ভাস্কর সেনগুপ্ত

আজকাল ধর্ম ধর্ম বলে অনেক কথাই সমাজে চলে। প্রকৃত ধর্ম কাকে বলে, অনেকেরই সে জ্ঞান নেই বললেই চলে।
ধর্ম কী? যা ধারণ (রক্ষা) করে, তাকেই ধর্ম বলে।যার দ্বারা বস্তুমাত্রই নিজ স্বরূপে অবস্থিত হয়, তাকেই সেই বস্তুর ধর্ম বলে। যেমন, জলের ধর্ম তারল্য, শৈত্য, স্বচ্ছতা ইত্যাদি। অগ্নির ধর্ম দহন, উত্তাপ, আলোক।যার দ্বারা মনুষ্য নিজ স্বরূপে অবস্থিত হয়, মানুষ মনুষ্য জীবনকে সার্থক করতে পারে, ভগবৎ প্রাপ্তি হয়, তাকেই মানুষের ধর্ম অর্থাৎ ধর্ম বলে।
মানুষ কী? অন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ কী? মানুষ মনুষ্য জীবন পেয়েছে কেন? মানুষ কোথা থেকে এল, কোথায় যাবে, কেন যাবে, চিরকাল থাকে না কেন, আসা-যাওয়া করে কেন ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর দিলে তবে তাকে ধর্ম বলে। শুধু ধর্ম নাম নিয়ে কতকগুলি অনুষ্ঠান করলেই ধর্ম হয় না।
ধর্মে কী কী থাকা চাই? সংসার কী? সংসার বলে কেন? উৎপত্তির কারণ কী? ঈশ্বর কী? ঈশ্বরের উপাসনা কেন করতে হয়? ভক্তি কী? জ্ঞান কী? বৈরাগ্য কী? জীব কী? জীব ও জন্তুর প্রভেদ কী? সঞ্চিত কর্মফল ও প্রারব্ধ কর্মফল কী? জন্ম-মৃত্যুর কারণ কী? মোক্ষ কী? মোক্ষের উপায় কী? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিলে তাকে ধর্ম বলে না।
অন্য পোস্ট: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বামী বিবেকানন্দ
সত্যই ভগবান। সত্য নির্ণয় করা সর্বাপেক্ষা প্রথম কর্তব্য। সত্য নির্ণয় ছাড়া ধর্ম হতেই পারে না। সত্য বিচ্যুত ধর্ম সোনার পাথর বাটির মতো। সত্যের কখনও পরিবর্তন হয় না। তা ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমানে একইরকম থাকে। যা সকল অবস্থায় এক, তাকেই সত্য বলে। যেগুলি দু’দিনের জন্য সত্য, তাকে তৎকালীন সত্য বলে। শৈশব, ছাত্র, যৌবন, বৃদ্ধকালে সবাই কিছুদিনের জন্য সত্য। যেগুলি নিতান্ত প্রয়োজন, সেগুলির পরিবর্তন হয় না। যেগুলি বাহ্যিক সম্পর্ক, সেগুলির পরিবর্তন হয়। কালবশে সত্যের পরিবর্তন হয় না, যুগধর্মের পরিবর্তন হয়।
সনাতন সত্যকে জানার চারটি উপায় আছে। আপ্তদেশ, প্রত্যক্ষ, অনুমান ও যুক্তি। একমাত্র আপ্তবাক্যই সত্য। যার সত্য ছাড়া কিছু নেই, তার কাছেই সত্য প্রতিভাত হয়। জগৎ সত্যে প্রতিষ্ঠিত। জগৎ ধ্বংস হয়ে গেলেও বস্তু নিজের ধর্ম ত্যাগ করে না। কতকগুলো বস্তু অস্বাভাবিক ধর্ম পালন করে।
জগতে ভগবত ব্যতিরেকে কিছুই নেই। যেদিকেই দেখা যাক, সবই ভগবানের মূর্তি। মাটির পুতুল যেমন মাটি ভিন্ন কিছু নয়, স্বর্ণালংকার যেমন স্বর্ণ ভিন্ন কিছু নয়, এই জগৎও তেমন ভগবান ভিন্ন কিছু নয়। জগৎ নানা ভাবে প্রতীয়মান হলেও একই ভগবানের বিভিন্ন রূপ। এটি মায়ার প্রভাব।
একই কালে, একই স্থানে, একই পাত্রে বিপরীত ধর্মের অবস্থানকেই মায়া বলে। শাস্ত্রের এই বিধান বিজ্ঞান বিভিন্ন সূত্র দিয়ে গ্রহণ করেছে। Atomic structure, Particle Physics, Theory of indeterminate, এসবই মায়ার কথা বলে।
অন্য পোস্ট: আর জি কর কাণ্ড ও নারী আন্দোলন
চোখ যেমন নিজেকে ছাড়া সব দেখতে পায়, মানুষ ঠিক তেমনই নিজেকে বুঝতে পারে না। মায়া থেকে মোহ, মোহ থেকে অজ্ঞান ও অহংকার হয়। আমি কর্তা, এই জ্ঞান হয়।’অহংকার বিমূঢ়াত্মা কর্ত্তাহমিতি মন্যতে।’ ভগবান জীবের দেহ সৃষ্টি করেন। জীব সেই দেহকে নিজের বলে ভাবে। জীবদেহে আবদ্ধ হয়ে সংসারে ঘুরতে থাকে। অহংকার নাশ হলে দেহ অভিমান নাশ হয়। দেহ অভিমান নাশ হলে সংসার বন্ধন ঘুচে যায়। মোক্ষ হয়। সংসার থেকে মুক্তি পাওয়ার তিনটি উপায় আছে— সঙ্গ, জ্ঞান ও আচরণ। সঙ্গ সর্বাপেক্ষা প্রবল। সৎসঙ্গ মানুষকে মুক্তি দিতে সক্ষম।
সনাতন ধর্ম কারও মতবাদ নয়। মানুষকে মানুষ বানানোর উপায়। নিউটন আবিষ্কার করার আগেও আপেল গাছ থেকে মাটিতে পড়ত। এখনও পড়ে। ধর্ম ঠিক তেমনই, কারও মতবাদবদ্ধ নয়। সৃষ্টির পূর্বে ছিল, এখনও আছে, প্রলয়ের পরেও থাকবে। এটি মানুষ তৈরির প্রাকৃতিক নিয়ম। তাই সনাতন ধর্ম কখনও অন্য ধর্মের বিরোধিতা করে না। সনাতন ধর্মের ইতিহাসে অন্য জাতির ভূমি বা সম্পদ দখলের নজির নেই। কাউকে বধদণ্ড দেয়নি বিধর্মী হওয়ার কারণে। তাই সনাতন ধর্ম চিরকাল থাকবে। রামকৃষ্ণ দেব এ কথা বলেছিলেন। চিকাগো ধর্মসভায় বিবেকানন্দ এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
অনেকেই বলেন, সমস্ত ধর্মের এক একজন প্রবর্তক আছেন, সনাতন ধর্মে তেমন কেউ দেখাতে পারবেন না। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠবে, বিজ্ঞানের প্রবর্তক কে? কাউকে নির্দিষ্ট করা যাবে না। কারণ বহু বিজ্ঞানীর আবিষ্কার বিধৃত আছে। সনাতন ধর্ম সেই বিজ্ঞান। এখানে বহু ঋষি তাঁদের আবিষ্কৃত সত্যকে প্রকাশ করেছেন।
সনাতন ধর্ম বলে, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। সনাতন ধর্মই বলে, একং ‘সদ্বিপ্রা বহুদা বদন্তি’। ভগবান একই। সনাতন ধর্ম বলে, ‘রুচীনাং বৈচিত্র্যাদৃজুকুটিলনানাপথযুষাং।/ নৃণামেকো গম্যস্ত্বমসি পয়সামর্ণব ইব।।’ মানুষের যেমন রুচি বিভিন্ন হয়, নদী যেমন বিভিন্ন পথে ঘুরে সমুদ্রের মেশে, সেরকম সব ধর্ম একই ভগবানে মেশে।
একমাত্র ভারতই পৃথিবীর সব ধর্মকে আশ্রয় দিয়েছে। ভারত বিরোধে বিশ্বাসী নয়, সকলের বৃদ্ধিতে বিশ্বাসী।
