শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

মানুষের বিনোদনের প্রয়োজনে আদিকাল থেকে পথ চলা শুরু হয়েছে যাত্রাপালার। মানুষের অনুভূতি আত্মিকভাবে অভিব্যক্ত হয়ে শুরু হয়েছে কাহিনি লেখা। কাহিনিতে উঠে এসেছে ঘটনা। ঘটনার নাটকীয় রূপ বঙ্গের আদি যাত্রাপালা। ঠিক কখন যাত্রাপালা শুরু হয়, তা নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা যাত্রাপালা বিষয়ক ছাত্র-গবেষক, তাঁদের উচিত ঠিক কখন যাত্রাপালার সূচনা, তা নিয়ে সঠিক তথ্য তুলে আনা।
প্রচলিত তথ্যটি হল, পঞ্চদশ শতকে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব যাত্রাপালার প্রচলন করেন। এই তথ্য নির্ভুল তা নয়। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০-২০০ অব্দে অভিনয় হত, এমন তথ্য রয়েছে। প্রখ্যাত নাট্যবিজ্ঞানী কিথ সাহেব লিখেছেন, ‘সংস্কৃত নাটকের সূত্রপাত হয়েছিল কৃষ্ণলীলা অবলম্বন করে।’ সে সময় মাটিতেই অভিনয় হত। যাত্রা নামটি তখন ছিল না। সবাই নাটক বলত। যিনি পালা লিখতেন, তাঁকে নাট্যকার বলা হত। আদিতে যাত্রাপালা ছিল গাননির্ভর। গান গেয়ে অভিনয় করতে হত। যাত্রাপালা সেদিন ছিল পালাগান।
আজও বঙ্গে যাত্রাপালাকে গ্রামীণ মানুষজন পালাগান বলে থাকে। যাত্রাপালার মঞ্চ আর নাটকের মঞ্চের মধ্যে আকাশ-জমিন পার্থক্য। যাত্রাপালা আর নাটকের অভিনয় রীতিতেও আকাশ-জমিন ফারাক। যাত্রাপালার রূপসজ্জা নাটকের রূপসজ্জার চেয়ে অনেক বেশি চড়া রঙের হয়। নাটকের মঞ্চের জায়গা অনেক প্রশস্ত হয়। নাটকের মঞ্চে দৃশ্যসজ্জা রাখতে হয়। নাটকের অভিনয়ে ধীর-স্থির স্বাভাবিক কণ্ঠ প্রয়োগ করতে হয়। যাত্রাপালা ঠিক তার উলটো। মঞ্চের আয়তনে একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। মঞ্চে কোনও দৃশ্যসজ্জা থাকে না। মঞ্চের উপর শুধু একটি রস্টার্ম থাকে। আর থাকে নাটকের মতো লাইট ও মাইক।
আন্য পোস্ট: সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (পর্ব ১)
আজও গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের মাধ্যম যাত্রাপালা। সাতের দশক অবধি গ্রামীণ মানুষের একমাত্র বড় বিনোদন ছিল যাত্রাপালা। বর্তমানে ঘরে ঘরে টিভি, হাতে হাতে মোবাইল ফোন থাকায় যাত্রাপালা গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম না হলেও অন্যতম অবশ্যই।
নাটক আজকাল গ্রামগঞ্জেও হচ্ছে। কিন্তু এককালে তা কল্পনাও করা যেত না। নাটকের দল গ্রামে যেত না। যাত্রাপালা গ্রামে যেত। ব্রিটিশ বা নবাব-রাজাদের আমলে গ্রমীণ মানুষ আজকের মতো শিক্ষিত ছিল না। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণনির্ভর ধর্মীয় যাত্রাপালা দেখে কাহিনি জেনে ফেলতেন। সাতের দশকের আগে সামাজিক যাত্রাপালার চল ছিল না। রাতেরবেলায় মশাল, হ্যাজাক প্রভৃতির আলোয় ঝলমল করত, এমন পোশাকের অভিনেতাদের অভিনয় দেখতেই সবাই পছন্দ করত।
ছয়ের দশকের শেষে ও সাতের দশকের প্রথমে নির্মল মুখোপাধ্যায়, ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, কানাই নাথরা ঝুঁকি নিয়ে সামাজিক যাত্রাপালা লিখতে শুরু করেন। পরিবারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ভাঙাগড়া, হাসি-কান্না, বিদ্রোহ, বঞ্চনা, প্রতিবাদ উঠে আসে ওই সমস্ত সামাজিক যাত্রাপালায়। সমাজ-সংসারের ঘটমান ঘটনা নিয়ে সাধারণ পোশাকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়। বর্তমান সময় রাজারাজড়াদের নিয়ে উপাখ্যান ও চাকচিক্য পোশাকের চেয়ে ঢের বেশি জনপ্রিয় হয়েছে সাদামাটা পোশাকের সামাজিক যাত্রাপালা। নাট্যাচার্য্য শিশিরকুমার ভাদুড়ি বলেছিলেন, ‘আমাদের জাতীয় নাট্য বলিয়া যদি কিছু থাকে, তাহাই যাত্রা।’

Nice
gangadharmaji12345@gmail.com