কাজল মুখার্জি

সোদপুর স্টেশনের ব্যস্ত রাস্তায় মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন আর হকারদের হাঁকডাকে সদাব্যস্ত পথ। স্টেশন থেকে একটু দূরে রাস্তার উপর শোভনদের বাড়ি।
শোভন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। স্বপ্ন দেখত বড় হওয়ার। কিন্তু অল্প বয়স থেকেই একের পর এক ধাক্কা।
শোভন ভালো আঁকতে পারত। ভালো স্কেচ করতে পারত। তার স্বপ্ন ছিল একদিন নিজের একটি ডিজাইন ফার্ম খুলবে। কিন্তু বাবার হঠাৎ স্ট্রোক হওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব প্রায় পুরোপুরি তার কাঁধে এসে পড়েছিল। চাকরির খোঁজ করেও সে যখন কিছু পেল না, তখন হতাশা তাকে গ্রাস করতে লাগল। বন্ধুরা ব্যস্ত। আত্মীয়রা কেবল উপদেশ দিত, কিন্তু বিশেষ কিছু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত না।
একদিন সোদপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শোভন দেখল, এক বৃদ্ধ ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা অভিভাবকদের সঙ্গের বাচ্চাদের পাপেট শো দেখাচ্ছেন আর বাচ্চারা খিলখিল করে হাসছে। ওই বৃদ্ধকে কিছু মানুষ সামান্য অর্থ দিচ্ছেন, কিন্তু তার মধ্যেও বৃদ্ধের মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। দৃশ্যটা দেখে শোভনের মনে হল, সেও কি পারবে না, তার শিল্পকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে একটু আনন্দ দিতে? পরদিন থেকেই সে রঙিন চক আর বোর্ড নিয়ে স্টেশনের বাইরে ফুটপাথে ছোট ছোট লাইভ স্কেচ করা শুরু করল। অফিস ফেরত মানুষজন, কলেজ পড়ুয়া, প্রেমিক-প্রেমিকা, সাধারণ যাত্রীদের অনেকেই তার সামনে এসে দাঁড়াত, বোর্ডে আঁকা বিভিন্ন স্কেচ দেখত, তার সঙ্গে কথা বলত। শোভন চটজলদি তাদের লাইভ স্কেচ এঁকে দিত বোর্ডে। অনেকের অনুরোধে আবার কাগজেও এঁকে দিত। কাগজে আঁকা সেই স্কেচ নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরত অনেকেই। অনেকে আবার মোবাইল ফোনে ছবি তুলে নিত শোভনের বোর্ডের স্কেচের। প্রথম প্রথম সামান্য রোজগার হলেও ধীরে ধীরে শোভনের আয় বাড়তে লাগল। আস্তে আস্তে তার আঁকা ছবিগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হতে লাগল। কিছু মানুষ তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এল।
কয়েকমাস পর শোভন বাড়িতেই তার প্রথম ডিজাইন স্টুডিয়ো খুলল, যেখানে সে শুধু ডিজাইনই করত না, অন্য শিল্পীদেরও সুযোগ করে দিত।
শোভন বাস্তবে উপলব্ধি করল, জীবনের বিভিন্ন সময় উদ্ভূত পরিস্থিতি হয়তো বেশ কিছু কষ্ট দেয়, তখন তাকে অতিক্রম করার উপায় খুঁজতে হয়। কখনও তা সাধারণ স্কেচ, আবার কখনও অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য করা কিছু ছোট-বড় প্রচেষ্টা হতে পারে।
