
অজয় ভট্টাচার্য
অনেক সময় আমরা বলি, ‘এটা আমার হাত’। এর অর্থ হল, হাতটা আমি নই। আবার আমরা বলি, ‘এটা আমার পা’। তার মানে পাটাও আমি নই। আবার এরকমও বলি, ‘এটা আমার চোখ’ বা ‘এটা আমার কান’ প্রভৃতি। তাহলে চোখ বা কান— এগুলিও আমি নই।
অনেক সময় আমরা বলি, ‘এটা আমার শরীর’। তার মানে শরীরটাও আমি নই। কেউ মারা যাওয়ার পর তাঁর আত্মীয়স্বজন নিশ্চয় জানতে চাইবেন, ‘বডি কখন শ্মশানে নিয়ে যাবে?’ কেউ বলবে না, তাঁকে কখন শ্মশানে নিয়ে যাবে। এর অর্থ হল, ওই শরীরটায় আর তিনি নেই।
কেউ কেউ বলেন, একটি মানব শরীর যা দিয়ে গঠিত, তার মূল্য মাত্র ১০ ডলার। কিন্তু Harold Morowitz পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, মানবদেহ গঠনকারী রাসায়নিক উপাদানের মোট মূল্য ১০ মিলিয়ান ডলারের মতো। মূল্য যাই হোক না কেন, লজিক্যালি প্রমাণিত হল, শরীরটাও আমি নই।
তাহলে ‘আমি’কে? আমাদের দৃশ্যমান জগৎ cause and effect-এর নিয়মে আবদ্ধ। Effect (ফল) দেখা যায়, কিন্তু Cause (কারণ) দেখা যায় না। গাছ থেকে আপেল পড়ল— এটা দেখা যায়। কিন্তু এর পিছনে যে কারণটি আছে, সেটি দেখা যায় না। এমনকী আমাদের কোনও ইন্দ্রিয় তাকে অনুভব করতে পারে না। অতীন্দ্রিয় দিয়ে সেই অভিকর্ষকে দেখতে পেয়েছিলেন বিজ্ঞানী নিউটন।
সুতরাং প্রমাণিত হল, আমরা যাঁরা সাধারণ মানুষ, তাঁদের জানা-বোঝার বাইরে অনেক কিছু থাকে। ওই মৃত মানুষটি যখন বেঁচে ছিলেন, তখন তাঁর যে Activities দৃশ্যমান ছিল, তা হল Effect বা ফল। আর তার পিছনে যে কারণটি ছিল, সেটি ছিল অদৃশ্য। এই অদৃশ্য কারণটিই ‘আমি’। যে মুহূর্তে কারণটি তাঁর ভিতর থেকে সরে পড়ল, তখন থেকে সকল Activities-এর ক্ষমতা বিলুপ্তি হল। এমনকী তাঁর শরীরের মধ্যে এতদিন ধরে সযত্নে যে কীটগুলি বাসা বেঁধেছিল, তাদের আক্রমণ থেকে শরীরটাকে বাঁচানোর ক্ষমতাও তাঁর আর থাকল না। থাকবে কী করে, যে কারণ বা শক্তির জন্য তাঁর Activities ছিল, তা তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছে।
বিজ্ঞান বলছে, শক্তির বিনাশ নেই। তা এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হয়। গীতা সেই শক্তিকে বলেছে আত্মা (Soul)। আত্মার জন্মান্তর ঘটে। জন্মান্তরের অর্থ রূপান্তর। উভয়ের বক্তব্য একই, শুধু ভাষা আলাদা।
স্বামী অভেদানন্দের একটি পৃথিবী বিখ্যাত বই আছে। বইটির নাম Reincarnation. ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় পাওয়া যায়। অনেক আগে, যখন FM radio নতুন এসেছে, তখন একটি FM Channel-এ রাতের দিকে স্বামী অভেদানন্দের বইটিকে কেন্দ্র করে একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান হত। শেষের দিকে তৎকালীন কিছু প্রগতিশীল ব্যক্তির বিরোধিতায় ওই অনুষ্ঠানটি অকালে বন্ধ হয়ে যায়।
Biophysics এবং Biochemistry-র অধীত জ্ঞান বলে, শরীরে চলতে থাকা অসংখ্য বিক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত শক্তিই আমাদের চেতনাকে সম্পৃক্ত করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কার নির্দেশে এই বিক্রিয়াগুলি সুশৃঙ্খলভাবে চলতে থাকে এবং কেনই বা একসময় বন্ধ হয়ে যায়? ঠিক কোন অপটিমাম কন্ডিশনে মায়ের পেটে শিশুর হৃদস্পন্দন শুরু হয়? এখনও জগতের কেউ তা জানে না।

