Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বাংলা সাহিত্যে নদী

Share Links:

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রাক্তন সংস্কৃতি অধিকর্তা এবং সাহিত্য অকাদেমি, বঙ্কিম, বিএফজেএ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক

নদী, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?

নদীর অবিশ্রান্ত বহমান স্রোতের ধ্বনির মধ্যে লেখক শুনতে পেতেন, ‘মহাদেবের জটা হইতে’৷ লেখক অবশ্য নদীর এই উত্তর শুনে নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকতে পারেননি। তিনি বেরিয়েছিলেন ভাগীরথীর উৎসসন্ধানে৷ বহু পাহাড়–পর্বত ডিঙিয়ে বহু পথ পার হয়ে দেখে এসেছিলেন নদী ‍‘কোথা ‍হইতে’ আসে, দেখেছিলেন ভাগীরথীর উৎসের এক আশ্চর্য রূপ— সেই কুজ্ঝটিকাময় জটাজাল৷

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির আমন্ত্রণে বাংলা সাহিত্যে নদীর কথা ভাবতে গিয়ে আমাকেও রওনা হতে হল নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসের সন্ধানে৷ নদীমাতৃক বাংলার সাহিত্য রচনার একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে৷ প্রাচীনকালে এক জনপদের সঙ্গে আর এক জনপদের যোগাযোগের সূত্র বলতে ছিল প্রধানত নদীই৷ নদীর দু’পার জুড়ে সভ্যতার গড়ে ওঠাটাই ছিল স্বাভাবিক৷ বাঙালির নিশ্চয় মনে পড়ে যায় সরস্বতীর মজে যাওয়া ও সপ্তগ্রামের বাণিজ্যহ্রাসের গল্প, যে কারণে সপ্তগ্রামের বাসিন্দারা বাস উঠিয়ে চলে এল হুগলি নদীর মোহানার তীরে৷ সেই পত্তন জন্ম দিয়েছিল সুতানুটি, কলকাতা, গেবিন্দপুরের, যা ক্রমে খ্যাত হয়েছে শহর কলকাতা নামে৷ এরকম বহু নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বাংলার নানা জনপদ। সেই জনপদের জীবনযাপন, সুখ–দুঃখ, প্রেম–বিরহ, উল্লাস–যন্ত্রণা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে রচিত হয়েছে বহু বিখ্যাত উপন্যাস৷ বহু উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে নদী ও নদীর অনুষঙ্গ৷

আচার্য জগদীশচন্দ্র নদীর উৎস খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন দুর্গম পথে৷ আমার শৈশব–কৈশোরের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এক নদী— ইছামতী৷ ঠাকুরদার মুখে শুনেছি, দেশভাগ হওয়ার পর তিনটি পরিবার রাতারাতি বিছানা, বালিশ, লেপ আর রান্নার সরঞ্জাম গরুর গাড়িতে চাপিয়ে চলে এসেছিল এপার বাংলায়। ইছামতীর ধারে পতিত জমির ঝোপজঙ্গল কেটে বসতি গড়েছিল তারা৷ আমি ছিলাম তাদেরই একটি পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য৷ জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ইছামতী আমার নিত্যসঙ্গী৷ বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে খেলাধুলোর পাট না থাকলে আমরা ছোটরা গিয়ে বসতাম ইছামতীর তীরে পা ঝুলিয়ে। ভাটা থাকলে সে নদীর রূপ একরকম, আর জোয়ার এলে ইছামতীই উঠত ফুলেফেঁপে। বাড়তে বাড়তে একসময় তার জল এসে ছুঁয়ে যেত পায়ের পাতা। তারপর গ্রাস করত গোড়ালি। হাঁটু ছুঁইছুঁই হলেই হাফপ্যান্ট ভিজে যাওয়ার আগেই উঠে পড়তাম কিনারা থেকে৷ তখন হয়তো চেপে বসতাম খেয়ানৌকোটিতে। তার পাটাতনে বসে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে পারাপার করতাম, যতক্ষণ না ঘনিয়ে আসত অন্ধকার৷

