয়। মনুয়া ও সোনম নিজের স্বামীকে প্রেমিক ও ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করে। প্রেমিক প্রণয়িনীর প্ররোচনায় উদ্দাম বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নারীর তুলনায় পুরুষ অধিকতর হিংসাশ্রয়ী, এ নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। এসব ক্ষেত্রে নারীর হিংস্রতা চোখে পড়ে না। এটা তদন্তসাপেক্ষ, কারণ সে পরদার আড়ালে থেকে কাজ করে যায়।
প্রণয়ঘটিত হিংসার ক্ষেত্রে নারীর সক্রিয় ইন্ধন ছাড়াও অনেক সময় তার নির্লিপ্ততা বহুলাংশে দায়ী থাকে। এরকম একটি সাড়া জাগানো প্রণয়ঘটিত অপরাধের ঘটনা জানাই। সনাতন ঠাকুর নামের একজন তার প্রণয়িনীর একমাত্র শিশুকন্যাকে সুচ ফুটিয়ে হত্যা করে। এজন্য পুরুলিয়া জজ কোর্টের বিচারপতি হন্তারক সনাতন ঠাকুর এবং ওই ঘটনায় তার সহযোগী মৃতের নির্লিপ্ত মাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
অন্য পোস্ট: বিবেকানন্দ আধুনিক বিজ্ঞান যুগের মানুষ
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’ উদ্দেশ্য যত তুচ্ছ ও মহৎ হোক না কেন, হিংসাশ্রয়ী কর্ম সম্পাদনে মন্ত্রণাদাত্রীর ভূমিকাও কম নয়। লেডি ম্যাকবেথরা আমাদের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পরিবার পরিসরের বাইরে সাবিত্রী ব্রতকথার আসরে, দশমীর সিঁদুর খেলার ভিড়েও বোধহয় থাকেন তাঁরা। পরকীয়ার উন্মাদনা কামাসক্তের মনে একপ্রকারের শক্তি সঞ্চার করে, যা অতীব কর্তৃত্ববাদী ও ধ্বংসাত্মক। এটা সর্বদাই অন্যকে ধ্বংস করে, এমন নয়, অনেক সময় তা বুমেরাং হয়ে নিজের দিকেও ফিরে আসতে পারে। এরকম ঘটনা দুর্লভ হলেও সাম্প্রতিক অতীতে ঘটেছে। খবরে প্রকাশ, এক মহিলা পুলিশকর্মী তাঁর একমাত্র কন্যাকে নিয়ে পিত্রালয়ে থাকাকালীন এক যুবকের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর শিশুকন্যা মায়ের এমন সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। সে তার বাবাকে এ বিষয়ে জানালে ক্ষোভে, দুঃখে মা আত্মহননের পথ বেছে নেন এবং এজন্য তিনি তাঁর প্রাকআত্মহনন লিপিতে (suicidal note) স্বামী ও কন্যাকে দায়ী করলেও প্রেমিককে কোনও দোষ দেননি। এরকম একটি ঘটনা, যা সচরাচর ঘটে না, তা কেন ঘটল, সেটা মনস্তত্ত্ববিদরা বিচার করবেন। তবে আমার মনে হয়, অর্থ উপার্জনক্ষম মায়ের কর্তৃত্বপরায়ণতা তার একমাত্র সন্তানের মনোজগতের উথালপাথাল সম্পর্কে খবর রাখেনি। মায়ের অভিযোগ ছিল, তাঁর কন্যা কেন বাবাকে বেশি ভালোবাসবে, যেখানে তিনি তার প্রকৃত অভিভাবক। আমাদের বেশির ভাগ মা-বাবার সমস্যা হল, আমরা আমাদের সন্তানের মৌলিক সত্তা, তার ব্যক্তিত্ব, নিজস্ব চাওয়া-পাওয়াকে অস্বীকার করে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, লক্ষ্য, উপলক্ষকে তার ওপর জোর করে চাপিয়ে দিই।
সমাজের একেবারে উপরের এবং নীচের স্তরে পরকীয়া, ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ বলে কিছু হয় না। সেখানে নারী-পুরুষের মেলামেশা অবাধ। ভাইদের মধ্যে স্ত্রী পালটানো, আজকে যে স্ত্রী, কাল সে বন্ধুভার্জা, মেলার মাঠের নির্জন সমভিব্যাহারে সঙ্গী বেছে নেওয়া বা জীবনসঙ্গী পালটানো, এগুলি কোনও ব্যাপারই নয়। যত ট্যাবু মধ্যবিত্ত সমাজে। এ সমাজের বুক থেকে জগদ্দল পাথরটা সরতেই চায় না। তাই যদি হত, তাহলে পরকীয়া আইনসিদ্ধ হওয়ার পরেও এত খুনোখুনি, গুপ্তহত্যা কেন? এ নিয়ে এত রাখঢাকই বা কীসের! একজন স্ত্রী তার পরকীয়া আসক্ত স্বামীকে ফিরে পেতে যে লড়াই দেয়, তার মধ্যে থাকে বাস্তবতা এবং আবেগের মিলমিশ। স্বামী ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাজনিত নিরাপত্তাহীনতাবোধ তাকে গ্রাস করে। নিজের স্বামীকে আপন করে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার জ্বালাও তাকে পীড়া দেয়। অন্যদিকে একজন পুরুষের তার পরকীয়া আসক্ত স্ত্রীকে সুপথে ফেরাতে যে লড়াই থাকে, তার পুরোটাই আবেগ, সম্মান হারানোর আবেগী যন্ত্রণা। স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের জন্য সমাজ তাকে ছোট করে দেখে। সে সমাজের চোখে অযোগ্য অপাংক্তেয় বনে যায়। তার পৌরুষ হেরে যায়। ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে পুরুষের সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। গো-সম্পদ, স্ত্রী-ধন, এগুলি তো আমাদের শাস্ত্রেই উল্লেখ রয়েছে।
কথাতেই আছে, বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। অর্থাৎ তোমার ভোগের সামগ্রী, তোমার স্ত্রী-ধন হৃত হলে, সেটা তোমার কাপুরুষতা, ক্লীবতার ফল। উপযুক্ত বয়সে মানব-মানবী মাত্রেরই যে কোনও শিথিল মুহূর্তে মনের দিক দিয়ে পরকীয়া প্রেমাসক্তি (libido) তৈরি হতে পারে। যেমন, অন্যের প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রতি আসক্তি, প্রতিবেশীর স্ত্রী বা স্বামীর প্রতি আসক্তি, পরিচারক-পরিচারিকার প্রতি আসক্তি, মায় সংসারে বহিরাগত জ্ঞাতি-আত্মীয় সম্পর্কিত কারও প্রতি আসক্তি। ঘরে-বাইরে উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ তো এটাই দেখিয়েছেন।
প্রখ্যাত নাট্যকার G B Shaw তাঁর Arms and the Man নাটকে সমাজের এলিট স্তরের সেন্টিমেন্টাল প্রেমের অসারতা ফুটিয়ে তুলেছেন। নাটকে দেখা যায়, মেজর সার্জিয়াস কোনও এক দুর্বল মুহূর্তে তার বাগদত্তা রায়নার অন্তরালে গৃহপরিচারিকা লাউকার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ঘোষিত সম্পর্কের বাইরে এই প্রেম তো অবৈধ। এ সম্পর্কও তো পরকীয়া। কিন্তু নাট্যকার Shaw এই প্রেমকেই বৈধতা দিয়েছেন।
অন্য পোস্ট: শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের মাহাত্ম্য
ফ্রয়েডীয় সূত্র অনুযায়ী, মানুষের মধ্যে বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে কামাসক্তি থাকা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু আমরা সামাজিক জীব, আমাদের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, রুচি, শালীনতা, ভদ্রতা ইত্যাদি মূল্যবোধ প্রক্ষিপ্ত (imposed) হওয়ায় প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে সব সময় সকলেই সফল হয়, এরকম নয়। আগেই লিখেছি, নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরকালীন।
খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মমত অনুযায়ী, প্রথম মানব-মানবী স্বর্গস্থ আদম এবং ইভকে ঈশ্বর জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু তারা ঈশ্বরের সে নিষেধ শোনেনি এবং জ্ঞানবৃক্ষের নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলে। এজন্য শাপভ্রষ্ট হয়ে তারা মর্তে পতিত হয়। আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে, যারা হাতের কাছের মূল্যবান, স্থায়ী জিনিসের মূল্য বোঝে না, নাগালের বাইরের সস্তা ও ক্ষণস্থায়ী জিনিসকে দুর্মূল্য, দুর্লভ বুঝে তার দ্বারা আকৃষ্ট হয়। ধ্রুবতারা যতই স্থায়ী ও উজ্জ্বল হোক, আমাদের হৃদয়াকাশে ক্ষণপ্রভ আলেয়ার মোহজাল দুর্লঙ্ঘ্য। মনুষ্য চরিত্র এমন, যে আমাকে ছেড়ে যেতে চায়, আমি তার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করি, আর যে আমাতে লেগে থাকতে চায়, আমাকে হৃদয়-মনে ধারণ করে, আমি তাকে অবহেলা করি, তার অভিলাষ হৃদয়াভিব্যক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করি। অনেক সময় ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণীর একরোখা আবেগ এখানেই সীমাবদ্ধ না থেকে ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। পরকীয়ার বীভৎস্যতা ঠিক এখানেই।
