ড. স্বপনকুমার নাথ

বর্তমানের এই সংকটপূর্ণ সময়ে স্বামীজির আদর্শ আমাদের সমাজকে বাঁচানোর একমাত্র অবলম্বন হতে পারে। স্বামীজির আদর্শকে মাথা পেতে গ্রহণ করেছে রাষ্ট্রসংঘ। স্বামী বিবেকানন্দের অন্তর ছিল জনগণের প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে মিলন ঘটিয়েছেন তাঁর বাণার মাধ্যমে। তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ও সময় উপযোগী ভাবনার সমন্বয় গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক। তাঁর জীবনে পরম বিস্ময়, তিনি বয়সের তুলনায় নিজেকে চিন্তার বেশি গভীরে নিয়ে যেতে পারতেন। স্বামীজি নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলতেন। সমাজতন্ত্রের গভীর সত্যের সহজ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি সন্ন্যাসীর আদর্শ পালন করেছেন, আবার সাধারণ মানুষের কষ্টের কথাও চিন্তা করেছেন। তাঁকে প্রত্যেক সমাজের কুপ্রথাগুলি ও অনাচার বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল।
বিবেকানন্দ আধুনিক বিজ্ঞান যুগের মানুষ, একথা আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি। পাশ্চাত্য দেশে তিনি শুধু ভ্রমণ করেননি, সেসব দেশের বিজ্ঞান ভাবনাকে ভারতে দেশে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘একথা মনে করার কারণ নেই যে, প্রগতির জন্য জীবনসংগ্রাম প্রয়োজনীয়। জন্তুর মধ্যে মানুষ চাপা পড়েছিল। যে মুহূর্তেই দরজা খুলে দেওয়া হল, মানুষ ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। সেরকম মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন দেবত্ব রয়েছে অজ্ঞতার খিলে আবদ্ধ হয়ে। যখন জ্ঞান এই বাধা চূর্ণ করে ফেলে, তখনই মানুষের ভিতর থেকে দেবতা আত্মপ্রকাশ করেন।’
সমাজের কল্যাণকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে জীবন থেকে জীবনসংগ্রামকে বেশ দূরে রাখতে হবে। এই ভাবনা থেকেই আমরা স্বামীজিকে একজন সাম্যবাদী মানুষ রূপে দেখতে পাই। তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মধ্যে কাজ করার প্রবণতা বাড়িয়ে তুলতে এবং শিক্ষার বিস্তার করতে, যাতে নারী-পুরুষ সকলে নিজেদের মূল্য ও যোগ্যতা নির্ণয় করতে পারে। তিনি মনে করতেন, নারীশিক্ষার দায়িত্ব পুরুষদের নিতে হবে। তারপর মেয়েরা নিজেরাই নিজেদের গন্তব্যে ভবিষ্যৎ স্থির করবে। স্বামীজির এই ভাবনা যেন বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রের চালিকাশক্তির ধারণাকে কুঠারাঘাত করছে।
সমাজ বিবর্তনের দিক থেকেও স্বামীজি তাঁর উজ্জ্বল ভাবনা ও আদর্শ আমাদের সামনে রেখেছেন। তিনি লক্ষ করেছিলেন, সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষই সমাজের চালিকাশক্তি। উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নতি না হলে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়।
স্বামীজি হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে পৃথক সত্তা রয়েছে বলে কখনওই মনে করেননি। তিনি ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে সমন্বয়সাধন করার চেষ্টা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর একটি উক্তি, ‘A nation in India must be a union of those whose hearts beat to the same spiritual tune.’
অন্য পোস্ট: ভারতের সংবিধান সনাতন হিন্দু ধর্মকেই মান্যতা দিয়েছে
স্বামীজি কার্যত ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে সাম্যের বৈশিষ্ট্য দেখতে পেতেন। তাই জাগতিক জীবনের মধ্যে তিনি সাম্যের কল্পনা করতেন। তিনি বিশ্বমৈত্রীর আদর্শকে বেছে নিয়েছিলেন। যুদ্ধবিগ্রহ পরিহারের পক্ষপাতী ছিলেন। ভারতকে এক ঐক্যশালী দেশ হিসাবে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন। ভারতের যুব সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল প্রবল। তিনি মনে করতেন, ভারত যেদিন জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবে, সেদিন ভারতের প্রধান কাজ হবে পাশ্চাত্যে ভারতের আধ্যাত্মিক চেতনা প্রচার করা। আজ যে সংকীর্ণ ভাবনার চোরাস্রোত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বয়ে চলেছে, তাতে স্বামীজির এই আদর্শ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা স্বামীজির ভাবনা থেকে কতটা সরে এসেছি।
আমরা স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে ভারতে স্বামীজির আদর্শ ও শিক্ষা আমাদের জাতিকে বহুলাংশে উন্নীত করেছে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তিনি আমেরিকায় যখন দেখেন সেখানকার স্ত্রীজাতির সামাজিক উচ্চসম্মান ও সমানাধিকার, তখন তিনি বেশ তৃপ্তি অনুভব করেন। তিনি লেখেন, ‘আমেরিকার নারীরা নিজেদের ধর্ম থেকে কিছুমাত্র বিচ্যুত না হয়েও সেখানে যা কিছু মঙ্গলময়, শুভময়, তারই প্রতি অগাধ সহানুভূতিশীল।’
