Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (পর্ব ৩)

যেখানে সত্যের পরিণাম অসৎ এবং অসত্যের পরিণাম শুভ, সেখানে মিথ্যাটাই ধর্ম। অর্থাৎ সত্য যদি মিথ্যার চেয়েও খারাপ ফল প্রদান করে আর মিথ্যা যদি মঙ্গলময় কিছু ঘটাতে সাহায্য করে, তবে সেক্ষেত্রে মিথ্যাটাই ধর্ম।

Share Links:

মানস চক্রবর্তী

শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, “যার সত্যনিষ্ঠা আছে, মা তার কথা কখনও মিথ্যা হতে দেন না।” এ শুধু ভাবের কথা নয়, বাস্তবিকই ঠাকুরের জীবনে এই কথার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। দক্ষিণেশ্বরে অবস্থান করে শ্রীশ্রীমা ঠাকুরের রান্না করতেন। মাঝেমধ্যে গোপালের মা যখন আসতেন, তখন গোপালের মা-ই রান্না করতেন। একদিন দক্ষিণেশ্বরে গোপালের মা ঠাকুরকে ভাত রেঁধে খাওয়াবেন ঠিক হল। সব প্রস্তুত। ঠাকুর খেতে বসে দেখলেন ভাতগুলি সেদ্ধ হয়নি। খুব বিরক্ত হলেন। বললেন, “এ ভাত কি আমি খেতে পারি? ওর হাতে আর কখনও ভাত খাব না।”

সবাই ভাবলেন, গোপালের মাকে ভবিষ্যতে সাবধান করার জন্য বোধ হয় তিনি এই কথাগুলি বললেন। কারণ গোপালের মাকে ঠাকুর খুব আদর-যত্ন করেন। কিন্তু ঠাকুরের কথাই সত্যি হল। কিছুদিন পরেই গলায় অসুখ ধরা পড়ল। ক্রমে দিন দিন তা বাড়তে লাগল। ঠাকুরের ভাত খাওয়া বন্ধ হল। গোপালের মায়ের হাতে ঠাকুরের আর কোনওদিন ভাত খাওয়া হয়নি।

সত্যের প্রতি আঁট বলতে আমরা কী বুঝি? আর্থিক, সামাজিক অথবা যে কোনও কারণের জন্যই সত্যকে খাটো না করাই হল সত্যের প্রতি আঁট। আর এই সত্যনিষ্ঠা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনে অনেক ছোট বয়স থেকেই দেখা গিয়েছিল। গদাধরের উপনয়ন। গোঁ ধরেছেন ধনী কামারনি তাঁর ভিক্ষা মা হবেন। কিন্তু তিনি ব্রাহ্মণ সন্তান। পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় অশূদ্রযাজী। শূদ্রের হাত থেকে দান নেন না। দাদা রামকুমার তাই বেঁকে বসলেন। সমাজ বলে তো একটা কথা আছে। সবাই বোঝাচ্ছে গদাধরকে। গদাধরের ওই এক কথা। ধনী কামারনিই তাঁর ভিক্ষা মা হবেন। বললেন, “ওইরূপ না করলে তাঁকে সত্যভঙ্গের অপরাধে অপরাধী হতে হবে এবং মিথ্যাবাদী ব্যক্তি ব্রাহ্মণোচিত যজ্ঞসূত্রধারণে কখনও অধিকারী হতে পারে না।” সেদিন ওই ন’বছরের ছেলের কাছে হেরে গেল একটি গোটা সমাজব্যবস্থা।

সত্য রক্ষার জন্য একটি আদর্শ স্থানীয় জীবন হল ভীষ্মদেব। তিনি বলেছেন,”পরিত্যজেয়ং ত্রৈলোক্যং রাজ্য দেবেষু বা পুনঃ।” আমি সত্যরক্ষার জন্য ত্রৈলোক্যকে ত্যাগ করতে পারি, রাজপদ, ইন্দ্রপদ ত্যাগ করতে পারি। এ শুধু কথার কথা নয়, সত্য প্রতিজ্ঞা।

রাজা শান্তনু পড়লেন ধীবর কন্যার প্রেমে। বিয়ে করতে চাইলেন সত্যবতীকে। ধীবররাজ বললেন, আমি আমার মেয়ের সঙ্গে আপনার বিয়ে দিতে পারি এক শর্তে। সত্যবতীর গর্ভে যে সন্তান হবে, সেই রাজা হবে। রাজা শান্তনুর পক্ষে এ প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। দেবব্রত সব দিক থেকে উপযুক্ত। তাঁকে বঞ্চিত করে আত্মসুখ চান না শান্তনু। শান্তনু মনোকষ্ট চেপে রেখে অস্বীকার করলেন এ সম্বন্ধকে। দেবব্রত সব জানতে পেরে ধীবরাজকে গিয়ে বললেন, “যোহস্যাং জনিষ্যতে পুত্রঃ স নো রাজা ভবিষ্যতি।”

ধীবররাজ বললেন, স্বীকার করে নিচ্ছি তোমার কথা। কিন্তু তোমার বিবাহের পর যে সন্তান হবে, সে তো সিংহাসন দাবি করতে পারে। দেবব্রত অভয় দিয়ে বললেন, “ব্রহ্মচর্য্যং ভবিষ্যতি”। ব্রহ্মচর্যব্রত পালনের জন্য সংকল্পবদ্ধ হলেন দেবব্রত। ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্য দেবব্রতের নাম হল ভীষ্ম। শান্ত হলেন ধীবররাজ। তাঁর মেয়ে সত্যবতীর সঙ্গে রাজা শান্তনুর বিয়ে দিলেন।

অন্য পোস্ট: আজকের দিনে ভগবান ও ধর্মের কী প্রয়োজন

শান্তনু ও সত্যবতীর দুই সন্তান হল, বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদ। যুদ্ধে নিহত হলেন চিত্রাঙ্গদ। নীতিহীন জীবনযাপন করতে গিয়ে মারা গেলেন বিচিত্রবীর্যও। বংশ লোপ হওয়ার উপক্রম হলে শাস্ত্রীয় বিধান মেনে সত্যবতী ভীষ্মকে দুই ভ্রাতৃবধূর গর্ভে সন্তান উৎপাদনের অনুরোধ জানালেন। বিকল্প হিসাবে রাখলেন বিবাহ করে রাজ্যে অভিষিক্ত হওয়া। কারণ শান্তনুর পিণ্ড ও বংশ রক্ষার ভার তাঁরই ওপর। ভীষ্ম স্মরণ করলেন তাঁর প্রতিজ্ঞার কথা। এবং বললেন, পৃথিবী তার গন্ধ ত্যাগ করতে পারে, জল তার রস ত্যাগ করতে পারে, সূর্য তার আলোক ত্যাগ করতে পারে, জ্যোতি তার রূপ ত্যাগ করতে পারে, বায়ু তার স্পর্শ ত্যাগ করতে পারে, আকাশ শব্দ ত্যাগ করতে পারে, অগ্নি উষ্ণতা ত্যাগ করতে পারে, স্বয়ং ধর্মরাজ তাঁর ধর্ম ত্যাগ করতে পারেন, কিন্তু আমি আমার সত্য ত্যাগ করতে পারি না। প্রশংসনীয় সত্যনিষ্ঠা।

তাহলে কি সত্য পালনে বিচার চলে না? এর অনুসন্ধানে একটু মনোনিবেশ করি। ‘সত্য কথা কলির তপস্যা’র ব্যতিক্রম অনেক স্থলে যুক্তিগ্রাহ্য বলে বিবেচিত হয়। উপনিষদ বলেছে, সত্যং বদ ধর্মং চর। বাক্যটিতে নীতি-নৈতিকতার একটি দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সত্য বলতে গিয়ে অনেক স্থলে ধর্ম লঙ্ঘিত হচ্ছে, আবার ধর্ম রক্ষার্থে সত্যের অপলাপ ঘটছে। সুতরাং এই দ্বন্দ্বের সমাধান কী হবে?

এখন আমাদের মহাভারতের শরণাপন্ন হতে হবে। মহারাজ যুধিষ্ঠির একবার কর্ণের সামনে পড়ে গিয়েছিলেন। শত্রুপক্ষকে সামনে পেয়েও কর্ণ কিন্তু যুধিষ্ঠিরকে বধ করেননি। কারণ তিনি কুন্তীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, তাঁর একমাত্র প্রতিপক্ষ অর্জুন। কিন্তু একটু শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুধিষ্ঠিরের শিরস্ত্রাণটি উড়িয়ে দিলেন। যুধিষ্ঠিরের মতো স্থির বুদ্ধির মানুষও অপমান হজম করতে পারলেন না।

অর্জুন সামনে আসতেই যুধিষ্ঠিরের রাগ যেন দ্বিগুণ হল। তিনি বললেন, গর্ভে থাকাকালীন যদি পাঁচ মাসে তাঁর জন্ম হত, তাহলে ভালো হত। আরও ভালো হত, যদি অর্জুন একেবারেই না জন্মাত। অর্জুন দাদাকে খুব মানতেন। তিরস্কার সহ্য করতে অর্জুনের কষ্ট হচ্ছিল, তবুও হজম করে নিলেন। এদিকে উত্তরোত্তর যুধিষ্ঠিরের রাগের পারদ চড়ছে। প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত অবস্থায় অর্জুনকে তাঁর থেকে শক্তিশালী কারও হাতে গাণ্ডীবটা তুলে দিতে বললেন।

এতক্ষণ শান্ত থাকা অর্জুন হঠাৎই ক্রোধান্বিত হয়ে উন্মুক্ত তরবারি হাতে দাদার দিকে ছুটে গেলেন। হঠাৎ কী এমন ঘটল যে, অর্জুনের তরবারি হাতে দাদাকে মারতে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ল? স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বাধা দিয়ে বললেন, “অর্জুন, এ কী? তুমি তলোয়ার উঠিয়েছ কেন? এখানে তো এমন কেউ নেই, যার সঙ্গে তুমি যুদ্ধ করবে? তোমার বধযোগ্য কাউকে তো আমি দেখছি না। তাহলে কাকে বধ করতে চাও?” শ্রীকৃষ্ণের প্রশ্নের উত্তরে ক্রোধান্বিত অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “গোবিন্দ, আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি যে, কেউ যদি আমায় গাণ্ডীব অন্য কাউকে দিয়ে দিতে বলে, তাহলে আমি তার মাথা কেটে নেব। রাজা আপনার উপস্থিতিতে আমাকে সেই কথা বলেছেন, সুতরাং আমি তাঁকে ক্ষমা করতে পারব না। আজ এঁকে বধ করে আমি আমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করব।”

শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ধিক্কার জানিয়ে বললেন, আজ বুঝতে পারলাম যে, তুমি কখনও বয়োজেষ্ঠদের সেবা করোনি, তাই আজ তুমি এতখানি ক্রোধের বশীভূত। তুমি ধর্ম থেকে চ্যুত হওয়ার ভয়ে যে নিষ্ঠুর কাজ করতে চলেছ, তাতে প্রমাণিত হয়, তুমি একজন ধর্মভীরু ও অজ্ঞ। অজ্ঞানতাবশত নিজেকে ধর্মবেত্তা মনে করে তুমি যে ধর্মের পালন করতে উদ্যত হয়েছ, তাতে জীব হত্যার মতো গুরুতর পাপের ভাগী হবে তুমি।

অন্য পোস্ট: পরিবেশ বাঁচাতে চিপকো আন্দোলন আজ খুবই প্রাসঙ্গিক

তারপর শ্রীকৃষ্ণ নিজের বিচার অর্জুনকে শোনালেন, প্রাণী হিংসা না করাই সবচেয়ে বড়ধর্ম। প্রাণ রক্ষার জন্য যদি মিথ্যা বলতে হয়, তবে সেটাই ধর্ম এবং তাই করা উচিত। যে যুদ্ধ করে না, কারও সঙ্গে শত্রুতা রাখে না, যুদ্ধে বিমুখ প্রস্থান করে, শরণ গ্রহণ করে, হাতজোড় করে থাকে, অসাবধান, এরূপ ব্যক্তিরা বধযোগ্য নয় বলে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অভিমত। যুধিষ্ঠিরের মধ্যে এই সব ঘটনাই বর্তমান। এরপর শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ধর্মের প্রতিপাদ্য বিষয় ও ব্যবহারিক দিকের মধ্যে পার্থক্যটা ধরিয়ে দিতে সচেষ্ট হলেন। বললেন, যেখানে সত্যের পরিমাণ অসৎ এবং অসত্যের পরিমাণ শুভ, সেখানে মিথ্যাটাই ধর্ম। অর্থাৎ সত্য যদি মিথ্যার চেয়েও খারাপ ফল প্রদান করে আর মিথ্যা যদি মঙ্গলময় কিছু ঘটাতে সাহায্য করে, তবে সেক্ষেত্রে মিথ্যাটাই ধর্ম। তাছাড়া পাঁচটি স্থানে মিথ্যা বললে পাপ হয় না— বিবাহকালে, স্ত্রী প্রসঙ্গে, কারও প্রাণসংশয় উপস্থিত হলে, সর্বস্ব অপহরণ হওয়ার সময়, ব্রাহ্মণের মঙ্গলে বা স্বার্থরক্ষায়। প্রাণহানি না করার মধ্য যে ধর্ম আছে, তার চেয়ে বড় ধর্ম আর কিছু হতে পারে না। সেখানে যুধিষ্ঠির তো একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাঁকে হত্যা করার প্রশ্নই উঠতে পারে না। ধর্মের গতি ও বিচার, দুই-ই সূক্ষ্ম।

এ প্রসঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কৌশিক নামে এক ব্রাহ্মণের কাহিনি শোনালেন। কৌশিকর সংকল্প ছিল, তিনি আজীবন সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলবেন। এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ট খ্যাতিও অর্জন করেছিলেন। একদিন তিনি তাঁর আশ্রমে বসে আছেন। ঠিক সে সময় প্রাণভয়ে ভীত হয়ে কতকগুলি নিরীহ লোক তাঁর আশ্রমে প্রবেশ করে লতাগুল্মাদির অন্তরালে লুকিয়ে পড়লেন। কিছু সময় বাদেই একদল দস্যু সেই আশ্রমে প্রবেশ করে খোঁজাখুঁজির পর নিরীহ লোকগুলির সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে ব্রাহ্মণ তপস্বীর শরণাপন্ন হল। তপস্বী কৌশিক সত্য সংকল্প থেকে চ্যুত হওয়ার ভয়ে লোকগুলির সন্ধান জানিয়ে দিলেন। দস্যুরা তখন নিরীহ লোকগুলিকে নৃশংসভাবে হত্যা করল।

উপসংহারে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, কাল পূর্ণ হলে কৌশিক ব্রাহ্মণ নরকে গেলেন। কেন এমন হল? ব্রাহ্মণ তো সত্যকেই আঁকড়ে ছিলেন। ব্রাহ্মণ শাস্ত্র জানতেন, কিন্তু শাস্ত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগ জানতেন না।

এবার শ্রীকৃষ্ণ খুব সংক্ষেপে অর্জুনকে ধর্মের স্বরূপ বোঝাচ্ছেন। যা অহিংসাযুক্ত, তাই ধর্ম, যৎ স্যাদহিংসা সংযুক্তং স ধর্ম ইতি নিশ্চয়ঃ। দস্যুদের জিজ্ঞাসার উত্তরে ব্রাহ্মণ মৌন থাকতে পারতেন, কিন্তু মৌন থাকলে আবার দস্যুদের সন্দেহ তৈরি হত। তাই ব্রাহ্মণের সেখানে মিথ্যা বলাই উচিত ছিল। তাতে নিরীহ লোকগুলি প্রাণে বেঁচে যেতেন। কারণ ধর্মতত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তিরা সে সময় মিথ্যা বলাকে পাপ বলে মনে করেন না।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए