শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

স্বাধীনতার আগে জন্মের পর থেকে শিশুদের খাওয়ানোর এমন তরিবত ছিল না। স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশক তেমন অবস্থাই ছিল। পরবর্তী সময়ে শিশুদের খাওনোর পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান সময়ে শিশুর খাওনোর সময় মা কিংবা অন্যরা তার হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেন। মাসখানেকের শিশুকে ফিডিং বটলে দুধ বা জল খাওয়ানো হয়। আগে এমনটি ছিল না। সাবেকদিনে মা-ঠাকমারা শিশুকে কোলে শুইয়ে গলায় কাপড় ঢাকা দিয়ে গোঁদলে করে দুধ খাওয়াতেন। শিশু গোঙিয়ে কাঁদত। পাত্রে থাকা দুধ, বার্লি, জল, সাগু গোঁদলে করে তুলে শিশুর হাঁ-মুখে ঢেলে দিতেন। হাত-পা ঝিঁকে (ছুড়ে) শিশু খুব কাঁদত।
আজকের প্রজন্ম গোঁদল কী, জানে না। গ্রামবাংলায় আজও খুব কম ঘরে তা দেখা যায়। গোঁদল তামা, পেতল, জার্মান বা রুপো দিয়ে তৈরি হত। দেখতে অনেকটা প্রদীপের মতো। সামনে আঙুল দিয়ে ধরার মতো ছোট্ট চ্যাপটা হাতল থাকত।
বর্তমানে খেলাধুলা করার সময় পড়ে গিয়ে শিশুর চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বেরোলে পরিবারে কী না ঘটে গেল অবস্থা হয়! ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি, আরও কত কী! ছয়-সাতের দশকে খেলাধুলার সময় বা দৌড়তে গিয়ে পড়ে গিয়ে রক্ত বের হলে শিশুরা পরিবারে জানাতই না। ক্ষতস্থানে রাস্তার ধুলো বা দূর্বাঘাস চিবিয়ে লাগিয়ে নিত। আর আজকাল খেলাধুলার সময় পড়ে গিয়ে শিশুর চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বেরোলে ঘরের বাবা-মা-ঠাকুমারা হইচই শুরু করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে ছুটে যান। ছয়-সাতের দশকে এরকম হলে বাবা-মা-ঠাকুমারা ক্ষতস্থানে পান, খাওয়ার চুন লাগিয়ে দিতেন। সেসব দিন আজ অতীত। তখন পাঠশালা বা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালীন পিঠে-হাতে বেতের ঘা পড়েনি, এমন ছাত্রছাত্রী খুঁজে পাওয়া যেত না। পড়ুয়া ঠ্যাঙানোর সবচেয়ে খ্যাতনামা ছড়ির নাম ছিল বোয়ন ছড়ি। একশতক আগেও বেতগাছের সরু কাণ্ডের খুব নামডাক ছিল। বেতগাছ থেকে তৈরি বলে ছড়ির নাম হয়ে গিয়েছিল বেত। পরবর্তী সময়ে বেতের অভাবে বোয়ান, খেজুর, নিম, অন্যান্য সরু গাছের দণ্ড বেত হিসাবে ব্যবহার হত। স্যাররা শ্রেণিকক্ষে আসতেন ছড়ি হাতে নিয়ে। ছড়ির ঘা ছাড়াও থাপ্পড়, কানমলা, আঙুলে পেনসিল ঢুকিয়ে চাপ দেওয়া, টেবিলের তলায় মাথা ঢুকিয়ে পিঠে গুম-গুম সজোরে মারা, হাঁটু গেড়ে বসা, কানধরে ওঠাবসা, বেঞ্চের উপর দাঁড়ানো, ডাস্টার ছুড়ে মারা, ডাস্টার দিয়ে মাথায় মারা প্রভৃতি আরও যে কত ধরনের শাস্তি ছিল, তার ইয়ত্তা ছিল না। এত ধরনের শাস্তি পেয়েও ছাত্রছাত্রীরা ঘরে ফিরে চুপ করে থাকত। কিছুই বলত না। পরিবারের কাউকে বললে হিতে বিপরীত হত। স্কুলে মার খাওয়ার জন্য বাবা ও মায়ের কাছে ততোধিক পিটুনি জুটত।
বর্তমানে স্কুলে স্যারদের হাতে ছাত্রছাত্রীদের কোনও ধরনের শাস্তি পেতে হয় না। সেসব দিন আজ অতীত। তখন তরল মাপার জন্য দশন, টুয়া ব্যবহার হত। কেরোসিন মাথায় করে ফেরি করে যেতেন কেরোসিনওয়ালা। ‘পাট’ হিসাবে কেরোসিন বিক্রি হত। কেরোসিনের টিনে পেটমোটা, লম্বা ঘাড়ের সরু একধরনের কাচের বোতল থাকত। সেই বোতলকে বলা হত ‘পাট’। তখন আনা পয়সার যুগ। একটাকার অনেক মূল্য ছিল তখন। দু’আনা অর্থাৎ ১২ পয়সায় একপাট কেরোসিন মিলত।
গাঁয়ের গোলদারি দোকানেও কেরোসিন পাওয়া যেত। তবে তা টুয়া বা দশন মাপে দেওয়ার রীতি ছিল। সরষের তেল টুয়া বা দশন পাপেই মিলত। ছয়ের দশকেও সের হিসাবে মাছ, মাংস প্রভৃতি বিক্রি হত। সরকারিভাবে ওজনের একক কিলোগ্রাম বাজারে চালু হলেও সের বহুদিন চলেছিল। পাই, কনা, চৌটির ব্যবহার খুব ছিল। গাঁয়ের গোলদারি দোকানে পাই, কনা, চৌটি হিসাবে বিভিন্ন ডাল বিক্রি হয়েছে। গাঁয়ে গাঁয়ে খড়িমাটির ফেরিওয়ালারা পাই মাপে খড়িমাটি বিক্রি করতে আসতেন। মুড়ি, চাষির ঘরের চাল প্রভৃতি পাইয়ে মেপে দেওয়া-নেওয়া চলত। জমিদারের খামারের ধান পাইয়ে মেপে ভাগ হত।
এসব কিছুই বর্তমানে হারিয়ে যাওয়ার অবস্থায়। অনেকাংশেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গিয়েছে। ঘরে-ঘরে মশলা বাটার শিল-নোড়া আজ হারিয়ে যাচ্ছে। অতীতে ঘরের সম্পদ ছিল পাথরের শিল ও নোড়া। ঘরের বধূরা বাটনা বাটা শিল বলতেন। বাজার, গাজন মেলায় শিল-নোড়া কিনতে পাওয়া যেত। (চলবে)
