সুদীপ ঘোষাল

দূর থেকে ভেসে আসছে ভাদুগানের সুর। ছুটে গিয়ে দেখলাম, জ্যোৎস্না রঙের শাড়ি জড়ানো বালিকা ভাদু বসে আছে। আর একটি পুরুষ মেয়ের সাজে ঘুরে ঘুরে কোমর নাচিয়ে গান করছে, “ভাদু আমার ছোট ছেলে কাপড় পরতে জানে না।” অবাক হয়ে গিলে খায় এই নাচের দৃশ্য অসংখ্য অপু-দুর্গার বিস্মিত চোখ। ঝাপানের সময় ঝাঁপি থেকে ফণা তোলা সাপ নাচিয়ে যায় চিরকালের চেনা সুরে ঝাপান দাদা। ঝাপান দাদা ঝাপান এলেই গান ধরতেন, “আলে আলে যায় রে কেলে, জলকে করে ঘোলা। কী ক্ষণে কালিনাগ বাসরেতে ঢোকে রে, লখিন্দরের বিধি হল বাম।”
গ্রামের পুরোনো পুজোবাড়ি গাজনের সময় নতুন সাজে সজ্জিত হত। বাবা শিবের ভক্তরা ভক্তি ভরে মাথায় করে নিয়ে গিয়ে দোলপুজো বাড়িতে নামাতেন। অসংখ্য লোকের নতুন জামাকাপড়ের গন্ধে ম-ম করে উঠত সারা বাড়ি। তারপর পুজো হওয়ার পরে দোল চলে যেত উদ্ধারণপুরের গঙ্গায় স্নানের উদ্দেশে। কিন্তু আমার মন একা হয়ে পড়ত। এই তো কিছুক্ষণ আগেই ছিল আনন্দ ঘ্রাণ! তবু দোল চলে গেলেই মন খারাপের দল পালা করে শুনিয়ে যেত অন্যমনস্ক কবির ট্রামে চাপা পড়ার করুণ কাহিনি। ঠিক এই সময় কানে ভাসত অভুক্তজনের কান্নার সুর। আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি বারবার, সকলের অনুভূতি কি আমার মতো হয়?
রাতে শোয়ার পরে বোলান দলের নূপুরের ঝুমঝুম শব্দ কানে বাজত বেশ কিছুদিন ধরে। ফাল্গুনে হোলিকার কুশপুত্তলিকায় আগুন ধরিয়ে কী নাচ! নাচতে নাচতেই সবাই সমস্বরে বলতাম, ধূ-ধূ নেড়া পোড়া, হোলিকার দেহ পোড়া।
অশুভ শক্তিকে পুড়িয়ে শুভশক্তির উন্মেষ। পরের দিনে রং আর আবিরে ভরে যেত আকাশের নরম গা। বাতাসের অদৃশ্য গায়ে আবিরের আনাগোনা। সে এক অনির্বচনীয় আনন্দের প্রকাশে রাধাকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের আকুতি।
আশ্বিনের আকাশে বাতাসে বেলুনের অনিল পাঠকের রঙের খেলা। শিল্পী একমাটি, দু’মাটি করে শেষে চোখ আঁকতেন পর্দার আড়ালে। আগে থেকে চোখ দেখতে নেই। আর আমার চোখ দেখার জন্য চাতুর্যের সীমা থাকত না। পাঠকমশাইয়ের ফাইফরমায়েশ খেটে সবার অলক্ষে চোখ দেখে নিতাম একবার। সেই চোখ আজও আমার মনে এঁকে যায় জলছবি। কী যেন বলেছিল সেই চোখ! আশ্বিন এলেই আমি প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখে বেড়াই মায়ের চোখ দেখার বাসনায়। ছোটবেলার দেখা চোখ কোথায় কোন গভীর জলে ডুব দিয়েছে, কে জানে!
