কাজল মুখার্জি

পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে সময় সময় যে আপত্তি বা বিতর্ক দেখা যায়, তার পিছনে সামাজিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। এর কয়েকটি মূল কারণ হল:
১। ঔপনিবেশিক প্রভাব
ব্রিটিশ শাসনের সময় ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শিক্ষা, প্রশাসন এবং উচ্চবিত্ত সমাজে ইংরেজি ভাষা প্রধান হয়ে ওঠে। এর ফলে বাংলা ভাষাকে অনেক ক্ষেত্রে ‘অন্যের’ ভাষা বা গরিবের ভাষা হিসাবে দেখা হত। স্বাধীনতার পরেও এই প্রবণতা অনেকাংশে থেকে যায়।
২। আধুনিকতা ও বিশ্বায়নের প্রভাব
বিশ্বায়নের ফলে ইংরেজি ভাষা আজকের যুগে যোগাযোগ, প্রযুক্তি এবং চাকরির বাজারে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবাংলার অনেক অংশে ইংরেজিকে আধুনিকতার প্রতীক হিসাবে দেখা হয়। ফলে বাংলা ভাষার চর্চা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে।
৩। ভাষাগত সংকীর্ণতা ও শিক্ষাব্যবস্থা
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা ভাষার ওপর গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির চাহিদা বেড়েছে, যেখানে বাংলাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে বহু শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের মধ্যে বাংলার চেয়ে ইংরেজিকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
৪। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন
ভাষার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক গভীর। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সামাজিক সংস্কারে কখনও কখনও বাংলা ভাষার ব্যবহারকে বিতর্কিত করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা চর্চার অভাব এই বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৫। আঞ্চলিক সংস্কৃতির বৈচিত্র
পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন উপভাষা রয়েছে। কখনও কখনও এগুলিকে ‘খাঁটি বাংলা’ নয় বলে অবজ্ঞা করা হয়। এর ফলে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে একটি মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।
৬। মিডিয়া ও বিনোদন জগতের ভূমিকা
আজকের ডিজিটাল যুগে হিন্দি এবং ইংরেজি মিডিয়া ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাভাষী চ্যানেল বা সাহিত্যচর্চা ধীরে ধীরে কমছে। এর ফলে বাংলা ভাষা নিয়ে মানুষের আগ্রহও কিছুটা কমে গিয়েছে।
তবে এসব সত্ত্বেও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় এবং চর্চা বাড়ানোর জন্য বহু মানুষ ও সংস্থা কাজ করে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। সাহিত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন বাংলা ভাষার ঐতিহ্য, মর্যাদা, ইতিহাসকে ধরে রেখেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, বহু মানুষ এখন বাংলা ভাষার মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষায় সার্বিকভাবে সচেতন ও সচেষ্ট হয়েছেন, এটাই উজ্জ্বল প্রাপ্তি।
