ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
প্রফেসর, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
![]()
সে এক দিন ছিল, যখন গল্প, গান, কবিতায় পোস্টকার্ড বা কথ্য ভাষায় ‘চিঠি’র মাহাত্ম্য সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সামাজিকতা রক্ষায় একখণ্ড হলদেটে পুরু কাগজের আন্তরিকতার ছোঁয়ায় বাঙালি হৃদয় যারপরনাই পুলকিত হত। বিশেষ করে বিজয়া দশমীতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরে ঘরে পোস্টকার্ডের ছিল অবারিত দ্বার। আত্মার সঙ্গে আত্মীয়তা রক্ষার এই সুকুমার মনোবৃত্তির এমন মণি-কাঞ্চন যোগের তুলনা পাওয়া দুষ্কর।
এখন যাঁরা ৫০ বা তার উপরে, তাঁদের মনের মণিকোঠায় চিঠির একটি আলাদা অনুভূতি আজও সযত্নে রক্ষিত আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে জসীমউদ্দীন, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) থেকে প্রতিভা বসু, অনেকেই তাঁদের কালজয়ী রচনায় মনের মাধুরী মিশিয়ে চিঠির সামাজিক গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন হরষে-বিষাদে। আজ চিঠি তার পূর্বগৌরব হারিয়ে ইতিহাসের এক অধ্যায়ে পর্যবসিত হতে চলেছে।
চিঠিপত্রের রকমফেরের তারতম্য অনুযায়ী এর শ্রেণিবিন্যাসটিও চোখে পড়ার মতো। প্রায় ৪০ বছর আগের একটি খতিয়ান উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৫ পয়সার বিনিময়ে যে হলদেটে পোস্টকার্ড পাওয়া যেত, সেটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। যাবতীয় গোপনীয়তার অর্গলমুক্ত। নিম্নবিত্তের সামাজিকতা রক্ষার আন্তরিক তাগিদ। ৫০ পয়সার নীল খাম, যা তিনদিক থেকে ঘন আঠায় চেটানো গোপনীয়তা রক্ষার জন্য। সেখানে মনের কথা গোপনীয় থাকত। আর ছিল ১ টাকার সাদা খাম। তার মধ্যে অনেকখানি লেখার সুবিধা সমন্বিত ব্যবস্থা থাকত। অতিরিক্ত মাশুল দিলে এখানে পাতার পর পাতা লিখে মন দেওয়া-নেওয়ার সুযোগ মিলত। কিন্তু যে বিষয়টি সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সেটি হল, গভীর আবেগজনিত নৈকট্য, যা পরিণামে সামাজিক মেলবন্ধনে সহায়ক হয়ে উঠত।
বিজয়া দশমীতে গুরুজনদের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের ভালোবাসা জানানোর জন্য এমন আত্মিক আবেদনের রীতির জুড়ি মেলা ভার। কখনও কোনও তুচ্ছ কারণে মনোমালিন্য হলেও বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছাপত্রে তা উপশম হত। “তোমাকে অনেকদিন দেখিনি। দেখতে বড্ড ইচ্ছা করে”, এই ক্ষুদ্র সংলাপেই হৃদয়ের দ্বার যায় প্রসারিত হয়ে। আবার “তুমি আমার শুভ বিজয়া দশমীর ভূমিষ্ঠ প্রণতি গ্রহণ করো”, এই আত্মনিবেদনের মধ্যে এক অপার আনন্দ লাভ করা যায়। আর দশমীর চিঠিপত্রে ভালোবাসা জানানোর মধ্যেও যে আন্তরিকতার ছোঁয়া থাকে, তা কেবল মিলন-সঙ্গমের পথ প্রশস্ত করে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বিজয়া-দশমী’ কবিতায় সেরকমই এক ভালোবাসার ছবি বিধৃত আছে, “যেয়োনা, রজনি, আজি লয়ে তারাদলে!/ গেলে তুমি দয়াময়ী, এ পরাণ যাবে!”
অন্য পোস্ট: প্লাস্টিক নিষ্ক্রিয়তায় জোর দেওয়া দরকার
বর্তমানের চিত্রপট সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী। বাজারমুখীও বলা যায়। বিজয়া দশমীতে শুধুই টেক্সট মেসেজের বন্যা। একটি বা দু’টি শব্দে অথবা গ্রাফিক্সের প্রয়োগে। নিজেকে বানাতেও হয় না। ফরোয়ার্ড অপশনে গিয়ে শুধু ‘send’ করলেই দায়িত্ব শেষ। দায়সারা সংযোগ স্থাপনের এই চেষ্টা প্রেরক ও প্রাপক উভয়েই অনুভব করলেও এটাই এখন দস্তুর। এতেই কমবেশি সবাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির কারসাজির কাছে হৃদয় থেকে উৎসারিত আবেগের পরাজয়ের যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ের সূচনা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিজয়া দশমীর প্রণাম নিবেদনের পর মিষ্টিমুখ সাঙ্গ করার প্রথা বতর্মানে বিলুপ্তির পথে।
একসময় গ্রামগঞ্জে বিজয়া দশমী পালনের জন্য নারকেল নাড়ুর কদর ঘরে ঘরে প্রচলিত ছিল। আজ নরকেল নাড়ু তৈরি ‘হ্যাপা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সনাতনী প্রথা ও পদ্ধতিগুলি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, রিলের ভোক্তাদের এত খাটুনি কি আর এখন সহ্য হয়! আমাদের মা-ঠাকুমাদের সময় ভাগ্যিস প্রযুক্তির রমরমা চালু হয়নি, না হলে এই সাংস্কৃতিক রোমন্থনের কোনও সুযোগই থাকত না।
আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পোস্টকার্ড বা খাম কি একেবারেই বেমানান? একদমই নয়, বরং উলটোটা। লেখালিখির অভ্যাস সচল থাকার ফলে ভাষাচর্চা অব্যাহত থাকে। ভাষার উৎকর্ষসাধন সম্ভবপর হয়। মানবিক সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ়তর হয়। আবেগের সলতে উসকে মননের পরিধি দেশ-কালের গণ্ডি পার করে এক ফুরফুরে আমেজ আনতে সাহায্য করে। তাই বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছাবার্তা পাঠাতে পোস্টকার্ড ও খামের ব্যবহার পুনরায় ব্যাপকভাবে চালু হোক। এই সমস্যাসঙ্কুল পৃথিবীতে মননের আদান-প্রদানের বড় প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে এই রসে সিক্ত করার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।
