সুদীপনারায়ণ ঘোষ
অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব কর্মসংস্থানকে ভয়ানক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। কম, মাঝারি বা বেশি যে কোনও দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর ওপরই এর ভারী প্রভাব পড়বে। দ্রুততর গতিতে এআইয়ের উত্থান চাকরির ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। এই উত্থান বিশ্বের অর্থনীতিকে বড়সড় ধাক্কা দেবে, বিপ্লব ঘটাবে। এই পরিবর্তনের আঁচ থেকে ভারতও রেহাই পাবে না।
চাকরির ওপর এআইয়ের অভিঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ কথা উল্লেখ করে ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তির এই উল্লম্ফন প্রবৃদ্ধিকে বিঘ্নিত করার ব্যাপক ক্ষমতা রাখে। সে কারণে এই বিঘ্ন দূর করতে কেন্দ্র, রাজ্য ও কর্পোরেট সংস্থাগুলির সমন্বিত প্রয়াস দরকার। এটা আসন্ন বছর, এমনকী দশকগুলিতেও ভারতের প্রবৃদ্ধিকে মসৃণ ও অব্যাহত রাখার পথে অনেক বাধা ও বিঘ্ন তৈরি করবে। চাকরিকে সুরক্ষিত করতে খুব সত্বর আমাদের এই অগ্রগতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া দরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেশকিছু ক্ষেত্রে যখন এআই শিকড় গাড়ছেই, তখন চাকরির বাজারকেও খাপ খাওয়াতে হবে। কারণ প্রযুক্তিকে ঠিকভাবে পরিচালনা করার মধ্যেই সমষ্টিগত কল্যাণের চাবি লুকিয়ে আছে।
এআইয়ের উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। তেমনই কয়েকটি ক্ষেত্রে এটা নিয়োগ সংকুচিত করতে পারে। এআই-যুক্ত ব্যবস্থাপনা আরও যেমন দক্ষ ও কুশলী হতে থাকবে এবং মানুষ এই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হবে, তেমন চাকরির ভবিষ্যৎও নতুন আকার নেবে। নিত্যনৈমিত্তিক কাজ, গ্রাহক পরিষেবাও যার মধ্যে পড়ে, সেখানে অটোমেশন চালু হবে। বেশিরভাগ পরিষেবার কাজ যন্ত্রই করবে। সৃষ্টিমূলক কাজে প্রভূত পরিমাণে এআই যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হবে। যেমন, ছবি ও ভিডিয়ো তৈরির কাজে। এআই শিক্ষক তৈরি হবে, শিক্ষার ধাঁচ বদলাবে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আরও দ্রুতগতিতে ওষুধ আবিষ্কৃত হবে।
অন্য পোস্ট: মোবাইল ফোনের তীব্র আসক্তি ও তার বিভীষিকা রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে (শেষ পর্ব)
সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, ভারতের পরিষেবা ক্ষেত্র, রফতানি এবং বিশেষত বিপিওগুলি (কোনও কোম্পানি তার আংশিক কাজ তৃতীয় কোনও সংস্থাকে দেয়, লাভ, নৈপুণ্য ও বিশেষ ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য) এআই আগমনের ফলে খুব খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে কারণে কোম্পানিগুলির এই বিপর্যয় মোকাবিলায় নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। টেলিকম ক্ষেত্রে যে বিস্ফোরণ দেখা গিয়েছে এবং ইণ্টারনেট সমর্থিত বিপিওর যতটা উত্থান হয়েছে, প্রযুক্তিগত বিবর্তনের পরবর্তী ধাপে তার অনেকেই ঝাঁপ গোটাবে। এই আবহে কর্পোরেট ক্ষেত্রের একটি দায়িত্ব আছে নিজের প্রতি এবং সমাজের প্রতিও। আরও কঠোর চিন্তাভাবনা করতে হবে, কীভাবে কর্মী সংকোচন ঠেকাবে, সে বিষয়ে।
পরিষেবা ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে সমীক্ষা জানিয়েছে, ব্যবসায় ক্রমোন্নতির সুযোগ সীমিত হবে এবং সে কারণে দীর্ঘকালীন অস্তিত্ব ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় এটা। আবার এআই যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই এটা নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করবে।
ভারত এআইয়ের এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। কারণ এখানে কাজ চালানোর খরচ কম এবং এটা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খুব উচ্চমানের এআই, মেশিন শিক্ষণ এবং বিগ ডেটা কর্মীদের কেন্দ্রস্থল। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা এবং তার বিপুল অংশ তরুণ হওয়ায় এর একটি অনন্য সুবিধা আছে, কারণ এআই একইসঙ্গে ঝুঁকি ও সুযোগ দুটোই।
অন্য পোস্ট: রাঁচির সীতা ফলস
এআই প্রযুক্তি ও শিল্পের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে, তাই ইঞ্জিনিয়াররা দ্বিধাগ্রস্ত। এখন আর এ প্রশ্ন ওঠে না যে, এআই তাঁদের কর্মক্ষেত্রকে প্রভাবিত করবে কি না। প্রশ্ন হল, কীভাবে এই নতুন যুগে খাপ খাইয়ে উন্নতি করা যাবে। শিল্পপতিরা বলেছেন যে, বেশকিছু বিশেষ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে হবে এআই চালিত বিশ্বে এগিয়ে থাকতে গেলে। ডান অ্যান্ড ব্র্যাডস্ট্রিটের ভাইস প্রেসিডেন্ট আদিত্য কুলকার্নি বলেছেন, এআই মডেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন শাখার রূপান্তর ঘটিয়ে দিচ্ছে। তাতে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুই-ই আছে। এই নতুন পথে চলতে গেলে নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন ও অনুসন্ধিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নে একটি বহুমুখী পন্থা অবলম্বন করা দরকার। তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, অনলাইন উৎস, মেণ্টরশিপ ও হাতেকলমে অভিজ্ঞতা।
জাপানের এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘এআই যন্ত্রপাতি নিয়ে হাতেকলমে অনুশীলন খুব কাজে আসবে। যদি হাতের কাছে আর কিছু না থাকে, তবে OpenAI-তে যান একটি আলাদা অ্যাকাউণ্ট খুলুন। ChatGPT ব্যবহার করা শুরু করুন এবং শুধু কথা বলুন।’ এই হাতেনাতে কাজ করার ফলে ইঞ্জিনিয়াররা এআইয়ের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে একটি সহজাত ধারণা তৈরি করতে পারবেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘জেনারেটিভ এআইকে উপেক্ষা করা চলবে না। নিজেই এটাকে একটি যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। GenAI-এর আউটপুটকে কাজে লাগাতে হবে এবং এর সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে হবে। শুরু হিসাবে এটা করুন।’

