কাজল মুখার্জি

বসন্তের মৃদু হাওয়া। রাস্তায় ঝরে পড়া কৃষ্ণচূড়া আর শিমুল ফুল। বাতাসে একটি উজ্জ্বলতা আছে। একটি নতুন দিনের আমন্ত্রণ।
আজ ৮ মার্চ। সকালে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে সীমন্তিনী জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। পথচলতি মানুষজন। দোকানের সামনে টাটকা ফুলের মালা সাজানো। সবই যেন খুব চেনা, অথচ আজকের দিনটা তার কাছে অন্যরকম।
পাশের ঘরে কৌশিক খবরের কাগজ পড়ছিল, কিন্তু তার চোখ বারবার সীমন্তিনীর দিকে চলে যাচ্ছিল। বলল, আজ একটু বেশি সময় নিয়ে গানের রেওয়াজ করবে না?
সীমন্তিনী তাকাল। কৌশিক জানে, এ প্রশ্নের উত্তর একটাই।
সীমন্তিনী বারান্দা থেকে উঠে গেল। ঘরে গিয়ে হারমোনিয়ামের সামনে বসল। তার প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত গাইতে শুরু করল, আমার পরাণ যাহা চায়…
কৌশিক একমুহূর্ত চুপ করে রইল। এ সুর, এ গলা, এটাই তো তাদের জীবনের অদৃশ্য সেতু, যা জীবনের সব সুখ-দুঃখ আর দৈনন্দিন জীবন সংগ্রামের মধ্যেও অটুট থেকেছে।
সীমন্তিনীর বাপের বাড়িতে গানের আবহ ছিল। বাবা ছিলেন সংগীতপ্রেমী। মা-ও গান গাইতেন। দাদারাও গানবাজনার রেওয়াজ করে। সীমন্তিনীর ভাস্বরদা তো প্রতিষ্ঠিত এবং সুপরিচিত সেতার শিল্পী। সীমন্তিনী ছোটবেলা থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত শিখেছে বাবার কাছে। আর তারপর সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেছে। বেঙ্গল মিউজিক কলেজ থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে স্নাতক হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের স্থান সীমন্তিনীর হৃদয়ের অন্তঃপুরে অবস্থিত। কিন্তু তার বিয়ের পর পরিবেশ বদলে গিয়েছিল। কৌশিক রেলের চাকরিতে ব্যস্ত। কখনও অফিসে ডিউটি, কখনও ট্রেন সফর। সংসার, দুই মেয়ে, সবকিছু সামলে মাঝেমধ্যে সীমন্তিনী গানের রেওয়াজ করত বটে, কিন্তু নিয়মিত রেওয়াজ করা তার আর হয়ে উঠত না।
ছত্রিশটি বছর চলে গিয়েছে। মেয়েরা বড় হয়েছে। পড়াশোনা করেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,। বিয়ে হয়েছে। তাদের এখন নিজস্ব সংসার আর কর্মক্ষেত্র। সীমন্তিনীর সংসারের দায়িত্ব কিছুটা হালকা হয়েছে। এখন সে নিজের সুরের জগতে ফিরে এসেছে। নিয়মিত রেওয়াজ করে। প্রতিসপ্তাহে দু’দিন করে গান শিখতেও আসে বেশ কয়েকজন মেয়ে।
অন্যদিকে কৌশিকের রেলের চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্তি হয়েছে। এখন সে ফের নিজের লেখালেখি আর সাহিত্যচর্চায় মন দিয়েছে।
৮ মার্চের বিবাহবার্ষিকীর সকালে সীমন্তিনী আর কৌশিক দু’জনে চায়ের কাপ নিয়ে রাস্তার দিকের বারান্দায় বসেছিল। বসন্তের হাওয়ায় চারপাশে একটা উজ্জ্বলতার আভাস। রাস্তায় মানুষজনের চলাফেরার ব্যস্ততা। দোকানবাজার আর রান্নাবান্নার প্রাত্যহিক কাজের মধ্যেও তাদের দু’জনের জীবনের আজ একটি বিশেষ দিন।
সীমন্তিনীর রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া শেষ হওয়ার পর কৌশিক ঘরের দেওয়াল আলমারিটা থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করল। খামটা সীমন্তিনীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা তোমার জন্য।
সীমন্তিনী একটু অবাক হয়ে খামটা খুলল। ভিতরে একটা গিফট ভাউচার আর ট্রেনের দুটো টিকিট! শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবে যাওয়ার টিকিট!
আমরা তাহলে এ বছর বসন্ত উৎসবে শান্তিনিকেতন যাচ্ছি? সীমন্তিনী বলল।
কৌশিক হাসল। বলল, তোমার গান আর আমার লেখা, দুটোই ওখানে যেন নতুন প্রাণ পায়। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি। এবার না হয় শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসবের রঙে নিজেদের একটু রাঙিয়ে নিই।
সীমন্তিনীর চোখে একরাশ বিস্ময়। তারপর একগাল হাসি।
আজ নারী দিবস। আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী। একটি বিশেষ দিন, অথচ তাদের পথচলা তো প্রতিদিনের।
এই ছত্রিশ বছরে কতকিছু বদলেছে, কিন্তু একসঙ্গে থাকার আনন্দ, একসঙ্গে পথ চলার গল্প, একসঙ্গে হাসি-কান্নার সুর, এ বন্ধনটাই তো আসল সম্পর্কের ভিত।
দূরে কৃষ্ণচূড়ার গাছে ফুলগুলি বাতাসে দুলছে, যেন বসন্তের হাওয়ায় ভালোবাসার গান ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। কাহারবা তালে সীমন্তিনী রবীন্দ্রসংগীত গাইল,
আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী। নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।
পূজা করি মোরে রাখিবে ঊর্ধ্বে, সে নহি নহি, হেলা করি মোরে রাখিবে পিছে
সে নহি নহি। যদি পার্শ্বে রাখো মোরে সংকটে সম্পদে, সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে
সহায় হতে, পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে। আজ শুধু করি নিবেদন, আমি চিত্রাঙ্গদা রাজেন্দ্রনন্দিনী।
কৌশিক বলে উঠল, সাবাস!
এরপর কৌশিক তাদের ৩৬তম বিবাহবার্ষিকী নিয়ে লেখা তার ‘ছত্রিশটা বসন্ত’ কবিতাটি বলতে শুরু করল,
একটা সময় ছিল,
যখন বসন্ত মানে ছিল শিমুল ফুল,
কোকিলের ডাক,
আর আকাশজুড়ে নরম রোদ।
তখন তোমার চোখে ছিল স্বপ্নের রং,
আমার হাতে ছিল অপেক্ষার গল্প।
তারপর?
বসন্ত এল, গেল,
সংসার জমল, শাখা বাড়ল,
শব্দরা গুছিয়ে বসল জীবন সংগ্রামে,
বিতর্ক জমল থালায়,
প্রশ্নরা থাকল অর্ধেক শুনে ফেলে আসা।
ছত্রিশটি বসন্ত পেরিয়ে
এখন বসন্ত মানে
চায়ের কাপের ধোঁয়ার ভিতর
তোমার চোখের ক্লান্তি খুঁজে নেওয়া,
গানের সুরে হঠাৎ থমকে যাওয়া,
হারমোনিয়ামের সুর,
আর নরম বিকেলের আলোয়
একসাথে হাঁটতে বেরোনো।
প্রেম বদলায়, ঠিক,
কিন্তু কী জানো?
তার শেকড় কখনও শুকোয় না।
আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি
একটা দীর্ঘ বাক্যের মাঝখানে,
যার শেষ লেখা হয়নি,
হয়তো হবেও না!
সীমন্তিনী আর কৌশিক দু’জনের মুখেই তখন এক অনাবিল হাসির ছাপ।
