Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বিগড়ে যাওয়া

Share Links:

কাজল মুখার্জি

অনেক রাত অবধি চারতলার ফ্ল্যাটের বারান্দায় অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল কবিতা। আজ বিকেলে হোয়াটসঅ্যাপে আকাশের স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের কাছ থেকে মেসেজটা পাওয়ার পর থেকেই কবিতার মনের মধ্যে ভীষণ টেনশন হতে শুরু করেছিল।

আকাশের স্কুল থেকে কাল ডেকে পাঠিয়েছে, গার্জিয়ান কল। আকাশ কবিতা আর আনন্দের একমাত্র ছেলে। তাকে নিয়ে অনেক আশা তাদের। ক্লাস নাইনে পড়ে আকাশ শহরের উপকণ্ঠে এক নামী আবাসিক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে।

 

অফিস থেকে বেরোনোর সময় হোয়াটসঅ্যাপে এই মেসেজটা পাওয়ার পর থেকে এতটাই টেনশন হচ্ছিল কবিতার যে, আজ সন্ধ্যার বন্ধুদের সঙ্গে অনেক আগে থেকে ঠিক হওয়া খানাপিনার পার্টিটাতেও যাওয়ার একেবারেই ইচ্ছে ছিল না তার। নেহাৎই খুব ক্লোজ এক বন্ধুর দেওয়া পার্টি, তাই গিয়েছিল। আর ওখানে গিয়ে কিছুক্ষণ পরেই শরীর খারাপের অজুহাতে পার্টি থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছিল সে।

আকাশের বাবা আনন্দ চাকরি করে এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। অফিসের কাজে প্রায়ই বাইরে যেতে হয় তাকে। বাইরে থেকে আজই ফিরেছে আনন্দ। আর এদিকে আগামিকালই কবিতা আর আনন্দকে যেতে হবে আকাশের স্কুলে। স্কুল থেকে যে মেসেজটা এসেছে, তাতে কীজন্য যেতে হবে, কেন গার্জিয়ান কল করা হয়েছে, এসব কিছুই লেখা ছিল না।

অফিস টুর থেকে আনন্দ ফিরে ফ্রেস হওয়ার পর তারা দু’জনেই ড্রিংকস নিয়ে বসেছিল নিয়মমাফিক। কিন্তু আজ টেনশনের কারণে কবিতা তার ড্রিংসের গ্লাস নিয়ে শুধুই নাড়াচাড়া করছিল। এটা লক্ষ করে আনন্দ কবিতাকে কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে কবিতা আনন্দকে বিকেলবেলা তার হোয়াটসঅ্যাপে আকাশের স্কুল থেকে আসা মেসেজের কথা বলে। আগামিকাল আকাশের স্কুল থেকে গার্জিয়ান কল করা হয়েছে বলল।

আনন্দ বলল, ‘এ নিয়ে বেশি চিন্তা করো না। কালকে তো আমরা স্কুলে যাচ্ছি।’

আনন্দর কথায় কবিতা বিশেষ আশ্বস্ত হতে পারল না।

কবিতা দু’পেগের পর উঠে গিয়েছিল। কিন্তু আনন্দ তারপরও একাই ড্রিংকসটা শেষ করল। খাওয়াদাওয়া করে নিজের বেডে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

কবিতা ভালো করেই জানে যে, আজকাল আনন্দ অফিসের কাজে বাইরে গিয়ে ওর অফিসের এক মহিলা কলিগের সঙ্গে হোটেলে রাত কাটায়। এই খবরটা জানার পর থেকে ঘেন্নায় আর রাগে আনন্দর সঙ্গে এক ফ্লাটে থাকার ইচ্ছে একেবারেই ছিল না কবিতার। কিন্তু বন্ধুবান্ধব আর সোসাইটি থেকে লোকলজ্জা, তাদের সামাজিক স্ট্যাটাস আর ছেলে আকাশের জন্য এখনও আনন্দর সঙ্গে এক ফ্ল্যাটেই আছে সে।