কিন্তু আজ আমরা ঘরে বাইরে সমস্যা জর্জরিত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছি। উন্নয়নকে দূরে রেখে অন্তর্ঘাতে শামিল হয়ে পড়ছি। উন্নয়ন তো দূরের কথা, নিছক বেঁচে থাকার সামান্য আশাও খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে। সমস্যার এই জালে আমরা সবাই জড়িয়ে পড়ছি। তাই আজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বামীজিকে স্মরণ করলে পরম তৃপ্তি লাভ করব।
স্বামীজি মনে করতেন, ভারতের জনগণই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। অতএব মানুষকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য চাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান। জীবসেবা বলতে তিনি জনগণকে শিক্ষাদানই প্রধান মনে করেছিলেন। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী, ‘ভারতের অনন্ত ভাবরাশি জনগণের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া চাই। তখন কাজ আপনি হবে।’
রবীন্দ্রনাথ ‘জীবন স্মৃতি’-তে লিখেছেন, ‘এখনও আমার এই বিশ্বাস যে, সমস্ত মানুষের মনের সঙ্গে মনের একটি অখণ্ড যোগ আছে; তার এক জায়গায় যে শক্তিক্রিয়া ঘটে, অন্যত্র গূঢ়ভাবে তাহা সংক্রান্ত হইয়া থাকে।’
বিবেকানন্দ লিখেছেন, ‘মানুষকে যদি আমরা বদ্ধ করে রাখি, তা সত্ত্বেও চিন্তার শক্তি দেওয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজকাল মানুষের চিন্তাশক্তি কোনও একটি খাঁচায় আটকে থাকছে, যা দেশের মঙ্গলের বিপরীত স্রোত।

◆ প্রবন্ধ পর্যালোচনা ◆
বিবেকানন্দ আধুনিক বিজ্ঞান যুগের মানুষ
লেখক : ড. স্বপন কুমার নাথ
পর্যালোচনায় : শংকর হালদার শৈলবালা
◆ মূল বিষয় ◆
◆ বিবেকানন্দের দর্শন ও আধুনিকতা: প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের দর্শনকে আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছে। বিশেষ করে, তিনি শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, নারীশিক্ষা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং জাতীয় একতা সম্পর্কে যেসব মতামত ব্যক্ত করেছিলেন, সেগুলোকে উঠিয়ে আনা হয়েছে।
◆ সামাজিক পরিবর্তন : প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের দর্শনকে সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসাবে উপস্থাপন করেছে। তিনি যেভাবে সমাজের বৈষম্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রচার করেছিলেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে।
শক্তি:
◆ বিস্তারিত বিশ্লেষণ : প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের বিভিন্ন দিককে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে। শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি— প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁর দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
◆ আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা : প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের দর্শনকে আধুনিক সমস্যার সমাধানের একটি হাতিয়ার হিসাবে উপস্থাপন করেছে। বিশেষ করে, ভারতের বর্তমান সমাজে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সমাধানে বিবেকানন্দের দর্শন কীভাবে সহায়ক হতে পারে, সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।
◆ উদাহরণ : প্রবন্ধে বিবেকানন্দের বিভিন্ন উক্তি ও কাজের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যা তাঁর দর্শনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
দুর্বলতা:
◆ একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি : প্রবন্ধটি মূলত বিবেকানন্দের ইতিবাচক দিকগুলোকেই তুলে ধরেছে। তাঁর দর্শনের যেসব সমালোচনা রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে কোনও আলোকপাত করা হয়নি।
◆ গভীর বিশ্লেষণের অভাব : প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের দর্শনের বিভিন্ন দিককে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে ঠিক, কিন্তু গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে।
◆ পুনরাবৃত্তি : প্রবন্ধে কিছু বিষয় বারবার উঠে এসেছে, যা পাঠককে একঘেয়ে লাগতে পারে।
সারসংক্ষেপ:
◆ এই প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের দর্শনকে আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছে এবং তাঁর দর্শনকে সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসাবে উপস্থাপন করেছে। প্রবন্ধটি বিস্তারিত এবং আধুনিক প্রাসঙ্গিক। তবে, প্রবন্ধটি একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণের অভাবের কারণে কিছুটা সীমিত।
◆ উন্নতির সুযোগ ◆
◆ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি : প্রবন্ধে বিবেকানন্দের দর্শনের সমালোচনা গুলো কে স্থান দিতে হবে।
◆ গভীর বিশ্লেষণ : বিবেকানন্দের দর্শনের দার্শনিক ভিত্তিকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
◆ নতুন তথ্য : প্রবন্ধে নতুন গবেষণা এবং তথ্য যোগ করতে হবে।
মোটামুটিভাবে বলতে গেলে, এই প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের দর্শন সম্পর্কে একটি ভালো ভূমিকা প্রদান করে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~