ভাস্কর সেনগুপ্ত

মানুষ যতই চেঁচামেচি, লাফালাফি করুক না কেন, সে যে প্রকৃতির অংশ, তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। আর যতই প্রকৃতির দিকে তাকাই, ততই বিস্মিত হই।
পৃথিবী নিজ অক্ষরেখার চারদিকে ঘণ্টায় ১০০০ মাইল বেগে ঘোরে। যদি এই বেগ ঘণ্টায় ১০০ মাইল হত, তাহলে আমাদের দিন ও রাত ১০ গুণ বৃদ্ধি পেত। দিন ১০ গুণ দীর্ঘ হলে সব গাছপালা রোদের তাপে মরে যেত। রাত ১০ গুণ দীর্ঘ হলে উদ্ভিদের সব অঙ্কুর মরে যেত। কে এই গতিবেগ নির্ণয় করল?
সূর্যের উত্তাপ ১২০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। আমাদের পৃথিবী এমন দুরে অবস্থিত যে, যতটুকু তাপ দরকার, ঠিক ততটাই আমরা পাই। যদি পৃথিবী আরও দুরে থাকত, তাহলে সব ঠান্ডায় জমে যেত। যদি পৃথিবী আরও খানিকটা কাছে থাকত, তাহলে সব জ্বলে পুড়ে যেত। কে ঠিক হিসেব করে পৃথিবীটাকে রেখেছে। পৃথিবীর অক্ষরেখা ২৩ ডিগ্রি কোণ করে চলে। এতে ছ’টি ঋতু হয়। যদি এরকম বাঁকা না থাকত, তাহলে সমুদ্র থেকে বাষ্প উত্তরে বা দক্ষিণে গিয়ে বরফের পাহাড় সৃষ্টি করত। এই কোণ কে স্থির করেছে?
চন্দ্র যদি ৫০০০০ মাইল দুরে থাকত, তাহলে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা এত বেশি হত যে, দিনে দু’বার সকল মহাদেশ জলে ডুবে যেত। পাহাড়গুলি ক্ষয়ে যেত। পৃথিবীর তলভাগ যদি আরও ১০ ফুট পুরু হত, তাহলে বাতাসে অক্সিজেন থাকত না। সকলেই মারা যেত। সমুদ্র যদি আরও কয়েক ফুট গভীর হত, তাহলে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যেত। সামুদ্রিক সব প্রাণী মারা যেত।
এরকম বহু নিদর্শন দেখানো যেতে পারে, যা দেখে বোঝা যায়, পৃথিবী অকস্মাৎ সৃষ্টি হয়ে যায়নি। যিনি করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। জীবনীশক্তির চেষ্টা দেখলে সৃষ্টিকর্তার অপরূপ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। জীবন কাকে বলে, কোনও মানুষ জানে না। এর না আছে কোনও আকার, না আছে কোনও আকৃতি। কিন্ত এর শক্তি আছে। একটি সামান্য গাছের শিকড় পাথর পর্যন্ত ফাটিয়ে দেয়।
জীবনীশক্তি সকল জীবন্ত প্রাণীকে রূপ দেয়। গাছের প্রত্যেক পাতাকে শ্যামল ও স্নিগ্ধ করে। প্রত্যেক পুষ্পকে মনোহর বর্ণে সাজায়। এই জীবনীশক্তি কোকিলকে কূজন এবং ভ্রমরকে গুঞ্জন করার শক্তি দেয়। ফলে রস দেয়, ফুলকে গন্ধ দেয়। প্রোটোপ্লাজম সৌরশক্তি নিয়ে উদ্ভিদকে টিকিয়ে রেখেছে। কে এই অসীম শক্তি দিল?
অতি ক্ষুদ্র প্রাণীর যে জ্ঞান ও বুদ্ধি দেখা যায়, সত্যিই আশ্চর্য। Salmon মাছ নদীতে জন্মায়। তারপর তার জন্মদাতা তাকে সমুদ্রে নিয়ে যায় ও সমুদ্রে গিয়ে প্রাণত্যাগ করে। কয়েক বছর সাগরে থেকে সেই মাছ আবার তার জন্মস্থান নদীতে ফিরে আসে। কখনও অন্য নদীতে যায় না। তাকে এই স্মৃতি কে দিল?
ঈল মাছের কাজ আরও বিস্ময়কর। এরা পুকুরে বা নদীতে জন্মায়। বড় হলে ইউরোপ থেকে শত শত মাইল সাগর পার হয়ে বারমুডা নামক দ্বীপের নিকট আটলান্টিক মহাসাগরের অতি গভীরতম স্থানে জমা হয়। সেখানে বংশবৃদ্ধি হয় ও শেষে মৃত্যু হয়। তাদের ছানাগুলি জন্মদাতার নিবাস পুকুর বা নদীতে ফিরে আসে। ইউরোপে কোথাও আমেরিকার ঈল ধরা পড়েনি। আবার আমেরিকায় ইউরোপের ঈল কখনও পাওয়া যায়নি। এই অদ্ভুত শক্তি তাদের কে দিল?
বোলতাদের চরিত্র বড় অদ্ভুত। এরা ফড়িংকে আক্রমণ করে এমনভাবে কামড়ায়, যাতে ফড়িং অচৈতন্য হয়ে পড়ে। বোলতা মাটিতে গর্ত করে সেই অচৈতন্য ফড়িংকে সেখানে নিয়ে যায়। তারপর সেখানে ডিম পাড়ে ও চলে যায়। মা বোলতার মৃত্যু হয়। বোলতার ডিম ফুটে যখন বাচ্চা হয়, তখন সেই বাচ্চা মায়ের রেখে যাওয়া অচৈতন্য ফড়িং খেয়ে বড় হয়। এই অদ্ভুত বুদ্ধি ও সামর্থ্য তাদের কে দিল?
প্রকৃতির এসব অতীব বিস্ময়কর ঘটনা বারবার মনে করায়, ভগবান আছেন। ভগবান রক্ষা করেন। ভগবান চালান। ভগবানই স্রষ্টা, আর মানুষ শুধু দ্রষ্টা।
