Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

স্বাধীনতা বহু দেশবাসীকেই স্বদেশে পরবাসী করেছে

ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের অনেক মানুষের মনে স্বাধীনতা দিবসেই পরাধীনতার আত্মগ্লানি জেগে ওঠে। সেদিন থেকেই তাদের স্বদেশে পরবাসী হওয়ার দিন, ছিন্নমূল হয়ে স্বদেশ খুঁজে চলার অবিরাম পথ চলার সূচনা, স্বদেশকে বুকে আগলে অস্তিত্ব সংকটের দুঃস্বপ্ন তাড়িত আতঙ্কিত জীবনের কালরাত্রি শুরু। কারও স্বাধীনতাই কারও পরাধীনতা, কারও নিরন্তর দেশ খুঁজে চলা।

ভারত ভাগের পর ট্রেনে উদ্বাস্তুদের ভিড়।

Share Links:

স্বপনকুমার মণ্ডল
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে দেশের স্বাধীনতা লাভের কথায় আবেগমথিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘যখন বিশ্ব ঘুমিয়ে, তখন ভারত জীবন ও স্বাধীনতায় জেগে উঠবে।’ এই জেগে ওঠার মূলে যে মুক্তির আনন্দ ও স্বাধীনতার স্বাদ, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু যা সেদিন অনুমান করা যায়নি, তা হল, সেই দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতায় বহু মানুষ পরাধীনতাবোধে স্বদেশে পরবাসী হয়ে বিনিদ্রায় জেগেছিল। দেশের পূর্ব-পশ্চিম সীমান্তে বিচ্ছিন্ন দেশান্তরে বহু মানুষের উদ্বাস্তু জীবনে দেশ খুঁজে চলা আজও শেষ হয়নি। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার ২৪ বছর পর ১৯৭১-এ ফের শরণার্থীর ঢেউ আছড়ে পড়ে। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হলেও দেশের সকলের কাছে তা স্বাধীনতা হয়ে ওঠেনি, বরং বহু মানুষের পরাধীনতাকে সুনিশ্চিত করে তোলে। ফের স্বদেশে পরবাসী হওয়া, ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবনে শরণার্থীর দেশ খুঁজে চলা, অন্তহীন পথচলা। অথচ দেশ মানে তো শুধু সাকিন ঠিকানা নয়, মানুষের অস্তিত্বের আধার, প্রকাশের মুক্ত আকাশ, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মুক্ত জীবনানন্দ। তার ভূমিষ্ঠ হয়ে বেড়ে ওঠা, গড়ে তোলা জীবনের শৈশব-বাল্য-কৈশোরের আনন্দ নিকেতন, যৌবনের স্বপ্নরঙিন হাতছানি, প্রৌঢ়ের মান্যতা, বৃদ্ধের অভিভাবকত্ব, প্রবৃদ্ধের শ্রদ্ধাবোধ— সবই তাতে মজুত থাকে। এজন্য দেশ ভাগে মানুষ ভাগ হয়, তার মনেও ভাগের রং এসে পড়ে, কিন্তু মানুষ কখনওই দেশত্যাগ করতে পারে না। তার মনে দেশই যে আলো হয়ে রয়ে যায়। যেখানে সে যায়, দেশও তার সঙ্গে চলে।

লীলা মজুমদার তাঁর ‘ডোরাকের গল্প’-তে যথার্থই লিখেছেন, ‘বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, কিন্তু জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না।’ মানুষের মনেই যে তার দেশের বাস। অথচ দেশভাগের শিকার হয়ে স্বদেশে পরবাসীর মনের স্বদেশের নামটি উচ্চারণের ভয়ই তাকে গ্রাস করে। সেই দেশের স্মৃতিকে বিস্মৃতিতে রেখেই তাকে নতুন করে দেশের পরিচয় লাভ করতে হয়। অতীতকে ভুলে বর্তমানের স্বস্তিবোধে বিস্মৃতিতে শান্তিলাভের আশায় স্বদেশ ক্রমশ বিদেশ হয়ে ওঠে, পরদেশ আপনার মনে হয়। অথচ তার পরেও জীবনের ট্র্যাজিক পরিণতি একান্তে ভেসে ওঠে, সংবেদী মানুষের লেখনীতে উঠে আসে, নাটক-সিনেমায় প্রকাশিত হয়। সেদিক থেকে আধুনিক বিশ্বে দেশের স্বাধীনতা লাভের উচ্ছ্বাস যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তার চেয়ে স্বদেশে পরাধীনতার শিকার হয়ে উদ্বাস্তু জীবনে দেশ খুঁজে চলার মর্মান্তিক পরিণতি আরও বেশি ভাবিয়ে তোলে।

অন্য পোস্ট: নারীজাতি আজও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি

আসলে মানুষের মানবিক মুখে উগ্র দেশপ্রেমের নির্মম প্রত্যাখ্যান আমাদের সচকিতও করে না। সেদিক থেকে কারও স্বাধীনতাই কারও পরাধীনতার কারণ, ছিন্নমূল মানুষের দেশ খুঁজে চলার শরিক করে তোলার জন্য দায়ী। সেখানে আধুনিক বিশ্বে দেশের স্বাধীনতার চেয়ে মানুষের স্বাধীনতাই সবচেয়ে ভাবিয়ে তুলেছে। স্বাধীনতা যেখানে স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হয়, সেখানে মানুষের মানবিক অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে ওঠে। একুশ শতকেও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ। ২০২১-এর ১৫ আগস্ট ভারত যখন তার স্বাধীনতার গৌরবময় ৭৫ বছর পালনে শামিল হয়েছিল, সেদিনই প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তান তালিবানের অধীনে চলে যায়। শুরু হয় স্বাধীনতার পাশাপাশি পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার মরিয়া প্রয়াস, দেশান্তরি হয়ে বাঁচার আপ্রাণ আহ্বান।