নদী নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘ঘাটের কথা’ লেখা বাংলা ১২৯১ সালে৷ গল্পটি পড়ার পর মনে পড়েছিল, নিচু ক্লাসে প্রায়ই একটি রচনা লিখতে হত সে সময়— ‘একটি নয়াপয়সার আত্মকাহিনি’ বা ‘একটি নদীর আত্মকথা’ বা ‘একটি রাজপথের কাহিনি’৷ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ৩০ বছর বয়সে জীবনের তৃতীয় গল্পে একটি ঘাটের জবানিতে লিখেছেন কুসুম নামের একটি কিশোরীর করুণ কাহিনি৷ নদীর ঘাটে সারাদিন কত মানুষ আসে কত কাজে। প্রত্যেকের জীবনেই কিছু না কিছু গল্প তৈরি হতে থাকে তাদের অজান্তেই৷ নদীর ঘাট সে কাহিনির নীরব সাক্ষী৷ সে নীরবতা ভেঙে ঘাট গল্প বলে চলেছে এক অদৃশ্য শ্রোতার উদ্দেশে৷ রবীন্দ্রনাথ তার চেয়েও করুণ কাহিনি লিখেছেন ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে৷ বহুকাল পরে এই সেদিনও রতনের কথা পড়তে গিয়ে চোখের কোণে কেন জল ভরে এল, তা বুঝতে গিয়ে আমি হতবাক৷ কৈশোরে যে গল্প পড়েছি পাঠ্যপুস্তকে, তার লাইন উদ্ধৃত করে ব্যাখ্যা করেছি, লিখেছি তার সারাংশ, সে গল্প আজও চোখের কোল ভিজিয়ে দেয়, এ তো ভারী আশ্চর্য ঘটনা! ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’-এ পৌঁছেও একই অভিজ্ঞতার শরিক৷ পড়তে গিয়ে মনে হয়, রতন আর রাইচরণ দুই ভিন্ন পৃথিবীর বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও কোথাও যেন তাদের নিয়তি একই তারে বাঁধা৷ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইছামতী’ পড়েছি স্কুলের একটু উঁচু ক্লাসে উঠে৷ বইয়ের নাম ‘ইছামতী’ বলে উপন্যাসটির প্রতি আমার অন্য আকর্ষণ৷ পড়তে গিয়ে অবশ্য বুঝেছিলাম, ইছামতীর তেমন প্রাধান্য নেই উপন্যাসে। নদীতীরের নীলকুঠি ও সেখানকার কর্তা শিপটন সাহেব উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু৷ নদীপাড়ে সার সার নীলকুঠি ও সাহেবদের অত্যাচার, সেই সঙ্গে ইছামতীর তীরবর্তী মানুষদের জীবনযাপন ও বেঁচে থাকার টানাপোড়েন নিয়ে এই উপাখ্যান৷

নদীর প্রাধ্যন্য রয়েছে, এমন দু’টি উপন্যাসের একটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’, অন্যটি অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’৷ দু’টি উপন্যাসের মধ্যে তুলনা হয়, আবার হয়ও না৷ হয়, কেন না দু’টি উপন্যাসই গরিব মাছমারাদের জীবন নিয়ে রচিত৷ নদী যাদের ভরণ–পোষণের একমাত্র ভরসা, নদীর শরীর ভালো থাকলে তারা ভালো থাকে, নদীর অসুখ করলে তারাও…৷ আবার অনেকে তুলনা করতে চান না, কেন না অদ্বৈত ছিলেন মালোপাড়ারই একজন। তিনি সেই পরিবশ থেকে উঠে এসে রচনা করেছেন তাঁদেরই জীবন–ইতিহাস৷ ধনুকের মতো বাঁকা তিতাস নদীর তীর ঘেঁষে দক্ষিণপাড়ায় ছোট ছোট ঘর বেঁধে বাস করে মালো সম্প্রদায়৷ উপনাসের আরম্ভে অদ্বৈত যে দার্শনিক বচনটি সঞ্চারিত করেছেন পাঠকমনে, তা উল্লেখনীয়৷ ‘নদীর একটি দার্শনিক রূপ রহিয়াছে৷ নদী বহিয়া চলে৷ কালও বহিয়া চলে৷’ নদীর শান্ত চেহারার মতোই তাদের নিরীহ–নির্বিরোধী জীবনযাপন৷ লেখক তাদেরই একজন হওয়ার ফলে স্থানিক পরিসীমার মধ্যে ঘটমান কাহিনি গণ্ডির বৃত্ত অতিক্রম করে লাভ করেছে এক অসীম ব্যাপ্তি৷

অদ্বৈত যে চোখে মালোদের জীবন দেখেছেন, স্বভাবতই মানিক দেখেছেন সম্পূর্ণ অন্য চোখে৷ মালোপাড়ার বৃত্তের বাইরে থেকে রচনা করেছেন তাঁর ‘পদ্মানদীর মাঝি’৷ পাঠকের পক্ষে উপলব্ধি করা সহজ, মানিকের দেখা হবে অন্যরকম৷ পাঠকের মনে হতেই পারে, কোনও একটি জীবন বাইরে থেকে দেখা মানে সে দেখা অসম্পূর্ণ, কিন্তু উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা পাঠককে বলে অন্য কিছু৷ মানিকের উপন্যাস পড়লেই অনুভব করা যায়, তিনি তাদের মধ্যে বড় না হয়ে উঠলেও তাদের দেখেছেন খুব কাছ থেকে৷ তাদের জীবনযাপন তাঁর না-জানা, তা নয়৷ আর এও তো ঠিক, লেখক জীবন গবেষকও৷ নাই বা জন্মালেন তাদের সমাজে৷ তাদের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে দেখে, পর্যবেক্ষণ করে, অনুভব করে কেন লেখা যাবে না! উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’ এক প্রান্তিক মানবজীবনের সঙ্গে নদী ও নারীর রহস্যময় সংযোগ, অস্তিত্বের টানাপোড়েনে অন্ত্যজ জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রামশীলতা ও তাদের চাওয়া ও না–পাওয়ার আখ্যান৷ যে পদ্মা মানুষের অস্তিত্বগ্রাসী, সেই প্রাকৃতিক বিরুদ্ধাচরণের মধ্যেও বেঁচে থাকার লড়াই এই উপন্যাসের বিষয়৷

দু’টি উপন্যাসেই মাছমারাদের জীবনযাপনের এক অত্যাশ্চর্য জলছবি৷ এ বিষয়ে আমার নিজের অভিজ্ঞতা সামান্য হলেও জানাই৷ আমি যে গাঁয়ে বড় হয়েছি, সেখানে পাশাপাশি দুটো জেলেপাড়া৷ তার একটির সামান্য দূরত্বে আমাদের ভিটে৷ তাদের বাড়ির একটি বালক আর আমি পড়েছি একই ক্লাসে, একই স্কুলে৷ সকাল–বিকেল তাদের সঙ্গে দেখা৷ চলাচলের পথের পাশে তাদের সার সার বাড়ি৷ তাদের বাড়ির পুরুষরা উঠোনে বসে জাল বোনে। সেই জাল বোনা দেখা ছিল আমার প্রিয় বিলাস৷ তারা নদীতে গিয়ে খ্যাপলা জাল ছুড়ে মাছ ধরার সময় আমরা প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করতাম, কী কী মাছ উঠে আসবে তাদের জালে৷ দু’–একবার আমরাও তাদের জাল হাতে নিয়ে কায়দা করে ছুড়ে দেখতে চেষ্টা করেছি, কী মাছ ধরা পড়ে আমাদের এলেমে৷ তাদের পাড়ায় মনসার ভাসান শুরু হলে সে গান চলত টানা তিন দিন তিন রাত৷ তাদের বাড়ির মেটে দাওয়ায় জেলেপাড়ার যাবতীয় মেয়ে–বড় দল বেঁধে গাইত কখনও কোরাসে, কখনও সোলো৷ গান চলত রিলে রেসের মতো৷ টানা তিন কি চার ঘণ্টা গাওয়ার পর একদল উঠে চলে যেত তাদের রান্নাবাড়া করতে, খেতে বা শুয়ে বিশ্রাম নিতে। অন্য দল শুরু করত ফেলে যাওয়া গানের শেষ পঙ্‌ক্তি থেকে৷ সে গান শুনতে আমাদের বামুনপাড়ার সবাই ভিড় জমাত সকাল–সন্ধে৷

কখনও গান শুনতে অনেক রাত হয়ে যেত৷ ইছামতীতে মাছ ধরা, মাছ কমে এলে মাছের তল্লাসে তাদের পুরুষদের সমুদ্রে বেরিয়ে পড়া ছিল রোজনামচার মতো৷ ডিঙি সাজিয়ে সেই সমুদ্রযাত্রা ছিল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা৷ সে বিবরণ লিখেছি ‘সমগ্র শঙ্খচিল’ উপন্যাসে৷

আমি অনুভব করেছি, অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাসের সুর যে তারে বাঁধা থাকবে, তা সম্ভব নয় মানিকের পক্ষে৷ কিন্তু মানিকের দেখাও তো এক অন্য দেখা৷ একটু দূর থেকে দেখলে মানুষের জীবনের অনেক ভিতর পর্যন্ত দেখা যায়৷ সে দেখার মূল্য অন্যরকম৷

নদীকেন্দ্রিক উপন্যাস বলতে মনে পড়ে ‘নদী ও নারী’র কথা৷ হুমায়ুন কবীরের চার খণ্ডে ভাগ করা এই উপন্যাস তেমন মহাকাব্যিক জীবনের আধার না হলেও ডকুমেন্টেশন লক্ষ করার মতো৷ এখানেও নদীর নাম পদ্মা৷ পদ্মা পেরিয়ে খাজনা আদায়ের উদ্দেশে যাওয়ার পথে ঝড়ে পড়ে নজুমিয়া। ঝড় কাটিয়ে সে আর ঘরে ফিরতে পারেনি। ফলে ঝড় উঠেছিল উপন্যাসের অন্য চরিত্রগুলির মধ্যে৷ নজুমিয়ার মৃত্যুর পর নতুন পঞ্চায়েত হল তারই বন্ধু আসগর। শুধু তাই নয়, নজুমিয়ার ছেলে মালেকের দায়িত্বও নেয় আসগর৷ আসগরের স্ত্রী আমিনার সন্তান নুরুর প্রেমে পড়ে যায় ডাগর হয়ে ওঠা মালেক। ঠিক তখনই জানা যায়, আমিনা আগে ছিল নজুমিয়ারই স্ত্রী। তারই গর্ভে মালেকের জন্ম৷ আসগরের প্রেমে পড়ে আমিনা পালিয়ে যায় তার সঙ্গে৷ অতএব মালেক ও নুরু একই মায়ের সন্তান৷ এই ভয়ংকর জটিলতার আবর্তে পড়ে মালেক পালিয়ে যায় বহু দূরে, নুরুর ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ পদ্মানদী এই উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র হলেও মুসলমান সমাজের এক অদ্ভুত জটিল সম্পর্ক নিয়েই এ উপন্যাস৷

সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’র কাহিনিও গঙ্গার তীরবর্তী জনপদের মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে৷ আষাঢ় থেকে আশ্বিন, চার মাস মিঠেজলে মাছ ধরে জেলেরা৷ এখানেও তৈরি হয়েছে নদী ও নারী নিয়ে এক অন্য টানাপোড়েন৷ আতপুরের মাঝিমাল্লাদের জীবন, বিলাস, পাঁচু, মৃতের বউ, হিমিকে নিয়ে আর এক জটিলতা৷