দরজা পুকুরের সবুজ সরসরিয়ে পানকৌড়ি ডুব দিয়ে খুঁজে চলে আজও। আজ তিরিশ বছর পরে আমার মনে পড়ছে, খড়ের চাল, মাটির দেওয়াল ভেদ করে সে এসেছিল জ্যোৎস্না রঙের ফ্রকে। হাত দিতেই একরাশ মুক্ত ঝরে পরে যেত। কে যে মরে আর হা-পিত্যেশ করে, বোঝা যায় না এই পৃথিবীতে! সেদিন খড়ের চাল ফুঁড়ে জ্যোৎস্না আমার উপর উঠে বিপরীত ক্রিয়ায় হেসেছিল নেশায়। আমি শুধু অবাক হয়েছিলাম প্রথম সমুদ্র দেখার মতো।
তারপর জয়-পরাজয়, উত্থান-পতনের ঢেউ আছাড় মেরেছে জীবনসৈকতে। কোনওদিন ভেঙে পড়েনি মন। হঠাৎ পাওয়া জ্যোৎস্না বিয়ে করে আমেরিকা চলে গেল। না-ছাড়ার প্রতিজ্ঞার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বয়ে বেড়ালাম তিরিশ বছর।
এখন জলপাইগুড়ির প্রকৃতির সঙ্গে ভাব জমিয়েছি খুব। আমার এক স্প্যানিয়াল বন্ধুকে নিয়ে ঘর করি। কোনও কথা নেই, ঝগড়া নেই। ভালোবাসার চোখে দেখি একে অপরকে। আপন মনে থাকতে থাকতে মনে চলে আসে জ্যোৎস্নার কথা। বৃষ্টির এক দুপুরে তার চিঠির কথা আজও মনে পড়ে। সে লিখেছিল, ধনী পিতার একমাত্র সুন্দর ছেলেকে পরিবার যেমন নজরবন্দি করে রাখে, পাছে ছেলে ভালোবাসার খপ্পরে পড়ে পর হয়ে না যায়, ঠিক তেমনভাবেই রেনকোট, ছাতার আড়াল করে আমরা নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করেও বৃষ্টির ভালোবাসা থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারি না। সুন্দরী যেমন একমাত্র সুন্দর ছেলেকে পরিবারের নজর থেকে নিজের করে নেয়, ঠিক একইভাবে বৃষ্টি আমাদের একমাত্র সুন্দর দেহে জামার কলারের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে অন্দরমহলে। তারপর হাঁটাপথে চলার রাস্তায় জল পরম মমতায় পায়ে জলের শেকল পরিয়ে রাখতে চায়। বৃষ্টির সময় চোখে মুখে জল আদরের প্রলেপ লাগায়। ঠোঁট চুম্বন করে শীতল স্পর্শকাতর জল। তার আদরে প্রেমজ্বরে পড়তে হয় মাঝেমধ্যে। আমি ভালোবেসে তাকে বলেছি, তুমি আমার জ্বরের মাঝে ঝরঝর ঝাঁপিয়ে পড়ো। আমিও বৃষ্টি হয়ে যাই।
আমি ও জ্যোৎস্না যে গ্রামে ভালোবাসার বয়সটা কাটিয়েছি, তার কথা আজ মনে সবুজ সর ফেলছে। শুধু মনে পড়ছে, আমার স্বপ্নের সুন্দর গ্রামের রাস্তা বাস থেকে নেমেই লাল মোরাম দিয়ে শুরু। দু’দিকে বড় বড় ইউক্যালিপ্টাস রাস্তায় পরম আদরে ছায়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে। কতরকমের পাখি স্বাগত জানাচ্ছে পথিককে। রাস্তা পারাপারে ব্যস্ত বেজি, শেয়াল, আরও অনেকরকমের জীবজন্তু। চেনা আত্মীয়ের মতো অতিথির কাছাকাছি তাদের আনাগোনা। হাঁটতে হাঁটতে এসে যাবে কদতলার মাঠ। তারপর গোকুলপুকুরের জমি, সর্দারপাড়া, বেনেপুকুর। ক্রমশ চলে আসবে নতুন পুকুর, ডেঙাপাড়া, পুজোবাড়ি, দরজাঘাট, কালীতলা। এখানেই আমার চৌদ্দপুরুষের ভিটে। তারপর ষষ্ঠিতলা, মঙ্গলচণ্ডীর উঠোন, দুর্গাতলার নাটমন্দির। এদিকে গোপালের মন্দির, মহেন্দ্র বিদ্যাপীঠ, তামালের দোকান, সুব্রতর দোকান পেরিয়ে ষষ্ঠী গোরে, রাধা মাধবতলা। গোস্বামী বাড়ি পেরিয়ে মণ্ডপতলা। এই মণ্ডপতলায় ছোটবেলায় গাজনের সময় রাক্ষস দেখে ভয় পেয়েছিলাম। সেসব হারিয়ে যাওয়া রাক্ষস আর ফিরে আসবে না। কেয়াপুকুর, কেষ্টপুকুরের পাড়। তারপর বাজারে পাড়া, শিবতলা, পেরিয়ে নাপিতপাড়া। এখন নাপিতপাড়াগুলি সেলুনে চলে গিয়েছে। সাতন জেঠু দু’পায়ের ফাঁকে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরতেন মাথা। তারপর চুল বাটি ছাঁটে ফাঁকা। কত আদর আর আব্দারে ভরা থাকত চুল কাটার বেলা।
