মহাশোরগোল প্রতিবেদন: ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথির ঠিক আগের সন্ধ্যায় ২৫ আগস্ট বাঁকুড়া রবীন্দ্রভবনে মঞ্চস্থ হল সমন্বয় চট্টোপাধ্যায় সংকলিত ও নির্দেশিত মহাভারত নির্ভর পৌরাণিক যাত্রাপালা ‘ধর্মযুদ্ধ’।
গ্রামবাংলা-শহর জুড়ে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক যাত্রাপালা। এই মুহূর্তে রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর বাতাবরণ। ঠিক সেই মুহূর্তেই শহরের ‘বাঁকুড়া আটচালা’ নামের এক শৌখিন যাত্রাদল গীতারসে অভিস্নাত করাল উপস্থিত পাঁচ শতাধিক দর্শককে। ফিরিয়ে নিয়ে এলেন হারিয়ে যাওয়া পৌরাণিক যাত্রাপালাকে। সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি রঙিন আলো ঝলমলে যাত্রাপালা মুগ্ধতা দিয়ে বসিয়ে রেখেছিল যাত্রামোদী দর্শকদের। প্রমাণ হল যাত্রাপালা আজও মানুষের হৃদয়ে রয়েছে।
লোকসংস্কৃতির আদি মাটির গন্ধ ছোঁয়া যাত্রাপালা আজও বহু মানুষের স্মৃতিমেদুরতা। পালার তেত্রিশজন কলাকুশলী সবাই বয়সে নবীন এবং এই প্রজন্মের। তাঁদের কণ্ঠে মহাভারতের উচ্চারণ শরীরে কাঁটা দিয়ে ধর্মযুদ্ধ
আলো ও শব্দ আবহে লাল্টু সাউন্ড বেশ ভালো। আলো প্রক্ষেপণ ও প্রয়োগে অনিকেত রায় ছিলেন যথাযথ। সুরপার্টি ছিল অনবদ্য সুন্দর। এজন্যই সুরপার্টি যাত্রাপালার অলংকার ও অহংকার। প্রিয়াঙ্কা নাগ তথা বাসুদেব স্টোরের রূপসজ্জা ও পোশাক ছিল খুবই উজ্জ্বল ও সুন্দর।

যাত্রাপালাটি শুরু হয় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, পুষ্পার্ঘ্য প্রদান এবং প্রদীপ প্রজ্বলন, বেদ-উপনিষদ-চণ্ডী শ্লোক পাঠ দিয়ে ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার পরপর। প্রদীপ প্রজ্বলন করেন বাঁকুড়া রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের অধ্যক্ষ কৃত্তিবাসানন্দ মহারাজ। মন্ত্রোচ্চারণ করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী ড. পাপিয়া অধুর্য্য।
অন্য পোস্ট: আন্দামান বাঙালিদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র
তারপর যাত্রা শুরুর ঘণ্টা পড়তেই শুরু হয়ে যায় যাত্রাপালা। রবীন্দ্রভবনের আলোকসজ্জিত রস্টার্মে তখন আলোর ঝলকানি। শ্রীকৃষ্ণের জীবনদর্শন বিষয়ক পরামর্শ, কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে লড়াই, শকুনির পরামর্শে কৌরবদের অক্ষক্রীড়া, দুর্যোধনের হুংকার, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, সমস্ত নিয়ে অনন্যসুন্দর হয়ে উঠেছিল যাত্রাপালাটি । বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন দীপ্তেন্দু ষন্নিগ্রহী (কৃষ্ণ), সুরজিৎ রায় (শকুনি), সঞ্জীব বটব্যাল (ভীষ্ম), স্বরূপকুমার পাল (যুধিষ্ঠির), পিনাকী গোস্বামী (ভীম), হারাধন ব্রহ্মচারী (অর্জুন), গৌতম মালগোপ (দুর্যোধন), নীলাঞ্জন দাস (দুঃশাসন), নবাব চ্যাটার্জি (সমন্বয়) (কর্ণ), সত্যাভাস ভট্টাচার্য (বিকর্ণ), অতনু পরামাণিক (অভিমন্যু), চন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় (বিপ্রদাস), দেবাশিস পাল (ব্যাসদেব), বিপ্লব বরাট (ধৃতরাষ্ট্র), প্রশান্ত বাঙ্গাল (বিদুর), সারথি চ্যাটার্জি (দ্রোণাচার্য), গিরিজাপ্রসাদ সিংহ (কৃপাচার্য), অনুপ রায় (ধৃষ্টদুম্ন), সৌরভ চক্রবর্তী (শিখণ্ডী), সম্রাট মুখার্জি (অশ্বথামা), সন্তু মুখার্জি (নকুল), শ্রীকান্ত মুখার্জি (সহদেব), অনন্ত লায়েক (উদ্ধব), অনুপ মণ্ডল (দ্বাররক্ষী), সুনীল গিরি (দ্বাররক্ষী), নিতু পাল (নিয়তি), শম্পা চৌধুরী (গান্ধারী), সুমনা মণ্ডল (কুন্তী), শাশ্বতী হালদার সরকার (দ্রৌপদী), তনুশ্রী গরাই (উত্তরা), সুচিস্মিতা চ্যাটার্জি (মেনকা), অনন্যা চক্রবর্তী (উর্বশী), সমাপ্তি মিশ্র (রম্ভা) এবং ঈপ্সিতা চৌধুরী (পুরাঙ্গনা)।
পরিশেষে বলা যায়, শৌখিন যাত্রা বাঁচলে যাত্রাশিল্প পুষ্ট হবে। যাত্রাশিল্প আজও মানুষ সমাজ ও বাংলার বুকে ফল পুষ্পাদির নম্র শাখা। ‘ধর্মযুদ্ধ’ পালাটি তেমনই রবীন্দ্রভবন রঙ্গমঞ্চে ফল-পুষ্পে উত্তম ভাগবতে উন্নীত হয়েছিল। শাবাশ! ধর্মযুদ্ধ। শাবাশ! আটচালার প্রত্যেক কলাকুশলী। সাবাশ! নির্দেশক সমন্বয় চ্যাটার্জি (নবাব)।
