আনন্দমোহন দাস
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের অর্থ হল, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা অমৃত সমান। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে ভক্তদের যে কথোপকথন হয়েছে, সেখানে তা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর কথাই হল অমৃত সমান। প্রকৃতপক্ষে ঠাকুর ছিলেন সাক্ষাৎ ভগবান।
বলা বাহুল্য, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত যাঁরা পাঠ করেছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবে বলবেন যে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ একজন জ্ঞানের সাগর ছিলেন। আমার অন্তত সেই অনুভব হয়েছে। ভক্তদের সামনে এত সহজ ভাষায় সুন্দরভাবে তিনি যে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, তা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। দৈনন্দিন জীবনে যে কোনও প্রশ্নের উত্তর এই কথামৃতে অবশ্যই পাওয়া যায়। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সহজ উদাহরণ দিয়ে সুন্দরভাবে ভক্তদের বুঝিয়েছেন, যা হৃদয়ঙ্গম করতে ভক্তদের সুবিধা হয়। তাঁর পুঁথিগত বিদ্যা কম থাকলেও তিনি অনেক বিদ্বান ও জ্ঞানী ব্যক্তির চেয়ে বড় ছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের গভীরতা সকলকে অবাক করে দেয়। কথামৃত পাঠ করলে যেমন লোকশিক্ষা হয়, সেরকম সাংসারিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি ছোট ছোট উদাহরণ দিয়ে জটিল বিষয়কে সরল করে ভক্তদের সামনে রাখতেন। এর ফলে ভক্তরা সহজে বুঝতে পারতেন।
একবার এক ভক্ত ঠাকুরকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ঠাকুর, মানুষ বলতে কী বোঝায়?’ তিনি সহজভাবে উত্তর দিলেন, 'মান' আর 'হুঁশ', এ দু’টি একসঙ্গে থাকলে তবেই মানুষ বলা যায়।
শ্রীরামকৃষ্ণ মাস্টারমশাইকে (মহেন্দ্র গুপ্ত) বলেছেন, 'যোগীর মন সর্বদাই ঈশ্বরে থাকে। সর্বদাই ঈশ্বরে আত্মস্থ। চক্ষু ফ্যালফেলে দেখলেই বোঝা যায়।' উদাহরণ দিলেন, যেমন, পাখি ডিমে তা দিচ্ছে। সব মনটা সেই ডিমের দিকে। উপরে নামমাত্র চেয়ে রয়েছে।
রামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। বিভিন্ন নামে সবাই ডাকে। উদাহরণস্বরূপ বললেন, যেমন, জল, ওয়াটার, পানি। এক পুকুরে তিন-চার ঘাট। এক ঘাটে হিন্দুরা জল খায়। তারা বলে জল। এক ঘাটে মুসলমানরা জল খায়। তারা বলে পানি। আর এক ঘাটে ইংরেজরা জল খায়। তারা বলে ওয়াটার। তিনিই এক, কেবল নামে তফাত। তাঁকে কেউ বলছে, আল্লা, কেউ বলছে, গড, কেউ বলছে, ব্রক্ষ্ম, কেউ বলছে, কালী, কেউ বলছে, রাম, হরি, যিশু, দুর্গা।' সহজভাবে কী সুন্দর বিশ্লেষণ করেছেন! তিনি মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘মানুষগুলো দেখতে সব একরকম, কিন্তু ভিন্ন প্রকৃতি। কারও ভিতর সত্ত্বগুণ বেশি, কারও রজোগুণ বেশি, কারও তমোগুণ।’ উদাহরণ দিলেন, পুলিগুলি দেখতে সব একরকম, কিন্তু কারও ভিতর ক্ষীরের পুর, কারও ভিতর নারকেল ছাঁই, কারও ভিতর কলাইয়ের। সরল ভাষায় পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন।
