Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

চৌকাঠ

Share Links:

সুচরিতা চক্রবর্তী

গ্রাজুয়েট হওয়ার আগেই নীলার সৎ বাবা বিয়ে দিয়ে দিল তার। নীলার নিজের বাবা মারা যাওয়ার পরপরই আসে এই নতুন বাবা। নতুন বাবা লোকটিকে কোনওদিন ভালো চোখে দেখেনি নীলা। কেমন যেন পাশবিক আচরণ করত নীলার মায়ের সঙ্গে। নীলার সঙ্গেও। দু’বেলা খাওয়া আর একটা ছাদের জন্য বহু মার খেয়েছে নীলার মা। অনেকবার খারাপ ইঙ্গিত করেছে সৎ মেয়েকে। খারাপ মতলবে গায়েও হাত বুলিয়েছে। কিন্তু ওই ভাত আর ছাদ। সেই চার বছর বয়স থেকে কিশোরী, তারপর যুবতী। একইরকম অত্যাচার সহ্য করেছে নীলা। বর্তমানে মায়ের অসুখের পিছনে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে বলে মেয়ে নামক জীবটিকে আর পুষতে পারবে না। কন্যাপণ নিয়ে মোটামুটি নীলাকে বিক্রি করে দিল নতুন বাবা নামক অপদার্থ লোকটি।

নীলার ব্যবসায়ী পতিদেবতাটির জীবনে নিয়মশৃঙ্খলা ছিল না। কেবল নীলাকে শাসন করত নিয়ম করে। পোশাক থেকে পড়াশোনার ইচ্ছা, এমনকী রবীন্দ্রসংগীতেও আপত্তি পতিদেবতার। নীলা নিজেকে খুঁজে পেত শোয়ার ঘরের খোলা জানলা, বারান্দা আর ছাদে। দোতলার সিঁড়িতে বসে নিজের কথা লিখতে লিখতে ডায়েরি ভরে যাচ্ছিল। জবাবদিহি করত কাগজে কলমে আর তা লুকিয়ে রাখত মায়ের দেওয়া শখের ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে।

নীলার কোনও সন্তান হল না। ফলে পতিদেবতার আর মন টেঁকে না ঘরে। শারীরিক অত্যাচারের দাগ চার-পাঁচদিনেই মিলিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ভরে যাচ্ছিল ডায়েরির পাতা। রোজ রাতেই অকথ্য গালাগালি আর মার খাওয়া হয়ে গেলে রাতের ভাত হজম হত নীলার। নিজের বলতে মায়ের দেওয়া ড্রেসিং টেবিল আর পাঁচটি ডায়েরি।

নীলার সৎ ভাই কোথা থেকে একটা বিয়ে করে নিয়ে ঘরে এল। সৎ ভাইটি নীলাকে বেশ ভালোবাসত। ভাই আর নতুন বাবার সব সময় লাঠালাঠি চলে বাড়িতে। এ বলে, আমায় দেখ, তো ও বলে, আমায় দেখ। বিয়ে করে আনার পর সে কী দক্ষযজ্ঞ বেধে গেল নীলার বাপের বাড়িতে। সৎ ভাইয়ের আবদার, আনুষঙ্গিকভাবে বউ ঘরে তুলতে হবে। নীলার মা তার নতুন বাবাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটা ব্যবস্থা করেছে। বিয়ের মাস নয়, তবু ছোট করে অনুষ্ঠান হল। ভাই নীলাকে একখানা গোলাপি রঙের শাড়ি দিয়ে বলল, দিদি, তোকে তো কোনওদিন কিছু দিইনি, তুই এই শাড়িটা পরবি।

নীলা বুঝতে পেরেছিল নতুন বউয়ের পাওনা থেকে ভাই এই শাড়ি দিয়েছে। আর কথা না বাড়িয়ে শাড়িখানা ব্যাগে রেখেছিল।

ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে নীলা চার-পাঁচদিন মায়ের কাছে রইল। নতুন বাবার দহরমমহরম একটু কমেছে। ছেলে বড় হয়েছে। সে আর বাপের খিস্তিখেউর শুনবে কেন? সে তো আর সৎ মেয়ে নয়।

বিয়ে থেকে ফিরে নীলা কাণ্ডজ্ঞান হারাল মুহূর্তের মধ্যে। তার পতিদেবতাটি পুরোনো খবরের কাগজ পুরোনো জিনিসপত্রের সঙ্গে বিক্রি করে দিয়েছে পাঁচ বছরের দলিল পাঁচটা ডায়েরি। নীলা আর নিজের মধ্যে নেই। হাত-পা কামড়ে মাথার চুল ছিঁড়ে পাগল হওয়ার মতো অবস্থা। কৈফিয়ত চাওয়ার অপরাধে নীলার কপালে জুটল চড়থাপ্পড়। আজ নীলা কাঁদেনি, দাঁত দিয়ে রাগ চেপে ধরেছে নীচের ঠোঁটে। দুটো দাঁত বসে গিয়ে রক্ত বেয়ে এসেছে গালের কোণে।

মাঝরাতে পতিদেবতার অত্যাচারী নাকের ডাক বদলে গেল প্রাণঘাতী চিৎকারে। যতক্ষণে খবর ছড়াল, ততক্ষণে পতিদেবতার গলার নলি কেটে ফেলেছে নীলা।

তারপর থেকেই জেলে বন্দি নীলা। একদিন আর এক বন্দি আমিনাকে সে বলল, কী হয়েছে রে আমিনা, আজ এত ভালো ভালো খাবার দিচ্ছে কেন আমাদের?
–  ওই তো, শুনছিলাম, আজ নাকি মেয়ে দিবস। তাই জেলের মেয়েদের ভালো খাবার দিচ্ছে।

একথালা সুস্বাদু খাবারের দিকে তাকিয়ে নীলার মনে পড়ছিল সেই চৌকাঠটার কথা, যেটা দেখিয়ে প্রায়ই ওর পতিদেবতা বলত, বেরিয়ে যা বাঁজা মাগি। তোর মুখ আর দেখব না।

তারপর একটু মুচকি হেসে নীলা বলল, রোজ রোজ কেন মেয়েদের দিন হয় না বল দিকিনি।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

নববর্ষ

একুশে ফেব্রুয়ারি

গদ্যের বারান্দা ৪৩-৬০

গদ্যের বারান্দা ৪২

গদ্যের বারান্দা ৪১

গদ্যের বারান্দা ৪০

প্রিন্টআউট

গদ্যের বারান্দা ৩৬-৩৮

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল শিখা দীপ মুখোপাধ্যায়

গদ্যের বারান্দা ২৬-৩৫