নদীপারের জীবন নিয়ে যেমন বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে এত সব বিখ্যাত উপন্যাস, তেমন নদীর আরও বহু রূপ আছে, যা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ধরা পড়েছে লেখকের কলমে৷ নলিনী বেরার উপন্যাস ‘শবরচরিত’ -এ ধরা পড়েছে সুবর্ণরেখার ধারা৷ কখনও ভেসে উঠেছে কবিতার মতো ধ্বনি ছড়িয়ে ছোট্ট ডুলুং৷ আমার ছোটবেলায় ঠাকুরদা প্রায়ই বলতেন, ‘নদীর ধারে বাস/ ভাবনা বারো মাস’৷ কেমন ভাবনা, তা তখন ঠিক বুঝিনি৷ নদীর ধারে বসে এক একটা বিকেল ভরে তুলতাম রকমারি অভিজ্ঞতায়৷ বেশ কাটছিল নদীর সান্নিধ্যে। হঠাৎ একদিন শোনা গেল, ষাড়াষাড়ির বান আসছে ইছামতীতে৷ সবাই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছি উঁচু হয়ে আসা সেই বান দেখতে। তিনি এলেনও দু’কূল প্লাবিত করে। কী উঁচু সে বানের জল! একটু পরেই বানের জল ক্রমশ বাড়তে শুরু করে৷ কিনারা ছাপাতে পিছু হঠতে শুরু করি৷ দেখি, আমাদের পিছনে ধাওয়া করে আসছে বানের স্রোত৷ ছুটতে ছুটতে বাড়ির চৌহদ্দির ভিতর ঢুকেও দেখি, জল আমাদের পিছু ছাড়েনি৷ উঠোনে তখন গলগল করে জল ঢুকছে৷ একহাঁটু জল হতেই আমাদের বুকে একইসঙ্গে ত্রাস ও উল্লাস৷ নদী তা হলে আমাদের উঠোনেও চলে এসেছে! এতদিন উঠোনে হাঁটু পর্যন্ত পা ডুবিয়ে ঘুরছি ফিরছি। হঠাৎ দেখি, কাকারা আর ঠাকুরদা–ঠাকুমা মিলে হুড়োহুড়ি করছে এ ঘরে ও ঘরে৷ সম্বিৎ ফিরতে বুঝি, উঠোনের জল আর একটু বাড়লেই তো ঢুকে পড়বে ঘরের ভিতর৷ মেঝেয় ছড়ানো যাবতীয় সংসারের জিনিসপত্র ভিজে একশা হবে এক্ষুনি৷ তার একটু পরেই অবশ্য ভাটা পড়ে যাওয়ায় জলের গতি রুদ্ধ৷ ইছামতী যেমন এসেছিল, গা দুলিয়ে তেমনই ফিরে যেতে শুরু করে একটু একটু করে৷ তারপর আরও দু’দিন সকাল–সন্ধে নদীর এমন বাড়বাড়ন্ত চেহারা৷ তত দিনে পঞ্জিকার তিথি প্রতিপদ পেরিয়ে দ্বিতীয়া–তৃতীয়ার দিকে ধাবমান। ফলে নদীর পক্ষে আর আমাদের উঠোনে বেড়াতে আসা সম্ভব হয়নি৷

কলেজে পড়তে কলকাতা চলে আসায় ইছামতীর সঙ্গে আর দেখা হয়নি বহুকাল৷ অনেক বছর পরে একদিন দেশের বাড়িতে গিয়ে নদীর সঙ্গে পুরোনো বন্ধুত্ব ঝালাই করতে গিয়ে আঁতকে উঠে দেখেছিলাম, নদী আর নদী নেই। চড়া পড়ে এই এতটুকুনই৷ সেই খেয়া তো নেই-ই, মজে আসা নদীর উপর একটা কাঠের সেতু৷ নীচে চরের রাজত্ব৷

