সুচরিতা চক্রবর্তী
দিল্লি বহুবার যাওয়ায় অনেককিছুই দেখা হয়ে গিয়েছে, তবু হাতে যখন দু’দিন সময় আছে, চলে গেলাম ব্লক সি, সরোজিনী নগর, নিউ দিল্লির সরোজিনী মার্কেটে। সত্যি বলতে, এত সস্তায় এত সুন্দর ড্রেস মেটেরিয়াল ভাবাই যায় না। সেখানে জামা-প্যান্ট শুরু মাত্র ৫০ টাকা থেকে। শুধু তাই নয়, জুতো থেকে জুয়েলারি, সবই হাতের নাগালের মধ্যে। কিনতে গিয়ে দু’বার ভাবতে হবে না। ফেরার সময় নিউ দিল্লির ব্রহ্মপুত্র মার্কেটেও ঢুঁ মারলাম। সন্ধ্যা কাটানোর মতো এমন সুন্দর মনোরম পরিবেশের জুড়ি মেলা ভার।
অন্য পোস্ট: কাশ্মীর: এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা
আমার গন্তব্য দেরাদুন। দিল্লি থেকে দূরত্ব ২৬৫.৫ কিলোমিটার। ১৮১৮ সালের মানচিত্র অনুসারে ওই জায়গা ‘দেহরা’ নামে পরিচিত ছিল। দেরাদুন কিন্তু দুটো শব্দের সংযোগে গঠিত। দেরা শব্দ ডেরা থেকে এসেছে, যার অর্থ শিবির, আর দুন বা ডুন হল হিমালয় ও শিবালিকের মধ্যে অবস্থিত উপত্যকা।
রাত ১১টায় দেরাদুন যাওয়ার বাস। পুরোনো দিল্লিতে ৪ নম্বর কাশ্মীরি বাসস্ট্যান্ড থেকে দেরাদুনের বাস ছাড়ে। দু’-তিনদিন আগে অনলাইনে টিকিট করা যায়। নিউ দিল্লি থেকে পুরোনো দিল্লি পৌঁছতে পৌঁছতে রাতের বেলা একনজরে দেখে নিলাম লালকেল্লা। সুন্দর ছিমছাম ইলেকট্রিক বাস। বাস হোক বা ট্রেন, জানালার পাশের সিট আমার কাছে সবচেয়ে লোভনীয়।
রাত ৩টে ২১। বাস গিয়ে দাঁড়াল দিল্লি-হরিদ্বার রোডে বাস টার্মিনাসে। ‘মা রসুই’য়ে যাত্রী নামিয়ে বাস একটু দূরে গিয়েছে ইলেকট্রিক চার্জিংয়ে। সামান্য কিছু খাবার অর্ডার দিয়ে বসে আছি। আকাশে ভাঙা পূর্ণিমার চাঁদ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন যাত্রীরা। কুকুরগুলোর পেট-পিঠ সমান। রাস্তায় জমে থাকা জল খাচ্ছে খানিক। ডাস্টবিনের ফেলা খাবারগুলোতে উঁকি মারছে। নিরাশ হয়ে মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ওদের পিঠ থেকে পেটকে আলাদা করার কোনও দায় নেই মানুষের। একেই বলে কুকুর জন্ম। গমগম করে পাঞ্জাবি গান বাজছে। মনে হচ্ছে, সেখানে কেউ বিশ্রাম নেয় না। মানুষের কত কাজ! একমুহূর্ত নষ্ট করে না। রুজি রোজগার, আত্মীয়-পরিজন, কথা দেওয়া, কথা নেওয়া মানুষ সদা চলমান। মানুষ বড় দয়াবান, মানুষ বড় নিষ্ঠুর।
একটু পরেই চাঁদ ঢলে যাবে পশ্চিমে। পূর্বদিক রেঙে ওঠা মানেই নতুন পথ চলা, নতুন কথা আর কথা কাটাকাটি। সর্বসাকুল্যে এ পৃথিবীতে মায়ার অন্তর্জাল জড়িয়ে রেখেছে আমাদের এই গাছ, চাঁদ, অবলা প্রাণী, সময়-অসময়। কেউ ছেড়ে যাব না কাউকে।
সকাল ছ’টায় হরিদ্বারের পাশ দিয়ে বাস চলছে। রাজাজি ন্যাশনাল পার্ক ফেলে দেরাদুন এসবিটিআই বাস টার্মিনাসে বাস গিয়ে দাঁড়াল সকাল ৭টায়।
আকর্ষণীয় ইতিহাস এবং কৌতূহলপূর্ণ পৌরাণিক কাহিনি ওই সুন্দর হিল স্টেশনের ঐতিহ্য। আগেই জানিয়েছি, দিল্লি থেকে মাত্র ২৬৫ কিমি দূরে ঘূর্ণায়মান দুন উপত্যকা এবং হিমালয়ের পাদদেশে দেরাদুন শহর অবস্থিত। দেরাদুন পর্বত এবং সবুজ শাল বন দিয়ে ঘেরা।
বছরব্যাপী মনোরম আবহাওয়া এবং মনোরম পরিবেশের জন্য পরিচিত শহরটি মুসৌরির মতো জনপ্রিয় হিল স্টেশন এবং হরিদ্বার ও ঋষিকেশের মতো তীর্থস্থানগুলির একটি প্রবেশদ্বার।
অতুলনীয় ল্যান্ডস্কেপ এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মিশ্রণে ব্যস্ত দেরাদুন ব্যবসা এবং অবসর কাটানোর জন্য উপযুক্ত একটি শহর। একসময়ের শান্ত-নিরিবিলি অবসর যাপনের আশ্রয়স্থল ওই স্থান আজ যতই ব্যস্ত, জনবহুল হয়ে উঠুক, এখনও কিন্তু তার নিজস্ব শান্ত আকাশ ও সবুজ বনানী ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সেখানের ক্যাফে এবং লাউঞ্জগুলি ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।