এখন সবকিছুই যান্ত্রিক। মাঝেমধ্যে কিছু কম বয়সি ছেলেমেয়েকে রোবট মনে হয়। মুখে হাসি নেই। বেশ জেঠু জেঠু ভাব। সব শেষে বড়পুকুর পেরিয়ে পাকা রাস্তা ধরে ভুলকুড়ি। আর মণ্ডপতলার পর রাস্তা চলে গিয়েছে খাঁ পাড়া, কাঁদরের ধার ধরে রায়পাড়া। সেখানেও আছে চণ্ডীমণ্ডপতলা, কলাবাগান, দুর্গাতলার নাটমন্দির, সবকিছুই। পুজোবাড়িতে গোলা পায়রা দেখতে গেলে হাততালি দিই। শ’য়ে শ’য়ে দেশি পায়রার দল উড়ে এসে উৎসব লাগিয়ে দেয়।
আজ জ্যোৎস্না খোঁজ নিয়ে আমার জলপাইগুড়ির বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। এসেই নিজের ঘরের মতো এলোমেলো জীবন সাজাতে চাইছে। আর কথা বলে চলেছে অনবরত। ভালো করে তৈরি হয়ে এসে বিছানায় বসে শরীরটা এলিয়ে দিল। তারপর শুরু করল, মনে আছে তোমার সব ঘটনা। জানো, আমি সুখী নই।
কথাটা শুনে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আবার আমার দুর্বল জায়গা জাগিয়ে তোলার জন্য পুরোনো কথা শুরু করল। ও জানে না, আমি স্মৃতি জড়িয়ে ধরে বেঁচে আছি।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনাতে লাগলাম পুরোনো বাল্যভারত, তুমি শোনো জ্যোৎস্না, ছোটবেলার সরস্বতী পুজো বেশ ঘটা করেই ঘটত। পুজোর দু’দিন আগে থেকেই প্রতিমার বায়নাস্বরূপ কিছু টাকা দিয়ে আসা হত শিল্পীকে। তারপর প্যান্ডেলের জোগাড়। বন্ধুদের সকলের বাড়ি থেকে মা ও দিদিদের কাপড় জোগাড় করে বানানো হত স্বপ্নের সুন্দর প্যান্ডেল। তার একপাশে বানানো হত আমাদের বসার ঘর। পুজোর আগের রাত আমরা জেগেই কাটাতাম কয়েকজন বন্ধু মিলে। কোনও কাজ বাকি নেই, তবু সবাই খুব ব্যস্ত। একটা ভীষণ সিরিয়াস মনোভাব। তারপর সেই ছোট্ট কাপড়ের পাখির নিড়ে কে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম, তা কেউ জানতে পারতাম না। মশার কামড়ও সেই নিশ্চিন্ত নিদ্রা ভাঙাতে পারত না। তবু সকালে উঠেই মচকানো বাঁশের মতো ব্যস্ততার আনন্দ। মা-বাবার সাবধানবাণী, ডেঙ্গু জ্বরের ভয়, কিছুই আমাদের আনন্দের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। হড়কা বানে যেমন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে, আমাদের আনন্দ ঠিক তেমনই আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেত মহানন্দের জগতে। তারপর সকাল সকাল স্নান সেরে ফলমূল কাটতে বসে পড়তাম বাড়ি থেকে নিরামিষ বঁটি এনে। পুরোহিত এসে পড়তেন ইতিমধ্যে। মন্ত্রতন্ত্র কিছুই বুঝতাম না। শুধু বুঝতাম, মায়ের কাছে চাইলে মা না করতে পারেন না। পুষ্পাঞ্জলি দিতাম একসঙ্গে সবাই। জোরে জোরে পুরোহিত মন্ত্র বলতেন। মন্ত্র বলা ফাঁকি দিয়ে ফুল দিতাম মায়ের চরণে ভক্তিভরে। তারপর প্রসাদ বিতরণের চরম পুলকে আমরা বন্ধুরা সকলেই পুলকিত হতাম। প্রসাদ খেতাম সকলকে বিতরণ করার পরে। আমাদের সবার প্রসাদে ভক্তি বেশি হয়ে যেত, ফলে দুপুরে বাড়িতে ভাত খেতাম কম। সন্ধ্যাবেলায় প্রদীপ, ধূপ জ্বেলে প্যান্ডেলের ঘরে সময় কাটাতাম। পরের দিন দধিকর্মা। খই আর দই। পুজো হওয়ার অপেক্ষায় জিভে জল। তারপর প্রসাদ বিতরণ করে নিজেদের পেটপুজো সাঙ্গ হত সাড়ম্বরে।
এরপরের দৃশ্য প্রতিমা বিসর্জন। কাছেই একটি পুকুর। রাত হলে সিদ্ধিলাভে (দামিটা নয়) আনন্দিত হয়ে নাচতে নাচতে অবশেষে শেষের বাজনা বেজে উঠত। ‘মা, তুই থাকবি কতক্ষণ, তুই যাবি বিসর্জন’। তার সঙ্গে আমাদের মনটাও বিসর্জনের বাজনা শুনত পড়ার ঘরে বেশ কিছুদিন ধরে।
কথা শুনতে শুনতে জ্যোৎস্না আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমার প্রবল কামনাকে কামড়ে ধরে নীলকণ্ঠ হয়ে আছি। জ্যোৎস্না বলল, জানো, বিদেশে এটা কোনও ব্যাপার নয়। এসো, আমরা এক হই পরম সুখে। আমি হাত ছাড়িয়ে বাইরে এলাম। জ্যোৎস্না কি ভুলে গিয়েছে, মনে ভাসা সবুজ সর নিয়ে, দুঃখকে জয় করার মানসিকতায় এক ভারতীয় যাপনে আমি ডুব দিয়েছি জীবনসমুদ্রে!