নদীর চর নিয়েও বাংলা সাহিত্যে লেখা হয়েছে অনেক বিখ্যাত উপন্যাস৷ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালিন্দী’ উপন্যাসে মাটি ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক কী, তা নিয়েই টানাপোড়েন৷ মূল চরিত্র কালিন্দীর চর৷ চর মানেই উর্বর ভূমি, ফসল ফোটানোর অপেক্ষায় তার মাটি৷ তার ঐশ্বর্য আবিষ্কৃত হওয়ার পর মাটির কাছাকাছি যারা, সেই সাঁওতালরা দাবি করে, এ চর তাদের৷ মাটির কাছে তাদের দাবি খাদ্যের৷ সম্পন্ন সদগোপ চাষিরাও লোলুপ হয়ে দাবি করে সেই মাটির৷ তাদের দাবি, শুধু খাদ্য নয়, মুনাফাও৷ তারপর এলেন জমিদার, যিনি প্রভুত্বও চান৷ মনে পড়ে আবদুল জব্বারের ‘ইলিশমারির চর’এর কথাও৷ এ উপন্যাস মাছমারা জয়নদ্দি, কানাই ও হরেনের গল্প৷ এ উপন্যাস তাদের মহাজন তরবদির অত্যাচার, চোখরাঙানির গল্পও ৷ জয়নদ্দিরা মাছ ধরতে সমুদ্রযাত্রায় যায়। ফিরে এসে দেখে তাদের ফেলে যাওয়া সংসার তরবদির কৃপায় তছনছ৷ হরেনের হাতে খুন হয় তরবদি৷ নদীর স্রোত অবরুদ্ধ হলে নদীমাতৃক জনপদের জীবনযাপনও রুদ্ধ হয় সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহের ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে৷ একজন যাত্রী অন্য স্টিমারযাত্রীদের একটি শহরের গল্প বলে যাচ্ছে, আর এক যাত্রী ওই গল্পটি শুনতে শুনতে নিজেও শোনাচ্ছে আর এক ব্যক্তির গল্প৷ স্টিমার বন্ধ হয়ে যাওয়া ও তা নিয়ে তৈরি হওয়া আতঙ্ক— উপন্যাসের চরিত্রগুলির নানা স্বরের মধ্যে নদীর এই কান্না ঘুরেফিরে বেড়ায় হাওয়ায়৷ আকাশে-বাতাসে শুধু কান্নার স্বর৷

ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের ‘চর পূর্ণিমা’ আর এক আখ্যান, যার অবস্থান হুগলি নদীর তীরবর্তী স্থানে৷ দীর্ঘকাল দক্ষিণ ২৪ পরগনার আবহে বেড়ে ওঠা লেখকের অভিজ্ঞতাপ্রসূত এই উপন্যাসে বিবৃত হয়েছে একালের এক গঙ্গাবিধৌত জনপদের কাহিনি। চর পড়তে পড়তে নদী আবার কখনও হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে৷ এ সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট লেখকের কলমে পাওয়া গেল এমন আশ্চর্য পটভূমিকার উপন্যাস৷ ভগীরথ মিশ্রের ‘শিকলনামা’ উপনাসের একটি খণ্ডে হারানো নদী যমুনা (খাল)–কে খুঁজে বার করার কাহিনি বিবৃত হয়েছে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে৷ ২৪ পরগনা ছুঁয়ে যমুনা একসময় কোথায় যে হারিয়ে গেল, তা গবেষকের অধীত বিষয়৷ কিন্তু ভগীরথ মিশ্র সেই গবেষকের সীমানা অতিক্রম করে যমুনাকে খুঁজে বেড়িয়েছেন ঔপন্যাসিকের দৃষ্টিকোণ থেকে৷ একই বিষয় নিয়ে অমর মিত্রের ‘সোনাই একটি নদী ছিল’ উপন্যাস পড়ে আমি হতবাক৷ বাংলাদেশ সীমানাসংলগ্ন সোনাই নদীর অস্তিত্ব এখন মৌজা ম্যাপে। সেই হারানো নদী খুঁজতে চেয়ে এক ব্যক্তি মামলা করেছেন উচ্চ আদালতে। বলেছেন, আমাদের ফিরিয়ে দাও সেই সোনাই নদী৷ উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে আমার স্মৃতিতে উথলে উঠল একইসঙ্গে উল্লাস ও বিষাদ৷ শৈশবে আমার বাবা–মা এবং বোনরা থাকত বর্ডারের কাছাকাছি। প্রথমে বিথারি, পরে পাশের গ্রাম চিতুড়িতে৷ দুই বাংলার সীমানা সেই ছোট্ট সোনাই৷ বিথারি–চিতুড়ি যেতে আমাকে বছরে এক বা দু’বার তেঁতুলিয়া ঘাট থেকে রওনা দিতে হত গয়নার নৌকোয়৷ দু’পাশে সবুজ গাছ ঝুঁকে থাকত সেই ছোট্ট নদীটির বুকে৷ কখনও নলখাগড়া, কখনও বেত, কখনও বাঁশঝাড়, কখনও ডুমুর, জিউলি বা আম–জাম সেই নদীর দু’তীরে৷ বিশেষ করে বাঁশঝাড়ের সেই মাইল মাইল দৃশ্য যেন এক আশ্চর্য ফেনোমেনন৷ সরু নৌকোয় বসে থাকলে ঝুঁকে পড়া সবুজ পাতালতা, বাঁশের কঞ্চি ও পাতার স্পর্শে শিরশির করত গা৷ ঘণ্টা আড়াই–তিনের সেই নৌকো জার্নি এক অবিস্মরণীয় কাণ্ড৷ অমরের উপন্যাস পড়ে সেই সোনাই এতদিনে লুট হয়ে গিয়েছে মহাকালের গর্ভে (আসলে মানুষের গর্ভে) জেনে খুবই নিরানন্দ অনুভব করেছিলাম সেদিন৷

শচীন দাসের উপন্যাস ‘অন্ধ নদীর উপাখ্যান’ খুঁজে বেড়িয়েছে আর এক বিখ্যাত নদী— হারানো আদিগঙ্গার ধারা৷ আদিগঙ্গা মিলিত হয়েছিল বিদ্যাধরীর সঙ্গে৷ সেই আদিগঙ্গা একসময় নিজেই হারিয়ে গিয়েছে কোথায়, তার উৎসসন্ধানে শচীন দাসও ঘুরে বেড়িয়েছেন তাঁর উপন্যাসের চরিত্রের হাত ধরে৷ সাধন চট্টোপাধ্যায়ের ‘গহীন গাঙ’ আর এক নদীভিত্তিক উপন্যাস, যার পরতে পরতে এক অচেনা জলকল্লোলের আশ্চর্য ধ্বনি৷ কিন্নর রায়ের ‘ধুলিচন্দন’এও শুনতে পাই এক চিরচেনা, অথচ অচেনা নদীর স্বর৷

নদীর সঙ্গে আশৈশব সখ্যের কারণে আমার বহু গল্প– উপন্যাসেই নদী এসেছে ঘুরেফিরে৷ ‘নদী মাটি অরণ্য’, ‘দ্বৈরথ’, ‘সমগ্র শঙ্খচিল’— সবই নদীকেন্দ্রিক৷ আরও অনেক উপন্যাসের নাম করা যায়৷ হয়তো পরেও নদী আসবে৷ নদী এসেছে আরও বহুজনের লেখায়৷ নদীকেন্দ্রিক এমন বহু উপন্যাসের কথাই বলা হল না এই স্বল্প পরিসরে৷ হয়তো অন্য কেউ বলবেন কখনও৷ বলতে তো হবেই৷

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए

বঙ্গবিভূষণ ইমনকে ট্রোলিং লজ্জাজনক