উত্তর ভারতের শিক্ষাকেন্দ্র ওই শহরটি ওয়েলহাম এবং দুন স্কুলের মতো আইকনিক প্রতিষ্ঠানের আবাসস্থল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, অলিম্পিয়ান অভিনব বিন্দ্রা এবং প্রখ্যাত লেখক অমিতাভ ঘোষের মতো অদম্য ব্যক্তিদের আলমা মেটার।ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিও সেখানে অবস্থিত।
বলা হয়, দেরাদুন ১৬৭৫ সালে শিখ গুরু রাম রাই দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। শহরটি মহাভারতের বিখ্যাত শিক্ষক দ্রোণাচার্যের বাসস্থান হিসাবেও পরিচিত। আকর্ষণীয় ইতিহাস, স্বচ্ছ-নির্মল প্রকৃতি এবং কৌতূহলী পৌরাণিক কাহিনি ওই শহরের আকর্ষণ।
দেরাদুন সারা বছর মনোরম, কিন্তু মার্চ থেকে জুন এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আদর্শ। গ্রীষ্মের তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সর্বোচ্চ এবং শীতকালে পারদ ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়।
অন্য পোস্ট: প্যারিস অলিম্পিক্স ও ভারত
এ তো হল দেরাদুনের ইতিহাস-ভূগোল।আর দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে প্রথমেই গেলাম বিধৌলি। বিধৌলি হল ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের দেরাদুন জেলার বিকাশনগর তহসিলের একটি ছোট গ্রাম। দেরাদুন আইএসবিটি থেকে ২১ কিমি এবং প্রেমনগর থেকে ১১ কিমি দূরে অবস্থিত। দেরাদুন থেকে প্রাইভেট কারে বিধৌলি যেতে সময় লাগে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট। উত্তরাখণ্ড বিধানসভার সহসপুর কেন্দ্রের অধীনে পড়ে। ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড অ্যানার্জি স্টাডিজের ক্যাম্পাস বিধৌলিতে অবস্থিত। যাঁরা দুন উপত্যকার বন্য জীবন দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বিধৌলি একটি আদর্শ স্থান।আপনি বিধৌলিতে বিশাল পাহাড় পাবেন না, তবে অবশ্যই শান্তি এবং সান্ত্বনা পাবেন, যা আপনাকে দেবে আর এক আত্মতুষ্টি।
নন্দা কি চৌকি থেকে বিধৌলির দিকে ড্রাইভটি পাহাড় এবং সবুজ পথ দিয়ে সম্পূর্ণ নির্মল দু’দিক আবৃত। জায়গাটি এলাকাজুড়ে প্রসারিত সবুজ জমিতে আচ্ছাদিত।
ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড অ্যানার্জি স্টাডিজ অর্থাৎ অ্যানার্জি একর ক্যাম্পাস কলেজ ম্যানেজমেন্ট কর্তৃক সীমিত হস্টেলের সুবিধা-সহ বিধৌলিতে খোলা হয়। গ্রামটি বোর্ডিং সুবিধার মতো আবাসন, গেস্ট হাউস, ছেলেমেয়েদের জন্য হস্টেল দিয়ে পরিপূর্ণ।ভারতে UPES-এর সবচেয়ে সুন্দর ক্যাম্পাস রয়েছে। বিধৌলিকে তারা তাদের প্রধান ক্যাম্পাস হিসাবে বেছে নিয়েছে, যেখানে সর্বত্র সুন্দর পরিবেশ রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড অ্যানার্জি স্টাডিজের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গ্রামের অর্থনীতিতে উন্নতি হয়েছে এবং গ্রামে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। একর জুড়ে বিস্তৃত একটি জমকালো বিস্তৃতি। ইউপিইএস অ্যানার্জি একর ক্যাম্পাসটি ডুন ভ্যালি দিয়ে ঘেরা, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি দুর্দান্ত দৃশ্য।রিভার পয়েন্ট এবং বিধৌলি পিক, উভয়ই স্কলারস প্যারাডাইস হস্টেলের কাছে, যেখানে পৌঁছনোর পুরো পথটি সবুজ জমিতে ঘেরা। রিভার পয়েন্ট যাওয়ার জন্য নীচের দিকের রাস্তাটি ধরেছিলাম। পথটি কেবল হেঁটেই যাওয়া যায়। সেদিন হঠাৎ বৃষ্টি নামার কারণে হাঁটার সময় সতর্ক থাকতে হয়েছিল।

