Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

মোবাইল ফোনের তীব্র আসক্তি ও তার বিভীষিকা রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে (শেষ পর্ব)

Share Links:

স্বপনকুমার মণ্ডল
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

বাইরের চোখ যখন বন্ধ হয়ে আসে, মনের চোখে তখন ফেসবুকে জেগে ওঠে। এভাবে আঙুলের ডগা দিয়ে পৃথিবীর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ার অকল্পনীয় আনন্দ স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপামর জনতার মধ্যে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে  পড়ে। সেখানে মানুষের সঙ্গী হয়ে ওঠে ফেসবুক। তার নিজস্ব ফেস না থাকলেও অন্যের ফেসের ভ্যালু দেয়, বুক না হলেও বুকের মধ্যে জাঁকিয়ে বসে। সবদিক থেকেই তার বিপুল জনপ্রিয়তায় সংবাদমাধ্যমও তাতে জুড়ে গিয়েছে। সেখানে তাৎক্ষণিক প্রভাব বা প্রতিক্রিয়ায় আজ ফেসবুকের দেওয়ালে সবার নজর। সেদিক থেকে বিশ্বায়নের ভুবনগ্রামের নিবিড় হাতছানি আজ ফেসবুকের সংযোগে আরও কাছের মনে হয়। সংবাদপত্রের চেয়েও তার তীব্র গতি, পাঠকের সংখ্যাও তার বিপুল। অন্যদিকে ২৪ ঘণ্টাই তার সচল ঘটনাপ্রবাহে নিজেকে শামিল করার অনন্ত অবকাশ। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অবিরত ও অবারিত অভূতপূর্ব সুযোগে ফেসবুকের নীরবে সরব প্রকৃতি আপনাতেই মুখর। ঘরের দরজা বন্ধ হলেও মনের দরজায় ফেসবুকের সচল হাতছানি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এজন্য একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষে পৃথিবীজুড়ে করোনার সর্বব্যাপী বিপর্যয়ের মধ্যেই তার প্রভাব আরও তীব্রভাবে লক্ষ করা যায়।

২০২০ সালে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে যখন চারদিকে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, মনের জানালায় আলোর অভাব জাঁকিয়ে বসেছিল, তখন ফেসবুকের সদর দরজা আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আমাদের। ফেসবুকে যে অবারিত দ্বার। মনের পৃথিবী ফেসবুকে মিশে গেল। বাইরের দৃষ্টি তখন ফেসবুকের সচল প্রবাহে ভেসে চলেছে।  যার কেউ নেই, তার ভগবান থাকার মতোই ফেসবুকে স্বপ্নবিলাস। কোনও  নিষেধাজ্ঞা নেই কোথাও। আর এখানেই তার ট্র্যাজেডির বীজ ছড়িয়ে পড়েছে।

স্বাধীনতা যখন স্বেচ্ছাচারিতায় মিলিয়ে যায়, তখন তার বিকার ও বিকৃতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে নিজেকে মেলে ধরার, তুলে ধরার, খুলে বলার নিবিড় হাতছানিই শুধু অস্থিরতা তৈরি করে বিষম প্রতিযোগিতাকে বয়ে আনে না, সেই তীব্র বিষম প্রতিযোগিতায় হারিয়ে যাওয়ার অবকাশও রচনা করে। ফেসবুকের খুল্লামখুল্লা প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচার, আত্মপ্রচার, অপপ্রচার, বিচারের নামে অবিচার, কুৎসা-নিন্দা প্রভৃতির আচার পেয়ে বসে। শুধু তাই নয়, দেখনদারির ঠেলায় দেখাদেখির খেলা জমে যায়। ফেসবুক হয়ে ওঠে ফেকবুক, আত্মপ্রকাশ হয়ে যায় আত্মবিকার। কারও কাছে তা ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’, আবার কারও কাছে ‘ফিয়ার অ্যান্ড ফায়ার’। লাইকের অভ্যাসে মৃতের প্রতি শোকের পরিবর্তে তার মৃত্যুতেই লাইক পড়ে, দুঃসংবাদেও লাইকের ছড়াছড়ি। ফেক নিউজের ঠেলায় প্রতারণার শিকার হওয়া তার দৈনন্দিন ঘটনা। সহজ বন্ধুত্বের সুযোগে যেমন বহু সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তেমনই গড়ে তোলা সম্পর্কও বাস্তবের মাটিতে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আত্মবিজ্ঞাপনে আসল-নকল চেনাই দায় সেখানে। ফলে সন্দেহ থেকে অবিশ্বাস, অবিশ্বাস থেকে মনের বিকার স্বাভাবিক হয়ে আসে।

অন্য পোস্ট: যাত্রাপালায় বাড়ছে আস্থা ও ভরসা (পর্ব ১)

