প্রদীপ্ত চৌধুরী

ছোটবেলা থেকেই একটা জুতসই প্রেমের জন্য মরিয়া ছিল অর্ণব। কিন্তু ‘প্রেম কি যাচিলে মেলে?/ নিজেই উদয় হয় শুভযোগ পেলে।’ কপালটাই খারাপ ওর। পাড়ার অদূরেই ছিল বেশ ভালো একটা কো-এড স্কুল।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ছেলে নারীসঙ্গ করবে? একেবারেই মত ছিল না মায়ের। ফলে ভর্তি হতে হল একটা ছেলেদের স্কুলে। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস টুয়েলভ। মেয়েদের দূর থেকে দেখে দেখেই তার স্কুলবেলাটা কেটে গেল।
আসলে যে সময়কার কথা হচ্ছে, সে সময়টাই ছিল অন্যরকম। বিরক্তিকরভাবে রক্ষণশীল। বছরে একবার পাড়ায় ফাংশন হত। সেখানে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে নাটক করত, গান গাইত, একমাস ধরে রিহার্সাল দিত। কিন্তু অর্ণব শুধু একটু আবৃত্তি করতে পারত। অভিনয় আর গান তার আসত না। গানের দলে ভিড়ে যাওয়ার মরিয়া একটা চেষ্টা অবশ্য সে করেছিল। কিন্তু কপালে নেইকো ঘি/ ঠকঠকালে হবে কী? দলছুট হয়ে গিয়েছিল অচিরেই। একটা কোচিংয়ে পড়ত সে। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়! টিচার ছিলেন অসম্ভব স্ট্রিক্ট। ছেলে আর মেয়েদের ব্যাচ পুরোপুরি আলাদা করে দিয়েছিলেন। ছেলেদের ব্যাচ শেষ হওয়ার ১৫ মিনিট পর মেয়েদের ব্যাচ ঢুকত। ফলে মেয়েদের সঙ্গে আর দেখাই হত না তার।
কলেজেও তেমন নারীসঙ্গ জুটল না। যে দু’-একজনের সঙ্গে তবু একটু-আধটু কথাবার্তা হত, তাদের আবার তার নিজেরই তেমন মনে ধরত না। আর সুন্দরী মেয়েগুলিকে অচিরেই ক্যাপচার করে ফেলত একটু মাচো টাইপ ওভারস্মার্ট ছেলের দল। তাদের সঙ্গেই তারা সিনেমা দেখতে যেত, ফুচকা খেত, হা-হা করে হাসত আর মাঝেমধ্যে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গিয়ে নিবিড় আড্ডা দিত। অর্ণব শুধু দূর থেকেই তাদের দেখত, দীর্ঘশ্বাস ফেলত আর বাড়িতে রেকর্ড চালিয়ে মান্না দে-র বিরহের গানগুলি শুনত।
এমন একটা জঘন্য পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হল অর্ণব অফিসে ঢোকার পর। সেখানে রিমঝিম নামে অন্য ডিপার্টমেন্টের একটি মেয়ের সঙ্গে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। রিমঝিম খুব স্মার্ট, বয়কাট চুল, চোখে-মুখে কথা বলে। একেবারে ডেয়ার ডেভিল মেয়ে বলতে যা বোঝায়, ও ঠিক তেমন টাইপের। কিন্তু অর্ণবকে যে সে বেশ পছন্দ করে, অর্ণব সেটা বুঝতে পারে। তারও বেশ ভালোই লাগে এই রিমঝিমসঙ্গ। একটু মন খুলে সে কথা বলতে পারে। বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিতে পারে।
একদিন অর্ণব তাকে বাড়িতে আনল। সেদিন মা গিয়েছিলেন মাসির বাড়ি। সে অবশ্য তা জানত না। বাবা ছিলেন অফিস টুরে। ফাঁকা বাড়ি। মনে মনে কিছুটা রোমাঞ্চিত আর উত্তেজিতবোধ করল অর্ণব। সে এখন পূর্ণ যুবক। চাকরি করে। একটু রাতের দিকে নিজের ঘরে মাঝেমধ্যে সে একটু-আধটু ড্রিংকও করে। একটু দ্বিধা নিয়েই সাহস করে রিমঝিমকে ভদকা অফার করল সে। রিমঝিমও রাজি হয়ে গেল। এরপর দু’জনে মিলে জমিয়ে তুলল আড্ডার আসর। কয়েক পেগ পেটে পড়ার পরই অর্ণবের নিজেকে বেশ হিরো হিরো মনে হতে লাগল। ঠিক করে ফেলল, আজই রিমঝিমকে ও প্রোপোজ করবে। আর তার ঠিক আগে ওর ঠোঁটে না হোক গালে, বেশ জমিয়ে একটা চুমুও খাবে সে।
কিন্তু মেয়েদের বোধহয় সত্যিই একটা সিক্সথ সেন্স থাকে। অর্ণবের হাবভাব দেখে তার মনের কথা রিমঝিম বুঝে ফেলল। বলল, ‘শোন অর্ণব। তুই কিন্তু আর এগোনোর চেষ্টা করিস না। তোকে বলব বলব করেও বলা হয়নি, আমি কিন্তু লেসবি। পিওর লেসবি। ছেলেদের প্রতি আমি কোনও ইন্টারেস্টই ফিল করি না। আমার একজন গার্লফ্রেন্ডও আছে। পরে একদিন তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।’
সেই প্রথম, আর সেই শেষ। অর্ণব আর প্রেমের পিছনে ছোটেনি। বছর তিনেক পরে সম্বন্ধ করে তার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু জীবনে জুতসই একটা প্রেমের ইচ্ছা তার অপূর্ণই থেকে গেল।
