গৌতম দে

একটা ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছিলাম। পাখিরা উড়ছিল এলোপাথাড়ি। এ গাছ থেকে ও গাছে। এ বাড়ির কার্নিশে তো ও বাড়ির ঘুলঘুলিতে। একটা কালোসাদা বিড়াল বিশ্বাসবাবুদের বাড়ির কার্নিশে চার পা ছড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিল। সেও আমার মতো ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে একছুটে ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে আচমকা ঢুকে গেল। যেসব কুকুর ক্লান্ত শরীরে রাস্তার এদিক সেদিকে পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল, তারাও কোন ফাঁকে ডাকতে ডাকতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে, আমি বুঝতে পারিনি।
এটা ঠিক, আকাশে ঘন মেঘের ফুলেফেঁপে ওঠা এলোমেলো সাঁতার, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। একটু আগে রোদের তাপে তাপিত দুপুরটা পুড়তে পুড়তে সমস্ত শরীর ছাই হয়ে গিয়েছে। সেই ছাইগুলো মেঘের শরীরে লেগে আছে যেন! তাই বুঝি পাখিরা ডাকছে। ডাকছে নয়, কাঁদছে বুঝি! আছাড়িপাছাড়ি কাঁদছে। আবার ঘরসংসার হারাতে হবে।
আবার নতুন করে সবকিছু গড়তে হবে। দিনের বেলায় পাখিরা এমন অন্ধকার সহ্য করতে পারে না বোধহয়!
এ সবকিছু দেখতে দেখতে আমার মনে বদ্ধমূল ধারণা হয়ে উঠল, এটা একটা ভয়ংকর ঝড়ের পূর্বাভাস। পাখিরা যেমন পাচ্ছে, তেমন আমিও। এটা তার লক্ষণ। পাখিদের মতো আমিও টের পেলাম।
রাস্তার ধারে ফুটপাতের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলাম। অনেককেই দেখছি, পাখিদের মতো নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। কেবল আমি ছুটছি না। সটান দাঁড়িয়ে আছি।
এ কথা সত্যি, আমার ভালো লাগছে। সেই সঙ্গে ভয়ও লাগছে। তবুও দাঁড়িয়ে আছি। যানবাহনের গতি বেড়ে গিয়েছে। সবাই তাড়াহুড়ো করছে। ভিড়ের মাঝে ফাঁক খোঁজার চেষ্টা করছে। খুঁজতে খুঁজতে গাড়িগুলো যেন ক্লান্ত হয়ে ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে। শুধু আমার কোনও তাড়া নেই। আর এটাও বুঝতে পারছিলাম, প্রত্যেকের পিছনে একটা ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ভয়টা একটা প্রবল ঝড়। আসবে আসবে করছে।
এরই মধ্যে উড়তে উড়তে দু’টি পাখি আমার সামনে এসে দাঁড়াল। ঠিক সামনে নয়। পাশাপাশি। তারা আমার মতো ভীতু নয় বোধহয়। এটা বুঝতে পারলাম। তাদের মধ্যে একজন অপরজনকে বলল, চল না, ওই শেডের তলায় গিয়ে দাঁড়াই।
মেয়ে পাখিটি জবাবে বলল, না। ওখানে বড্ড ভিড়!
পুরুষ পাখিটি বলল, তোর ভয় করছে না!
মেয়ে পাখিটি জিজ্ঞেস করল, কীসের ভয়?
পুরুষ পাখিটি জবাবে বলল, ঝড়ের।
এই একটি শব্দে মেয়ে পাখিটি খিলখিল করে হেসে উঠল। কখনও দু’হাতে মুখ চেপে। আবার কখনও গলা ছেড়ে। তার যেন হাসি থামে না। হেসেই চলেছে।
আমি আতঙ্কিত এক ব্যক্তি। পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। এটুকুও খেয়াল নেই তাদের। মেয়ে পাখিটি তখনও হাসছে। আমার মতো ভীতসন্ত্রস্ত পুরুষ পাখিটি তখনও তার দিকে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে আছে।
মেয়ে পাখিটি আবার বলল, আমি এমন ঝড় দীর্ঘদিন বুকে নিয়ে বেঁচে আছি, তা জানিস?
পুরুষ পাখিটির বিহ্বল চোখের পাতা পড়ে না। সে তেমন ভাবেই বলল, তাই নাকি?
মেয়ে পাখিটি আবার হেসে উঠল। তারপর বলল, তোর বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি আমার কথা? আমি জানতাম, তোর বিশ্বাস হবে না।
পুরুষ পাখিটি কোনও উত্তর দেয় না। তার বিহ্বল চোখের পাতা দুব্বো ঘাসের মতো খাড়া হয়ে উঠল।
মেয়ে পাখিটি আবার বলল, জানি, তুই বিশ্বাস করবি না আমার কথা। অনেকেই করে না। বলতে বলতে মেয়ে পাখিটি আরও সিরিয়াস হয়ে উঠল। আরও গম্ভীরভাবে বলল, এখনও আমার শরীরে ভয়ানক ঝড়ের দাগ রয়েছে তা জানিস?
পুরুষ পাখিটির মুখে আর কথা নেই। তার হলুদবর্ণ ঠোঁট ক্রমাগত কালো হয়ে উঠছে।
মেয়ে পাখিটি এবার জিজ্ঞেস করল, তুই কি আমার কথা শুনে ভয় পেলি?