একবার এক ভক্ত ঠাকুরকে প্রশ্ন করলেন, ‘কই, ঈশ্বরকে দেখতে পাই না কেন? ঈশ্বর কি আছেন?’ উত্তরে ঠাকুর বললেন, ‘মাখন খেতে ইচ্ছা, তা, দুধে আছে মাখন, দুধে আছে মাখন করলে কি হবে? খাটতে হয়, তবে মাখন ওঠে। ঈশ্বর আছেন, ঈশ্বর আছেন বললে কি ঈশ্বরকে দেখা যায়? সাধন চাই।’
দুধের মধ্যেই মাখন, দই ও ঘি রয়েছে, কিন্তু এগুলি দুধের মধ্যে আমরা দেখতে পাই না। অনেক খাটনির পর দুধ থেকে দই, ঘি ও মাখন পাওয়া যায়। সুতরাং দেখা না গেলেও দুধের মধ্যেই এগুলি রয়েছে। সেরকম ঈশ্বরকে পেতে গেলে সাধনা করতে হয়। তবেই দেখা যায়।
ঠাকুর এক ভক্তকে উপদেশ দিচ্ছেন, ‘পিঁপড়ের মতো সংসারে থাকো। এই সংসারে নিত্য-অনিত্য মিশে রয়েছে। বালিতে চিনিতে মেশানো। পিঁপড়ে হয়ে চিনিটুকু নেবে। জলে দুধে একসঙ্গে রয়েছে। চিদানন্দ রস আর বিষয় রস। হংসের মতো দুধটুকু নিয়ে জলটি ত্যাগ করবে। আর পানকৌড়ির মতো গায়ে জল লাগলে ঝেড়ে ফেলবে। আর পাকাল মাছ পাঁকে থাকে, কিন্তু গা দেখো পরিষ্কার, উজ্জ্বল।’ সংসারে কীভাবে থাকতে হয়, শ্রীরামকৃষ্ণ তার কী সুন্দর ব্যখ্যা দিয়েছেন!
অন্য পোস্ট: ভগবান মানি কেন
ঠাকুর বলতেন, ‘আগে ডুব দাও। ডুব দিয়ে রত্ন তোলো। তার পর অন্য কাজ। কেউ ডুব দিতে চায় না। সাধন নাই, ভজন নাই, বিবেক-বৈরাগ্য নাই, দু’-চারটে কথা শিখেই অমনি লেকচার।’ অর্থাৎ তিনি ঈশ্বরকে পেতে গেলে সাধন-ভজন করার কথা বলেছেন।
নামের মাহাত্ম্য সম্পর্কে ঠাকুর বলেছেন, হ্যাঁ, নামের খুব মাহাত্ম্য আছে বটে, তবে অনুরাগ না থাকলে কি হয়? ঈশ্বরের জন্য প্রাণ ব্যাকুল হওয়া দরকার। শুধু নাম করে যাচ্ছি, কিন্তু কামিনীকাঞ্চনে মন রয়েছে, তাতে কি হয়?
ঠাকুর বলেছেন, ‘ঈশ্বর দু’বার হাসেন। একবার হাসেন, যখন দুই ভাই জমি বখরা করে, আর দড়ি মেপে বলে, এদিকটা আমার, ওদিকটা তোমার। ঈশ্বর এই ভেবে হাসেন, আমার জগৎ, তার খানিকটা মাটি নিয়ে করছে, এদিকটা আমার, ওদিকটা তোমার! ঈশ্বর আর একবার হাসেন, যখন ছেলের অসুখ, সংকটাপন্ন অবস্থা। মা কাঁদছে। বৈদ্য এসে বলছে, ভয় কী মা, আমি ভালো করব। বৈদ্য জানে না, ঈশ্বর যদি মারেন, কার সাধ্য রক্ষা করে!’ ‘সকলি তোমারি ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি/ তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি।’ আমরা নিমিত্ত মাত্র, ঈশ্বরই সবকিছু করে থাকেন।
সংসারে থেকে ঈশ্বর লাভ করা যায় কি না, ভক্তের এ প্রশ্নের জবাবে ঠাকুর বলেছেন, ‘সংসারে থাকো, যেমন বড় মানুষের বাড়ির ঝি। সব কাজ করে, ছেলে মানুষ করে, বাবুর ছেলেকে বলে, আমার হরি, কিন্তু মনে মনে বেশ জানে, এ বাড়ি আমার নয়, এ ছেলেও আমার নয়। সে সব কাজ করে, কিন্তু তার মন দেশে পড়ে থাকে। তেমনই সংসারে সব কর্ম করো, কিন্তু ঈশ্বরের দিকে মন রেখো। আর জেনো যে, গৃহ, পরিবার, পুত্র, এসব আমার নয়, এ সব তাঁর। আমি কেবল তাঁর দাস।’
ঠাকুরের কথা যে অমৃত সমান, তা এই কয়েকটি উদাহরণেই যথেষ্ট। সেজন্য ঠাকুরের কথোপকথন সম্বলিত 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত' বইটি সকলেরই পড়া উচিত বলে মনে করি।