Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সবাই রবি হতে পারে না

Share Links:

কাজল মুখার্জি

ভদ্রলোক, আসলে আমাদের রবি। আমাদের সঙ্গেই পড়ত৷ বলতে গেলে হাফপ্যান্ট নয়, বরং সেই ইয়ে বেলার বন্ধু৷ সকলের ভীষণ প্রিয় ছেলেটার একটা বিশেষ গুণ ছিল, যাতে হাত দিত, সেটাতেই সোনা হয়ে ফলত৷  যেন ঘটনাগুলি থাকত ওর অপেক্ষাতেই৷ ফাইনাল পরীক্ষার আগে যখন আমরা দিনরাত এক করে পড়ছি, ব্যাটাচ্ছেলে তখন পাশের পাড়ায়৷ হাফ পিচ ক্রিকেট ম্যাচ, প্রাইজ আড়াই কেজি মুরগি৷

পরীক্ষার দিনও দেখতাম, আমরা সবাই কপালে দইয়ের ফোঁটা নিয়ে, পকেটে ঠাকুরের ফুল গুঁজে, খাতার উপর ঠাকুরের নাম লিখে প্রশ্নপত্রের জন্য রেডি৷ রবির বেঞ্চ তখনও খালি৷ স্যার প্রশ্নপত্র দেওয়া শেষ করবেন, হঠাৎ হাজির রবি৷ একপ্রস্থ ধমক খেয়েও নির্বিকার মুখে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে যেত৷ কখনও কেমন তো এমন তাড়াহুড়ো করত, ঘণ্টা পড়ার আগেই স্যারকে খাতা দেওয়ার জন্য উদগ্রীব৷

রেজাল্ট বের হওয়ার দিন প্রতিবারের মতোই রবি ফার্স্ট৷ তখন চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছি সবাই৷ কোন বই পড়ব, কোথায় গাইড নেব, এই ভাবনায় অস্থির৷ দিনরাত আমাদের টেনশন, আলোচনা তুঙ্গে৷ রবি তখন ‘ভ্রমণ পত্রিকা’র পাতা উলটে পালটে দেখছে, জনে জনে জিজ্ঞাসা করছে, ‘চ, দিঘা গেলে পার হেড ৩০০ টাকা দিলেই হয়ে যাবে৷ যাবি?’

পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখলাম রবি বসে৷ অথচ কখন ফর্ম ফিলাপ করল কেউ জানি না৷ রেজাল্টের কলামে রবি ‘কোয়ালিফায়েড’, আমার ‘নট’৷

আমাদের জীবনে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ ভীষণ হিসেব নিকেশ করে চলেন৷ জীবনযাপনের প্রতিটি মুহূর্ত একটা রুটিনের ঘেরাটোপে বন্দি থাকেন৷ আবার অনেকে আছেন, যাঁরা নিয়মের তোয়াক্কাই করেন না৷ নিয়ম ভাঙার জন্যই যেন তাঁদের অস্তিত্ব৷ জীবনটাকে ভীষণ ক্যাজুয়েলি ডিল করেন৷ দূর থেকে দেখে মনে হয়, ‘টেনশন’ নামক শব্দটাই বোধ হয় তাঁদের অভিধানে নেই৷ সাফল্য বোধ হয় এই মানুষগুলির জন্যই অপেক্ষা করে থাকে, যেচে এসে ধরা দেয়৷ মানুষগুলি সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন না৷

রবি-সহ আমরা অনেকেই একবার একটি পরীক্ষায় পাশ করেছিলাম৷ ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার সময় সবাই ফুলহাতা জামা প্যান্টের ভিতরে গুঁজে ফর্মাল হয়ে রেডি। রবি তখন জিন্স আর টি-শার্টে৷ টেবিলে গিয়ে নাকি রবি বলে এসেছিল, ‘আমার পারফরমেন্স চাই? নাকি ড্রেস কোড?’

রবির চাকরি হয়নি, আমাদেরও হয়নি৷ যদিও তারপরও রবির গোটাকয়েক চাকরি করা, ছাড়া হয়ে গিয়েছে৷

রবির সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল বছর দশেক আগে৷ গ্রামের একটি পুজোয় সবার বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা৷ পাশের পাড়ার এক বাড়িতে অনেক কুটুম্বের মধ্যে একটি মেয়ে তখন আমাদের আলোচনার একমাত্র বিষয়৷ সে মেয়ে নাকি খুব হাইফাই, কাউকে বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দেয় না৷ নন্দ কিছু বলতে গিয়ে ঝাড় খেয়ে এসেছে৷ দিনসাতেক পর দেখলাম, রবির প্রোফাইলে সেই মেয়েটার ছবি, মাথায় সিঁদুর, পাশে হাসিমুখে রবি৷

এতগুলি দিন পেরিয়ে এসে মাঝেমধ্যে বোধ হয়, জীবনে রবি হওয়াটা খুব প্রয়োজন৷ সামনে পাহাড়প্রমাণ সমস্যা দেখেও নিজেকে শান্ত রাখা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা, সর্বোপরি নিজ লক্ষ্যে স্থির থাকা জরুরি৷ আমরা পারি না৷ ছোটখাটো বিষয়ে আমরা আমাদের কমফোর্টেবল জোন থেকে অল্প সরে গেলেই হা-হুতাশ করে জীবনটা দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিই৷ কখনও দুঃখ-কষ্ট পাই যতটা, সাজিয়ে পরিবেশন করি তার চেয়েও বেশি৷ রবিরা করে না৷ আসলে সবাই রবি হতে পারে না।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

নববর্ষ

একুশে ফেব্রুয়ারি

গদ্যের বারান্দা ৪৩-৬০

গদ্যের বারান্দা ৪২

গদ্যের বারান্দা ৪১

গদ্যের বারান্দা ৪০

প্রিন্টআউট

গদ্যের বারান্দা ৩৬-৩৮

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল শিখা দীপ মুখোপাধ্যায়

গদ্যের বারান্দা ২৬-৩৫