অশোক বসু

উদ্দেশ্য এবং বিধেয় প্রাণের বন্ধু, একথা সবাই জানলেও একটা কথা অনেকেই জানে না, ওদের দু’জনের আসল বন্ধুত্বের সূত্রপাত হয়েছিল নিজেদের মধ্যে ঘুসোঘুসি মার্কা ঝগড়ার মধ্যে দিয়ে। তখন ওরা ওদের পাড়ার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ফোরে পড়ত। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত ওরা আলাদা সেকশনে পড়ত। ক্লাস ফোর থেকে এক সেকশনে পড়ার সুযোগ পেল। ওদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা হত। তবে ওরা পাশাপাশি বসত না। তাই সেভাবে বন্ধুত্বটা তখন গড়ে ওঠেনি। একদিন স্কুলের খেলার পিরিয়ডে ওদের ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে দুটো ফুটবল টিম গঠন করে খেলা শুরু হল। এক দলের ক্যাপ্টেন উদ্দেশ্য, অপর দলের বিধেয়। দু’জনেই ফুটবলটা ভালোই খেলত। খেলার মনিটর-কাম-রেফারি ছিলেন স্কুলের ওয়ার্ক এডুকেশনের টিচার ওদের প্রিয় মুকুট স্যার। ফুটবল খেলা আরম্ভ হল। খেলা ভালোই চলছিল। রেফারি মুকুট স্যার ছাত্রদের খেলা দেখতে দেখতে এক্সাইটিং মুহূর্তে রেফারিং করতে প্রায় ভুলে যাচ্ছিলেন। যাই হোক, এভাবেই খেলা চলতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ খেলার মধ্যে একটা গোলমাল শুরু হল। দুই দলের দুই ক্যাপ্টেন উদ্দেশ্য আর বিধেয়কে দেখা গেল নিজেদের মধ্যে মারপিট করতে। মুকুট স্যার ছুটে গিয়ে ওদের দু’জনের মধ্যেকার ঝগড়া থামিয়ে দিলেন। পাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের মধ্যে একজন বলল, ‘স্যার, আমি অবাক হয়ে দেখলাম, উদ্দেশ্য যখন বিধেয়কে প্রথমে ঘুসিটা মারল, তখন বিধেয় মারামারি না করে সংখ্যা গুনছিল! অবশ্য এর পরে বিধেয়ও ঘুসি মেরেছিল উদ্দেশ্যকে।’ মুকুট স্যার তখন বিধেয়কে বললেন, ‘ফন্টা যা বলল, সেটা কি সত্যি?’ বিধেয় বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আগে উদ্দেশ্য আমায় ঘুসি মেরেছে।’ মুকুট স্যার বললেন, ‘বিধেয়, তখন তুই সংখ্যা গুনছিলিস?’ বিধেয় বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমার মা বলে দিয়েছিল, আমার রাগ হলে আমি যেন ১৫ সংখ্যা পর্যন্ত গুনি।’ উদ্দেশ্য বলল, ‘আমার মাও তাই বলেছে, তবে যেন ১০ সংখ্যা পর্যন্ত গুনি।’ মুকুট স্যার বললেন, ‘এবার সব বুঝেছি। উদ্দেশ্য ১০ পর্যন্ত গুনেই মারপিট শুরু করেছে। আর বিধেয় ১৫ পর্যন্ত গোনার পর মারপিট শুরু করেছে। ঠিক তো?’ উদ্দেশ্য আর বিধেয় দু’জনেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। মুকুট স্যার বললেন, ‘তোরা দু’জনেই ভীষণ বোকা। তোদের মায়ের আসল উদ্দেশ্য তোরা বুঝতে পারিসনি। তোদের দু’জনের মা ১০ বা ১৫ পর্যন্ত গুনতে বলেছিলেন রাগ হলে। তার কারণ সংখ্যা গোনার সময় মনটা অন্যদিকে চলে গেলে রাগ চলে যাবে। আর তখন আর মারপিট করবি না।’ উদ্দেশ্য বলল, ‘স্যার, সংখ্যা গুনলাম, কিন্তু রাগ তো কমল না।’ বিধেয় বলল, ‘আমারও তাই মনে হল স্যার।’ মুকুট স্যার বললেন, ‘এটা রাগ থামানোর একটা পদ্ধতি। আরও অনেক পদ্ধতি আছে। যেমন, রাগ হলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখা।’ ফন্টা বলল, ‘স্যার, খেলার মাঠে আয়না ওরা কোথায় পাবে?’ মুকুট স্যার বললেন, ‘ফন্টা, তুই চুপ কর। হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, রাগ হলে আমরা কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলি। বুদ্ধি লোপ পায়। এর ফলে আমরা উন্মাদের মতো আচরণ করে ফেলি। তাই রাগকে বলা হয় আমাদের পরম শত্রু। এ কারণে রাগ হলে সেটাকে না কমালে রাগ আমাদের বড় বিপদ ডেকে আনে।’ উদ্দেশ্য বলল, ‘স্যার, আমি এবার বুঝেছি।’ বিধেয় বলল, ‘স্যার, আমিও বুঝেছি।’ মুকুট স্যার বললেন, ‘রাগ হলেই মনে করবি একটা কথা, একজন রাগি ব্যক্তি মানে একজন বোকা লোক।’ এ কথা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে হবে, আমরা চাই না, আমাদের কেউ বোকা বলুক। আর তখনই আমাদের রাগ চলে যাবে।’ ফন্টা বলল, ‘উদ্দেশ্যর আর বিধেয়র মা যদি ১০ পর্যন্ত গুনতে বলতেন, তবে ওরা দু’জন একই সময় ঘুসোঘুসিটা করতে পারত।’ মুকুট স্যার বললেন, ‘ফন্টা, তুই আবার আজেবাজে বকছিস!’ ফন্টা বলল, ‘আর বলব না স্যার।’ মুকুট স্যার এবার উদ্দেশ্য আর বিধেয়র দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এরপর যদি দেখি তোরা আবার ঝগড়া করছিস, তবে আমি হেড স্যারের কাছে রিপোর্ট করতে বাধ্য হব। সেক্ষেত্রে উনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটাই তোদের মাথা পেতে নিতে হবে। এমনকী স্কুল ছাড়ার নোটিশও দিতে পারেন তোদের। জানিস তো, উনি কেমন রাগি!’ উদ্দেশ্য বলল, ‘স্যার, হেড স্যারের তাহলে উচিত রাগ হওয়ার সময় সংখ্যা গোনা। এতে রাগ চলে যেতে পারে।’ বিধেয় বলল, ‘ঠিক বলেছিস উদ্দেশ্য। তাহলে হেড স্যারের ঘরে একটা বড় আয়নাও ফিট করে দেওয়া উচিত।’ মুকুট স্যার এবার কৃত্রিম গাম্ভীর্য দেখিয়ে বললেন, ‘তোদের আর পাকামি করতে হবে না। যা, আজ খেলা শেষ। ক্লাসে এবার চলে যা সবাই।’ এবার উদ্দেশ্য আর বিধেয়কে দেখা গেল হাত ধরাধরি করে ক্লাসের দিকে যেতে। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত ওরা কোনওদিন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করেনি, যদিও একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে কমন অপনেন্টের বিরুদ্ধে। সেদিন থেকেই ওদের মধ্যে প্রকৃত বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল।