পরদিন সকালে অফিস না গিয়ে কবিতা আনন্দকে সঙ্গে নিয়ে গেল আকাশের স্কুলে। প্রিন্সিপালের ঘরে ঢোকার সময় কবিতা লক্ষ করল, ওদের দেখে প্রিন্সিপালের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। প্রিন্সিপাল সরাসরি কবিতা আর আনন্দকে বললেন, ‘আপনারা তো আকাশের মা-বাবা। তা, মা-বাবা হয়ে ছেলেকে কী শিক্ষা দিয়েছেন? এই দেখুন ওর মোবাইল ফোন। দেখুন এতে কীসব ছবি আপনার ছেলে সেভ করে রেখেছে। আর দু’দিন আগে ওরা কয়েকজন বন্ধু্ বিকেলবেলায় হস্টেল থেকে স্থানীয় পার্কে গিয়েছিল। তখন ওখানে একটি মেয়েকে উদ্দেশ করে কিছু খারাপ কথা বলেছে আপনাদের ছেলে। সেজন্য ওই মেয়েটির বাবা-মা এবং স্থানীয় লোকজন এসে গতকাল স্কুলে ঝামেলা করে এবং শাসিয়ে গিয়েছে এই বলে যে, আপনার ছেলেকে যেন এই স্কুলে না রাখা হয়। এই পরিস্থিতিতে আমরা কী করতে পারি আপনারাই বলুন। ওর জন্য অন্য ছাত্ররাও বিগড়ে যাচ্ছে। আমরা ওকে আর এই স্কুলে রাখতে পারব না। ওকে টিসি দিয়ে দিচ্ছি। আপনারা ওকে নিয়ে যান।’

এরপর প্রিন্সিপাল স্যার আকাশকে তাঁর ঘরে ডেকে পাঠালেন। আকাশ আসার পর প্রিন্সিপাল স্যার তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি মোবাইল ফোনে যেসব ছবি রেখেছ, এগুলি তুমি কার মোবাইল ফোনে দেখেছ?’

আকাশ উত্তর দিল, ‘বাবার মোবাইলে আমি এরকম ছবি আর ভিডিয়ো দেখেছি স্যার।’

এই উত্তর শুনে প্রিন্সিপাল স্যার এবং আকাশের মা-বাবা চমকে উঠল। এরপর প্রিন্সিপাল স্যার আকাশকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি সেদিন পার্কে ওই মেয়েটিকে দেখে খারাপ কথা বলেছ কেন? এ ধরনের কথাবার্তা তুমি কোথায় বলতে শুনেছ?’

আকাশ বলল, ‘স্যার, আমি বাড়িতে বাবা-মায়ের মধ্যে বেশিরভাগ সময় ঝগড়া হতে দেখেছি। বাবা মাকে খারাপ কথা বলত, আর মা-ও বাবাকে খারাপ কথা বলত। সেজন্য আমার কথার মধ্যেও ওইসব খারাপ কথা কখনও কখনও এসে পড়ে।’

এই উত্তর শুনে প্রিন্সিপাল স্যার আর আকাশের বাবা-মা আরও চমকে উঠলেন। প্রিন্সিপাল স্যার এবার আকাশের মা-বাবাকে বললেন, ‘আপনাদের ছেলের উত্তরগুলো তো নিজের কানেই শুনলেন আপনারা। আশা করি, আপনারা দু’জনেই বুঝতে পেরেছেন আপনাদের ছেলের বিগড়ে যাওয়ার কারণ কী।’

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

নববর্ষ

একুশে ফেব্রুয়ারি

গদ্যের বারান্দা ৪৩-৬০

গদ্যের বারান্দা ৪২

গদ্যের বারান্দা ৪১

গদ্যের বারান্দা ৪০

প্রিন্টআউট

গদ্যের বারান্দা ৩৬-৩৮

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল শিখা দীপ মুখোপাধ্যায়

গদ্যের বারান্দা ২৬-৩৫