পুরুষ পাখিটি কোনও উত্তর দেয় না।
আমি আকাশের দিকে তাকাই। মনে হল, কাঠবিড়ালির লেজের মতো মেঘগুলো অনেক নীচে নেমে এসেছে। বড় বড় লম্বা লম্বা বাড়িগুলো খুব চিন্তায় আছে। একটা বড় যুদ্ধের আতঙ্কে তারা জড়োসড়ো। নিজেদের মধ্যে কাছে আসার চেষ্টা করছে কিংবা হাত ধরাধরি করে এগিয়ে আসায় এখন তাদের ক্ষতি নেই।
এরকম আতঙ্কিত পরিবেশ দেখেও মেয়ে পাখিটির মনে একটুও আতঙ্কের দোলা নেই। সে স্বাভাবিক। আগের মতোই। সে আগেই বলেছে, এমন ঝড়ঝাপটার কামড় আঁচড়ের দাগ তার সমস্ত শরীরে। পুরুষ পাখিটিকে আজ সে প্রথম বলল। আর তাতেই পুরুষ পাখিটি টলে গিয়েছে। কিছুতেই তার চোখের পাতা পড়ে না। এত দিন সে মেয়ে পাখিটির পাশে ছিল। ভালো লাগা, ভালোবাসা, এ দু’টি শব্দ শরীরের ভিতর দোলনার মতো দুলত। সেই দোলনায় দুলতে দুলতে মেয়ে পাখিটির বাদামি ঠোঁট থেকে কোন ফাঁকে রং চুরি করত। মেয়ে পাখিটি জানতেই পারত না। মেয়ে পাখিটির হৃদয়ে তখন সমুদ্রের ঢেউ। ছোট থেকে অনেক বড় হয়ে পুরুষ পাখিটির বুকে আছড়ে পড়ত। মেয়ে পাখিটি বাকরহিত হয়ে যেত। তার বাদামি ঠোঁট থেকে ঝরে পড়ত কাঁপন। সেই কাঁপনের রিনরিন ধ্বনি পুরুষ পাখিটি হলুদ ঠোঁটে তুলে নিত। মেয়ে পাখিটি বুঝতেও পারত না। তবুও মেয়ে পাখিটি কাতর কণ্ঠে বলত, আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না।
পুরুষ পাখিটি বলত, আমিও। আমার ঠোঁটে তোর কাঁপন।
মেয়ে পাখিটি বলত, এবার একটু আড়াল দরকার।
পুরুষ পাখিটির মুখে জয়ের হাসি। সেই হাসি নিয়ে বলত, এই তো আমাদের দু’জোড়া ডানা আছে। ছড়িয়ে দেব। ভয় কী!
মেয়ে পাখিটির আতঙ্কহীন কথাবার্তায় আমি একটু বল-ভরসা পাই। একটু সরে আসার চেষ্টা করি তাদের দিকে।
এটা ঠিক, একটা কৌতূহল আমাকে ঠেলে দিয়েছে তাদের দিকে। যদিও আমি তাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়।তবুও লজ্জার মাথা খেয়ে আমার শরীরের ডানদিকের কানটা আচমকা রথের বাঁশির মতো লম্বা হয়ে উঠল। কী যেন বলছে মেয়ে পাখিটি, শোনার চেষ্টা করি।
মেয়ে পাখিটি আবার বলল, তুই আমার কথার কোনও উত্তর দিলি না।
পুরুষ পাখিটি তখনও নীরব। তার হলুদ ঠোঁটে আগের মতো জেল্লা নেই। অনেকক্ষণ পর একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল, আমি ঝড়কে ভীষণ ভয় পাই।
এটুকু কথার মধ্যে সত্যিকারের ঝড় বড় বড় বাড়ির মাথার উপর দিয়ে ধেয়ে এল। একটা ভয়ংকর উল্লাসে পাক খেতে খেতে আছড়ে পড়ল মাটিতে। কত জীবিত পাতা, কত মরা পাতা, কত রক্তমাখা আবর্জনা, কত দুর্ঘটনা, কতরকমের ইতিহাস ছেঁড়া ঠোঙা হয়ে ঘুরতে লাগল বনবন করে। আমার পাজামা আর পাঞ্জাবিতে বাতাসের তীব্র উল্লাস। টের পাচ্ছি। আমাকে বোধহয় উড়িয়ে নিয়ে ফেলবে কোথাও! কিছুই চোখে দেখা যায় না।
সামনের বাড়ি, গাছগুলি সব ভ্যানিস হয়ে গিয়েছে যেন! সব ধোঁয়াশা আর ধোঁয়াশা। আমি তবুও ডানদিকে তাকাই। তাকানোর চেষ্টা করি। দেখি, পুরুষ পাখিটি উধাও। আশপাশে তাকাই। নেই। সে বুঝি নিরাপদ আশ্রয়ে উড়ে গিয়েছে। আমি হাতের তালু দিয়ে নিজের দু’চোখ আড়াল করতে করতে আশ্চর্য হয়ে দেখি, মেয়ে পাখিটি নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে উড়ে যাচ্ছে ঝড়কে সঙ্গী করে। স্পষ্ট দেখলাম, তার সমস্ত শরীরে ভয়াবহ আগুন জ্বলছে। কেবল আমিই দেখতে পাচ্ছি!