সরকারি তিন লক্ষ সেনা থাকা সত্ত্বেও ৮০ হাজার সেনা নিয়ে তালিবানের পক্ষে কী করে প্রায় বিনাযুদ্ধে কাবুল দখল করা সম্ভব হল, তা নিয়ে চর্চা হচ্ছে। সেখানে আফগানিস্তানের অধিবাসীদের সমর্থন ব্যতীত তা যে সম্ভব হয়নি, তাও অনুমেয়। উঠে এসেছে আফগানিস্তান সরকারের দুর্নীতি বা সেনাদের ঠিকমতো বেতন না পাওয়ার কথা, রাষ্ট্রপতির স্বদেশের প্রতি টানের অভাবের বিষয়। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সে দেশ থেকে সেনা ফিরিয়ে নেওয়া। যেন তালিবানমুক্ত রাখার সব দায় সে দেশেরই। অন্যদিকে পাকিস্তানের সমর্থন, চিনের হাতছানি ও ভারতের অসহায়তাবোধ নিয়ে চর্চার বহুমাত্রিক প্রকাশে গণমাধ্যমও সরব হয়ে ওঠে। সেখানে ভারতীয়দের স্বদেশে ফিরিয়ে আনা বা ভারতে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়াও রয়েছে। তালিবানি শাসনে নারীদের ওপর ভয়ংকর অত্যাচারের কথা ছড়িয়ে পড়ে। এখন তো শিল্পীদের ওপর নির্মম অত্যাচার চলছে। সেক্ষেত্রে যেভাবে তালিবানদের ক্ষমতায়ন নিয়ে চর্চার পরিসর জমে ওঠে, সেভাবে স্বদেশে পরবাসীদের নিয়ে তেমন কোনও উচ্চবাচ্য নেই।

আধুনিক বিশ্বে শক্তিশালী দেশের অভাব নেই, অথচ অমানবিক গোষ্ঠীর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ শক্তির বড্ড অভাব। আসলে ক্ষমতাই যেখানে শেষ কথা, সেখানে অক্ষমদের কথা কে ভাবে! স্বাধীনতা তো পালনের নয়, লালনের, উদযাপনের নয়, যাপনের, মান্যতার নয়, মননের। চেতনাহীনের কাছে গোলামি করে সুখে থাকাও স্বাধীনতা মনে হয়। সেই যাপনের স্বাধীনতাকে আপন করার জন্যই তো মানুষ দেশকে বুকে নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে অচেনা পথে চলতে শুরু করে। সে পথ যত দূরেরই হোক, যত দুর্গমই হয়ে উঠুক, তবু তা হাতছানি দেয় শরণার্থীকে। সেখানে যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার স্বাধীনতা থাকে। সেই স্বদেশে পরবাসী স্বাধীনতাকামীদের কথা যে আধুনিক বিশ্ব এখনও ভেবে উঠতে পারেনি, তা তালিবানদের উত্থানে আরও প্রকট হয়ে ওঠে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণেও সেই ধারা অব্যাহত। সেখানে যুদ্ধ একসময় নীরব হয়ে যায়, কিন্তু তার রেশ থেকে যায় স্বদেশে পরবাসীদের মনে আজীবন।

বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে তার ভয়ংকর পরিণতি। সেখানে যেমন স্বাধীনতার উন্মাদনায় যুদ্ধকে গৌরবান্বিত করা হয়, তেমনই অসংখ্য মানুষকে স্বদেশেই পরাধীন হয়ে জীবনযুদ্ধের সম্মুখীন হতে হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদে যুদ্ধের গৌরব যত সৌরভ ছড়ায়, ততই দেশের ছিন্নমূল শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বিশ্বজুড়ে দেশহারা শরণার্থীদের প্রকট উপস্থিতিই বলে দেয়, যুদ্ধ মানুষকে কত ভয়ংকর জীবনযুদ্ধে শামিল করতে পারে। সেখানে স্বদেশে পরবাসীদের ট্র্যাজিক পরিণতি আরও দুর্বিষহ, আরও মর্মান্তিক। ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের অনেক মানুষের মনে স্বাধীনতা দিবসেই পরাধীনতার আত্মগ্লানি জেগে ওঠে। সেদিন থেকেই তাদের স্বদেশে পরবাসী হওয়ার দিন, ছিন্নমূল হয়ে স্বদেশ খুঁজে চলার অবিরাম পথ চলার সূচনা, স্বদেশকে বুকে আগলে অস্তিত্ব সংকটের দুঃস্বপ্ন তাড়িত আতঙ্কিত জীবনের কালরাত্রি শুরু। কারও স্বাধীনতাই কারও পরাধীনতা, কারও নিরন্তর দেশ খুঁজে চলা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए