Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ভাইফোঁটা: পৌরাণিক বিশ্বাস এবং রীতিনীতি 

Share Links:

কাজল মুখার্জি

আজ ভাইফোঁটা। বাংলার ঘরে ঘরে ভাইফোঁটা একটি জনপ্রিয় উৎসব। এই দিন বোন বা দিদিরা তাদের ভাইদের বা দাদাদের কপালে চন্দন বা দই বা কাজলের ফোঁটা দিয়ে বলে, ‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা,/ যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।/ যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা,/ আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।’

এ বছর (২০২৪) ভাইফোঁটার দ্বিতীয়া তিথি ১৭ কার্তিক অর্থাৎ ৩ নভেম্বর, রবিবার। দ্বিতীয়া তিথি শুরু হচ্ছে ১৬ কার্তিক অর্থাৎ ২ নভেম্বর থেকে। সন্ধ্যা ৬টা ৫৩ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে এই তিথি শুরু হচ্ছে। দ্বিতীয়া তিথি শেষ হবে ১৭ কার্তিক অর্থাৎ ৩ নভেম্বর রাত ৮টা ১৫ মিনিট ১২ সেকেন্ডে। ৩ নভেম্বর, রবিবার দুপুর ১টা ১০ মিনিট থেকে ৩টে ২২ মিনিট পর্যন্ত ফোঁটা দেওয়ার শুভ মুহূর্ত রয়েছে।

ভাই যদি ছোট হয়, তাহলে তাকে ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে বোন। ভাইয়ের কপালে বাঁ হাত দিয়ে ফোঁটা দেওয়া হয়। ফোঁটা যখন দেওয়া হবে, তখন ভাইয়ের মুখ উত্তর দিকে বা উত্তর-পশ্চিম দিকে হবে। যে ফোঁটা দিচ্ছে, তার মুখ উত্তর-পূর্ব বা পূর্ব দিকে হবে। ভাইকে উত্তর দিকে বা উত্তর-পূর্ব দিকে মুখ করে বসিয়ে ফোঁটা দেওয়ার রীতি রয়েছে। ভাইকে মেঝেতে বসিয়ে ফোঁটা দিতে নেই, আসন পেতে বসিয়ে দিতে হয়।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসবের আলাদা নাম রয়েছে। যেমন, ভাউবিজ, ভাইটিকা বা ভাইফোঁটা, ভাইদুজ। রাখির মতোই এই ভাইফোঁটা কিছুটা হলেও এক, ভাইবোনের বন্ধন ও ভালোবাসা উদযাপন করা হয়। এইদিন দিদিরা বা বোনরা তাদের ভাই বা দাদাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায় এবং কপালে তাদের মঙ্গলকামনায় টিকা বা তিলক পরিয়ে দেয়। ভগবানের কাছে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে এবং ভাইরা বোনদের হাতে উপহার তুলে দেয়। আনন্দের সঙ্গে তারা পালন করে এই উৎসব।

কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ রাক্ষস নরকাসুর নামে এক দৈত্যকে বধ করে দ্বারকায় ফিরে আসেন। এই দিনে  শ্রীকৃষ্ণের বোন সুভদ্রা তাঁকে ফল, ফুল, মিষ্টি এবং অনেক প্রদীপ জ্বালিয়ে স্বাগত জানান। সুভদ্রা শ্রীকৃষ্ণের কপালে ফোঁটা দিয়ে তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করেছিলেন। তারপর থেকে ভাইফোঁটা উপলক্ষে বোনরা তাদের ভাইদের কপালে ফোঁটা দেয় সৌভাগ্য প্রার্থনা করে এবং ভাইরা তাদের বোনদের সাধ্যমতো উপহার দেয়।

অন্য পোস্ট: দ্রুত স্বমহিমায় ফিরুক রাইটার্স বিল্ডিং

এই বিশেষ তিথিটি যম দ্বিতীয়া  নামেও পরিচিত। এই দিনে বা তিথিতে বোন যমুনার বাড়ি গিয়েছিলেন ভাই যমরাজ। সেদিন যমুনার হাতের রান্না করা খাবার খান যম। খাবার খেয়ে খুব খুশি হন তিনি। তখন বোন যমুনা তাঁর দাদার কাছ থেকে আশীর্বাদ চান। বোনকে আশীর্বাদ করে যমরাজ সেদিন বলেন, যে ভাই এই বিশেষ তিথিতে তাঁর বোনের বাড়ি গিয়ে বোনের হাতে খাবার খাবে, তার অকালমৃত্যুর কোনও ভয় থাকবে না। আর এই ঘটনার পর থেকেই এই দিনটি পালন করা হয়ে থাকে।

শাস্ত্র অনুসারে, ছায়া ও সূর্যের দু’টি সন্তান ছিল— একটি পুত্র যমরাজ এবং অন্যটি কন্যা যমুনা। কিন্তু একটা সময় এল, যখন ছায়া সূর্যের তেজ সহ্য করতে না পেরে উত্তর মেরুতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে শনিদেবের জন্ম হয়। উত্তর মেরুতে বসতি স্থাপনের পর যম ও যমুনার সঙ্গে ছায়ার আচরণে পার্থক্য দেখা দেয়। এতে ব্যথিত হয়ে যম নিজের শহর যমপুরী প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় যমুনা তাঁর ভাই যমকে যমপুরীতে পাপীদের শাস্তি দিতে দেখে দুঃখিত হতেন। তাই তিনি গোলোকে থাকতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু যম এবং যমুনা দুই ভাইবোনের মধ্যে স্নেহ-ভালোবাসা ছিল।

একসময় যমের মনে পড়ল তাঁর বোন যমুনার কথা। যমরাজ তাঁর বোন যমুনাকে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু কাজের ব্যস্ততার কারণে তিনি তাঁর বোনের সঙ্গে এতদিন দেখা করতে যেতে পারেননি। কার্তিক শুক্লপক্ষে দ্বিতীয়ার দিনে যমুনা ভাই যমরাজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যমরাজ তাঁর বাড়িতে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই অবস্থায় যমরাজ ভাবলেন, আমি প্রাণ নিতে যাই সকলের। কেউ আমাকে তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে চায় না। আমার বোন যে সদিচ্ছা নিয়ে আমাকে ডাকছে, সেটা অনুসরণ করা আমার কর্তব্য। বোনের বাড়িতে আসার সময় যমরাজ নরকে বসবাসকারী জীবদের মুক্তি দেন। যমরাজকে নিজের বাড়িতে আসতে দেখে যমুনার খুশির সীমা রইল না।

স্নান শেষে যমুনা যমরাজের উপাসনা করার পর সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করেন। যমুনার এই আতিথেয়তায় খুশি হয়ে যমরাজ বোনকে বর চাওয়ার অনুরোধ করেন। তখন যমুনা বললেন, হে ভদ্রে, আপনি প্রতিবছর এই দিনে আমার বাড়িতে আসবেন এবং আমার মতো যে বোন এই দিনে তার ভাইকে সম্মানের সঙ্গে ভাইফোঁটা দিয়ে উদযাপন করবে, তার ভাইদের আপনি অকালমৃত্যু থেকে রক্ষা করবেন। সেই থেকে এই উৎসব পালনের রীতি চলে আসছে। এই কারণে বিশ্বাস করা হয় যে, ভাইফোঁটার দিন যমরাজ এবং যমুনারও পুজো করা উচিত।

ধর্মীয় গ্রন্থ অনুসারে, কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় যমুনা তাঁর ভাই যমের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বর পেয়েছিলেন। সে কারণে ভাইফোঁটা যম দ্বিতীয়া নামেও পরিচিত। প্রকৃতপক্ষে যমরাজের বর অনুসারে যে ব্যক্তি এই দিনে যমুনায় স্নান করে যমের পুজো করবে, তাকে মৃত্যুর পর যমলোকে যেতে হবে না, তার ভাই অকালমৃত্যু থেকে বাঁচবে। অন্যদিকে সূর্যকন্যা যমুনাকে দেবীস্বরূপা মনে করা হয়, যিনি সমস্ত কষ্ট দূর করেন। এ কারণে যম দ্বিতীয়ার দিনে যমুনা নদীতে স্নান করে যমুনা ও যমরাজের পুজো করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পুরাণ অনুসারে, এই দিনে করা পুজোয় যমরাজ প্রসন্ন হন এবং কাঙ্ক্ষিত ফল দেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए