সাগরময় অধিকারী

রবীন্দ্রনাথ মিষ্টি খাবার, বিশেষত পিঠেপুলি খেতে খুব ভালোবাসতেন। শান্তিনিকেতনের এক ভদ্রমহিলার এই সংবাদ জানা ছিল। তিনি একদিন পিঠে তৈরি করে রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে দিলেন। ক’দিন পরে তিনি এসে কবিকে জিজ্ঞেস করলেন, গুরুদেব, সেদিন যে পিঠে পাঠিয়েছিলাম, তা কেমন খেলেন? কবি সহাস্যে বললেন, শুনবে? নেহাত যখন শুনতে চাও, বলি। লোহা কঠিন, পাথর কঠিন,/ আর কঠিন ইষ্টক,/ তার অধিক কঠিন কন্যে,/ তোমার হাতের পিষ্টক!
উপস্থিত সকলে ও পিষ্টক রন্ধনকারিণী উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন।
#
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ছিলেন শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারিক এবং এ কাজে সঞ্চয় করেন বহু অভিজ্ঞতা। ক্রমশ তিনি লেখায় অনুপ্রাণিত হন। রোজই বাড়ি যাওয়ার সময় গ্রন্থাগার থেকে এক বোঝা বই নিয়ে বাড়ি যান রাতে পড়ে দেখার জন্য। একদিন বিকেলে সেরকম বইয়ের বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। দূর থেকে রবীন্দ্রনাথের ডাক শোনা গেল, ওহে বৈবাহিক, শোনো, শোনো। প্রভাতবাবু অবাক। এ কী রহস্য গুরুদেবের! তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে বললেন, আপনি আমায় বৈবাহিক বলছেন কেন?
প্রভাতকুমারের উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ হাসতে হাসতে বললেন, আরে, সে বৈবাহিক নয়, আমি ডাকছি তোমায় বই-বাহিক বলে। এ কথা চারদিকে এমনভাবে রটে গেল যে, তাঁর শ্যালিকা শান্তিময়ী বলেছেন, তখন প্রভাতের নিজের নামের বদলে আমাদের মধ্যে তাঁর নাম প্রচলিত হয়েছিল ‘বৈবাহিক’।
#
রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন, জানো, একবার আমার একটি বিদেশি অর্থাৎ অন্য প্রভিন্সের এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল। সে এক পয়সাওয়ালা লোকের মেয়ে। জমিদার আর কী, বড়ো গোছের। সাত লক্ষ টাকার উত্তরাধিকারিণী সে। আমরা কয়েকজন গেলুম মেয়ে দেখতে। দু’টি অল্পবয়সি মেয়ে এসে বসল। একটি নেহাত সাদাসিধে। জড়ভরতের মতো এক কোণে বসে রইল। আর একটি যেমন সুন্দরী, তেমন চটপটে। চমৎকার তার স্মার্টনেস। একটু জড়তা নেই। বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ। আমি ভাবলুম, এর আর কথা কী? এখন পেলে হয়!
এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। বয়স হয়েছে, কিন্তু শৌখিন লোক। ঢুকেই পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়েদের সঙ্গে। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘হেয়ার ইজ মাই ওয়াইফ’ এবং জড়ভরতটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘হেয়ার ইজ মাই ডটার।’ আমরা আর করব কী! পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ করেই রইলুম।
যাক, এখন মাঝেমধ্যে অনুশোচনা হয়। বিয়েটা হলে এমনই কি মন্দ হত! মেয়ে যেমনই হোক না কেন, সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর জন্য তো এ হাঙ্গামা করতে হত না। তবে শুনেছি, সে মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরেই বিধবা হয়। তাই ভাবি, ভালোই হয়েছে, কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত।
#
বড়দিনের ছুটিতে অতুলপ্রসাদ শিমুলতলায় ক’দিন থেকে দিলীপকুমার রায়কে নিয়ে শান্তিনিকেতনে আসছেন। সকালবেলা অতুলপ্রসাদ কবির কাছে পৌঁছতেই স্নেহের পাত্রটিকে পেয়ে তাঁর সৌম্য সুন্দর মুখমণ্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত হল। অতুলপ্রসাদও আনন্দে উচ্ছ্বল হয়ে কবিকে বললেন, আপনার শরীরটা খুব ফিরেছে দেখছি।
কবি সহাস্যে বললেন, চুপ চুপ! ও কথা বলো না। কালকেই এক ভদ্রলোকের আবির্ভাব হয়েছে। তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী সভায় আমাকে সভাপতি করতে কোমর বেঁধে মরিয়া হয়ে এসেছেন। তাঁকে বহু কষ্টে বিশ্বাস করিয়েছি যে, আমি মরণাপন্ন। আচমকা আমি ভালো আছি জানলে তিনি দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে উঠবেন। যাবেন আমাকে টেনে নিয়ে। তখন তাঁর স্ত্রীর জন্য প্রকাশ্য সভায় চোখের জল না ফেলে আমার আর উপায় থাকবে না।
অতুলপ্রসাদ হেসে বললেন, আপনি যে মরণাপন্ন, তাঁকে বিশ্বাস করালেন কী করে ?
কবি সকৌতুকে হেসে বললেন, জানা চাই হে, জানা চাই। আটঘাট বেঁধেছি কি কম! পাছে ফসকে যায়, এই ভয়ে ওঁকে ঘটা করে বুঝিয়েছি যে, এরূপ ক্ষেত্রে যিনি পতি, তাঁরই সভাপতি হওয়া উচিত।
#
রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তখন প্রতি সপ্তাহেই আর্ট ও সাহিত্যের আসর ‘বিচিত্রা’র অধিবেশন হত। কলকাতার নামকরা সাহিত্যিক ও শিল্পীরা প্রায় সকলেই এই আসরে আসতেন। ঘরের মেঝেয় ঢালা ফরাসের উপর সভা বসত। তাই সকলেই ঘরের বাইরে জুতো খুলে ফরাসে এসে বসতেন। সভা ভঙ্গের পরই খবর পাওয়া যেত, কারও না কারও জুতো হারিয়েছে। সকলেই জুতো সমস্যায় পড়লেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তো ছেঁড়া জুতো পায়ে দিয়ে আসতে আরম্ভ করলেন।
একবার ‘বিচিত্রা’র এক বিশেষ অধিবেশনে শরৎচন্দ্রও এসেছেন। তিনি এসেই কয়েকজনের মুখে সভায় জুতো চুরির কাহিনি শুনলেন। তিনি সেদিন তাঁর শখের নতুন জুতো জোড়াটি পায়ে দিয়ে এসেছেন। তাই জুতো চুরির কথা শুনে তিনি বারন্দার একদিকে গিয়ে তাঁর কাছে যে খবরের কাগজটা ছিল, তা দিয়ে জুতো জোড়াটি মুড়লেন। তারপর মোড়কটি হাতে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সামনে এসে বসলেন।
শরৎচন্দ্রের হাতে কাগজের মোড়কের মধ্যে তাঁর যে জুতো আছে, সে বিষয়টি সত্যেন দত্ত দূর থেকে দেখে গোপনে রবীন্দ্রনাথকে বলে দেন। এ কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ সভায় বসে এক সময় শরৎচন্দ্রের হাতের মোড়কটির প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, শরৎ, ওটা কী?
শরৎচন্দ্র একটু ইতস্তত করে বললেন, আজ্ঞে, আছে একটা জিনিস। রবীন্দ্রনাথ ফের প্রশ্ন করলেন, কী জিনিস শরৎ? বইটই নাকি? শরৎচন্দ্র মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, আজ্ঞে।
রবীন্দ্রনাথ সকৌতুকে বললেন, কী বই শরৎ, পাদুকাপুরাণ বুঝি?
রবীন্দ্রনাথের কথা শুনে শরৎচন্দ্র তো অবাক। অন্য সকলে কিন্তু হো-হো করে তখন হাসছেন।