অন্যদিকে ইচ্ছামতো প্রকাশ করার সুযোগে দুর্যোগ নেমে আসে।  অতৃপ্ত মনের কামনা-বাসনা আর লালসার আবর্জনার স্তূপে মনের মন্দিরটি আপনাতেই ঢাকা পড়ে যায়।  প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাবে গরমিল তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে। চাহিদার চাপে ফেসবুকেও যন্ত্রণার আর্ত চীৎকার শোনা যায়। সেক্ষেত্রে তার মধ্যে অতৃপ্ত মনের পূতিগন্ধময় ডাস্টবিনের দুর্গন্ধ তাই অস্বাভাবিক মনে হয় না। সেখানেই শেষ নয়, যা মনে হয়েছিল স্বপ্নপূরণের হাতছানি, তাই অচিরেই দুঃস্বপ্নের পারানি হয়ে ওঠে।
ফেসবুকের রঙিন আলোয় মুখ দেখাতে এসে মুখ লুকোনোর আতঙ্ক মনে চেপে বসে। সেখানে যে পরতে পরতে হারিয়ে যাওয়ার ভয় তাড়া করে। নিজেকে দেখানোর সুযোগ যেমন তার অবাধ, তেমন তা না দেখে উদাসীন থাকাও অন্যের ইচ্ছাধীন। সেক্ষেত্রে উপেক্ষার নিষ্ঠুরতা সবচেয়ে বেশি কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে স্বজনের উদাসীন উপেক্ষা হীনমন্যতার জন্ম দেয়। সেখানে পরিচিতজনের লাইক না পাওয়াও মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, তার চেয়েও ভয়ংকর হারিয়ে যাওয়ার ভয়। আসলে প্রত্যেকের দেখনদারির মধ্যে থাকে নিজের সাফল্য প্রদর্শনের অহেতুক বাতিক, অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্বে আত্মজাহিরের রকমফের। সেগুলি প্রতিনিয়ত অন্যের সাফল্যের, উৎকর্ষের ও উত্তরণের ভিড় দেখার ফলে মনের মধ্যে ব্যর্থতায় হীনমন্যতাই শুধু জেগে ওঠে না, ভয়ংকর বিভীষিকা আপনাতেই ভর কর। হারিয়ে যাওয়ার ভয় নিত্য তাড়া করে ফেরে। ইংরেজি একটি শব্দও তৈরি হয়েছে, FOMO (FEAR OF THE MISSING OUT) । সেই ফোমোও ফেসবুকে সব সময় ওঁৎ পেতে বসে থাক। নিজের ব্যর্থতাই শুধু নয়, নিজের কিছুমাত্র সাফল্যও অন্যদের সাফল্যের উত্তরণের কাছে হেয় বা তুচ্ছ মনে হয়। আর ব্যর্থতার পরিমাণ যতই বেড়ে চলে, ততই তার শূন্যতাবোধ মনের মধ্যে এঁটে বসে। সেক্ষেত্রে ফেসবুকের মুক্ত হাসি অচিরেই বোবা কান্নায় পরিণত হয়।
ফেসবুকের তীব্র প্রভাবের মধ্যে আলো-অন্ধকারের খেলায় দিগভ্রান্ত সমাজের দিকে তাকালেই সেলফোনের উত্তরোত্তর দুর্বার আকর্ষণের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার নিত্যনতুন চাহিদা ও জোগানে যেভাবে তা প্রযোজন থেকে প্রিয়জন হয়ে উঠেছে, তাতে তার মোহাচ্ছন্নতা অনিবার্য ও অনস্বীকার্য। সেদিক থেকে মোবাইল ফোনের আচ্ছন্নতা নিয়ে স্বয়ং আবিষ্কারকের খেদ ব্যক্ত হলেও তা কোনওভাবেই তাঁর কাছে  ফ্রাঙ্কেস্টাইনের মতো আত্মঘাতী আবিষ্কার মনে হয়নি। কেননা নিত্যনতুন চাহিদাপূরণে মোবাইল ফোনের আকর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক মনে হয়েছে মার্টিন কুপারের। একসময় টিভিরও বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। অচিরেই তা কেটে যায়। নতুনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ গড়ে ওঠে, তা সাময়িক মোহাচ্ছন্নও করে রাখে। আবার বিকল্পের আকর্ষণ বেড়ে গেলে অচিরেই সেই মোহও কেটে যায়। সেক্ষেত্রে তাঁর বিশ্বাস, মোবাইল ফোনের মোহও একসময় চলে যাবে।

অন্যদিকে মোবাইল ফোনের অসীম সম্ভাবনায় বিশ্বাসী মার্টিন কুপার তার মাধ্যমে রোগের নিরাময় থেকে কল্যাণকামী বহু কাজে ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মোবাইল ফোনের প্রতি তীব্র আসক্তিতে তিনি বিচলিতবোধ করলেও তা নিয়ে তাঁর মনে কোনওরকম দুশ্চিন্তা নেই। কেননা সময়েই মোবাইল ফোনের মোহ কেটে যাবে বলে তাঁর ধারণা। কিন্তু তাতে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি কমলেও তার আত্মিক ক্ষতি ও ক্ষত সারিয়ে তোলা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। টিভির জনপ্রিয়তায় ব্যক্তিগত যোগ ছিল দর্শকের বিনোদনী মোহজাত, আর মোবাইল ফোনের সংযোগ একেবারেই ব্যক্তির মন ও মননে, কল্পনা ও স্বপ্নে। প্রাণের অস্তিত্ব জুড়ে। সেখানে সময়ান্তরে সবকিছুর অতি ব্যবহারের একঘেয়েমি ও বিকল্পের হাতছানিতে মোহ কেটে গেলেও তার মানসিক প্রভাব নীরবে নিভৃতে ছায়ার মতো লেগে থাকে। তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শুধু দুরূহ নয়, সাধনাসাপেক্ষও। ফেসবুকের আলোর অন্ধকারের মতো তার হারিয়ে যাওয়ার ভয় মোবাইল ফোন বন্ধ হলেও মনে যে জেগে থাকে অবিরত, নিরন্তর!

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए