শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়
বাঁকুড়া জেলার অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব ভাদুপুজো বা ভদ্রাবতীর পরব জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হল বাঁকুড়া জেলার সিমলাপাল থানার ভেলাইডিহা গ্রামে। বাঁকুড়া থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরবর্তী দক্ষিণ বাঁকুড়ার খাতড়া মহকুমার সিমলাপাল ব্লকের ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক গ্রাম ভেলাইডিহা।
রাঢ়বাংলার সবচেয়ে পুরোনো ভৌমরাজ্য সিমলাপাল তালুকের ছ’আনা (২৬২৬৬৬ কের) নিয়ে ১৬১৭ সালে তৈরি হয় ভেলাইডিহা তালুক। সিমলাপাল রাজপরিবারের ভাঙনের পর সিমলাপালের রাজা লক্ষ্মণ সিংহের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ভাই লস্কর সিংহচৌধুরী ভেলাইডিহায় নতুন রাজ্য গঠন করে শাসন শুরু করেন। ভেলাইডিহা তালুকজুড়ে শিল্প, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে জোয়ার আসে। ভেলাইডিহা রাজপরিবারের শেষ রাজা ছিলেন প্রদ্যোৎকুমার সিংহ।
ভেলাইডিহা গ্রামের আশপাশে রয়েছে অসংখ্য গ্রাম, যেমন, অলকাধরা, দোলদেরিয়া, কাশীডাঙা প্রভৃতি। এ বছরও প্রত্যেকটি গ্রামে ঐতিহ্য ও রীতি মেনে আয়োজন করা হয়েছিল ভাদুপুজোর। বাড়ির মহিলারা ঘরে আলপনা এঁকে বেদিতে স্থাপন করেন ভাদুপ্রতিমা। প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধূপধুনো ও রকমারি ফুল দিয়ে আরাধনায় ব্রতী হন। চারপাশে থালাভর্তি জিলিপি, খাজা, গুড়পিঠে, নাড়ু, চিঁড়ে, মুড়কি দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। রাত জেগে চলে বিভিন্ন সুরে ভাদুর গান। ভাদুপুজোয় মন্ত্র বা পুরোহিত লাগে না। হয় না যজ্ঞ। দিতে হয় না উপবাস।
পুরুলিয়ার কাশীপুর রাজ্যের সিং দেও পরিবারের আদুরে কন্যা ছিলেন ভাদু বা ভদ্রাবতী। রাজা নিজে রাজকন্যা ভদ্রাবতীকে একমুহূর্ত না দেখতে পেলে ভীষণ কষ্ট পেতেন। সেই আদুরে রাজকন্যা ভদ্রাবতী ভীষণ অসুখে পড়েন। রাজা বহু চেষ্টাতেও তাঁকে বাঁচাতে ব্যর্থ হন। ভদ্রাবতী বা ভাদু মারা যাওয়ার পর রাজা শোক ভুলতে না পেরে মাটি দিয়ে ভদ্রাবতীর প্রতিমা তৈরি করিয়ে প্রচলন করেন ভাদুপুজোর।
অন্য পোস্ট: নেতাজি ও ডাক্তারজি: আদর্শের দুই ভিন্ন রূপ
কথা বলেছিলাম লক্ষ্মীসাগর গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য এবং পঞ্চায়েতের পূর্ত বিভাগের সঞ্চালক বিশিষ্ট সমাজসেবী সুখেন্দু দাসের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘এমন আড়ম্বরপূর্ণ ভাদুপুজো ও বিসর্জনের অনুষ্ঠান জেলায় আর কোথাও হয় বলে আমার জানা নেই। ভাদুপুজোর পরদিন বিকেলে হয় বিসর্জন। বিসর্জনে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করেন। পুরুষরা নানারকম সাজে সজ্জিত হন। এবারও সেজেছিলেন শিব-দুর্গা, লক্ষ্মী-নারায়ণ প্রভৃতি দেবদেবী, রাজা-ফকির বা অন্য কিছু। এককথায়, নিখাদ বিনোদনের জন্য স্বেচ্ছাসাজে সজ্জিত হন পুরুষ-নারী সবাই। বিসর্জন হয় শীলাবতী নদীতে। বিসর্জনপর্ব চলে বিকেলে ৩টে থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। স্থানীয় পঞ্চায়েত ও প্রশাসন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল। এই পুজোর উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি বাড়িতে প্রচুর আত্মীয়স্বজন এসেছিলেন দূরদুরান্ত থেকে। পুজোর দিন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার ঘরে জিলিপি লাগেই। ঠিক যেন বিজয়া দশমীর আগে অন্য এক বিজয়া উৎসব। প্রতিটি দোকানে জিলিপি কেনার জন্য ভিড় জমে যায়। ভাদু আর জিলিপি যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হয়ে পড়ে।’
এ বছর নিম্নচাপের জেরে প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া এবং আরজি কর কাণ্ডের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ভাদুপুজোর অদম্য উৎসাহকে দমিয়ে দিতে পারেনি। দু’দিন ধরে চলল উৎসব। শিলাবতী নদীর বন্যা কমতেই মাথায় ভাদুপ্রতিমা নিয়ে বিসর্জনের একের পর এক সুদৃশ্য শোভাযাত্রা দেখা গেল। শোভাযাত্রা দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে গিয়েছিল। মোবাইল ফোনে ভিডিয়ো তুলতে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। এবার বিসর্জনে সখীনৃত্য, সঙের গান, সঙের নাচ, ঘোড়ানাচ, ঢাক-সহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র ভেলাইডিহার আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তুলেছিল। ভাদুপুজোর উন্মাদনা ও উৎসব নতুন প্রজন্মকে যেন ভাদুপরবের আঙিনায় নিয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতি ভাদুপরব এখনও যে স্বমহিমাতেই আছে, লক্ষ্মীসাগরের ভেলাইডিহা গেলেই তা আজও বোঝা যায়।


প্রাচীন লোকসংস্কৃতির অঙ্গ ভাদুপুজোকে মহাশোরগোল ডট কম অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ করায় মহাশোরগোল ডট কমকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ।