Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ভারতীয় মহিলাদের বিশ্ব জয়

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘কেউ কিছু পাওয়ার উপযুক্ত হলে জগতের কোনও শক্তিই তাকে বঞ্চিত করতে পারে না।’

Share Links:

অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ 

এ বছর একদিনের মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়েছে ভারতে। প্রথম পর্বে দু’টি ম্যাচে হারের পরও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার মহিলা ক্রিকেট দলকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে, তা রূপকথার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।

একটা সময় ছিল, যখন অজয় বসু, পুষ্পেন সরকারের বাংলা ধারাবিবরণী শুনে ভারতীয় ক্রিকেট দলের খবর বাঙালি আত্মস্থ করত। তখন সুনীল মনোহর গাভাসকার, বেঙ্গসরকার, বিষেন সিং বেদি প্রমুখ কিংবদন্তি ক্রিকেটারের যুগ। তারপর তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন কপিলদেব নিখাঞ্জ, মহিন্দর অমরনাথ, কে শ্রীকান্ত-সহ অনেকেই। তারপর আসে ২৫ জুন, ১৯৮৩, লর্ডসের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পরপর দু’বার একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে কপিল দেবের নেতৃত্বে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ভারত। তারপর থেকে যেন ভারতীয় ক্রিকেটের চরিত্রটাই বদলে গেল। ভারতের অলিতে গলিতে নতুন প্রজন্মের ছেলেরা ব্যাট-বল হাতে নেমে পড়লেন। ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলকে পিছিয়ে এগিয়ে গেল ক্রিকেট।

সেই উন্মাদনায় ভারতীয় মেয়েরাও ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পদে পদে তাঁদের বিভিন্ন বাধার সামনে পড়তে হত। মেয়েরা মাঠে নেমে ক্রিকেট খেলবেন, তা আবার হয় নাকি! কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, পুরুষ কিংবা নারী, তাঁরা সমাজের বাঁধন ছিঁড়ে এগিয়ে যেতে চান। ভারতে একসময় পড়াশোনা করার অধিকার ছিল না মেয়েদের। কিন্তু সে বাঁধন ছিন্ন করে কাদম্বিনী ডাক্তার হয়েছিলেন। তাই ঝাঁসীর রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের দেশের মেয়েদের ক’দিনই বা ঘরে আটকে রাখা যায়!

গত ২ নভেম্বরের রাত ছিল ভারতীয় নারীর ক্ষমতায়নের (Women Empowerment), নারীশক্তি প্রকাশের, ১৬ জন ভারতীয় নারীর বিশ্ব জয়ের। নবি মুম্বইয়ের ডি ওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে ইতিহাস গড়েছে ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল। প্রথমবার একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নের মুকুট আজ ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের মাথায়।

১৯৭৩ সালে মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরু হয়েছিল। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল ২০০৫ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৮৯ রানে পরাজিত হয়েছিল এবং ২০১৭ সালের ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ৯ রানে পরাজিত হয়েছিল। আর ২০২৫ সালের ২ নভেম্বরের মাঝরাতে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের নতুন দিগন্তের সূচনা হল।

পরিশ্রমের সঙ্গে ভাগ্য সহায় না হলে জীবনে বড় জায়গা পাওয়া যায় না। এবারের একদিনের মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপে তা দেখা গেল। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের প্রারম্ভিক ব্যাটার প্রতিকা রাওয়াল চোটজনিত কারণে গ্রুপ লিগের পর দল থেকে বাদ হয়ে যান। তিনি ছিলেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের ব্যাটিং স্তম্ভ। তিনি গ্রুপ লিগের ৬টি ম্যাচে ৫১.৩৩ গড়ে ৫০৩ রান করেছেন। তারপর শেষ গ্রুপ ম্যাচে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলার সময় গোড়ালিতে চোট পেয়ে দল থেকে বাদ পড়ে যান। তাঁর বদলে ১৫ জনের স্কোয়াডে আসেন শেফালি ভার্মা। তাই গ্রুপ লিগে খেললেও আইসিসি-র নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে বিশ্বকাপের কোনও পদক দেওয়া যায়নি। তাঁর বদলি খেলোয়াড় শেফালি ভার্মা সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল খেলায় সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের ট্রফি নেওয়ার সময় ক্যাপ্টেন হরমনপ্রীত কৌর ভোলেননি তাঁদের সহ-খেলোয়াড় প্রতিকা রাওয়ালকে। তিনি এবং দলের অন্য খেলোয়াড়রা মিলে হুইল চেয়ারে করে নিয়ে আসেন প্রতিকা রাওয়ালকে। এটা এমন এক দৃশ্য, যা ভারতবাসীর মনে গেঁথে রয়েছে। এটাকেই বলে দলগত সংহতি, যা ক্রিকেটের বাইরে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘কেউ কিছু পাওয়ার উপযুক্ত হলে জগতের কোনও শক্তিই তাকে বঞ্চিত করতে পারে না।’ যিনি বিশ্বকাপ দলেই ছিলেন না, সেই শেফালি ভার্মার হঠাৎ করে সুযোগ এসে যায় চমকপ্রদভাবে। যাকে নির্বাচকরা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন, যাঁর জন্য ৫০ ওভার ক্রিকেটের দরজা বন্ধ ছিল, তাঁকেই ডেকে নেওয়া হয়েছিল প্রতিকা রাওয়ালের পরিবর্ত প্রারম্ভিক ব্যাটার হিসাবে। কোনও গ্রুপ লিগের ম্যাচ না খেলে সরাসরি মাঠে নেমে পড়েছিলেন সেমিফাইনালে। আর সে ম্যাচ ছিল সাতবারের বিশ্বকাপ জেতা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ভরা সেমিফাইনাল ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়া টসে জিতে ব্যাটিং করে ৩৩৮ রানের এক পাহাড়প্রমাণ টার্গেট রাখে ভারতের সামনে। রান পাননি শেফালি ভার্মা। কিন্তু জেমিমা রড্রিগেজের ১২৭ রানের অপরাজিত ইনিংস এবং ক্যাপ্টেন হরমনপ্রীত কৌরের অসাধারণ ব্যাটিং (৮৮ বলে ৮৯ রান) ইতিহাস গড়ে। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জিতে তাঁরা ফাইনালে পৌঁছে যান।

আর ফাইনাল ম্যাচটা ক্রিকেট দেবতা লিখে রেখেছিলেন শেফালি ভার্মার জন্য। তিনি ফাইনাল ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে টসে জিতে দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতকে ব্যাটিং করতে পাঠায়। ভারত ৫০ ওভারে সাত উইকেটে ২৯৮ রানের টার্গেট রাখে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে। আর এই ম্যাচেই জ্বলে ওঠেন শেফালি ভার্মা। তাঁর ৭৮ বলে ৮৭ রানের ইনিংস এবং পরে বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সান লুজ এবং মারিয়াজান কাপকে আউট করে ভারতীয় দলের জয়ের রাস্তা পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। তাই বলাই যায়, যে যোগ্য, সে তার প্রতিভার মূল্য পাবেই।

আর ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের একমাত্র বাঙালি ক্রিকেটারের কথা না বললেই নয়। শিলিগুড়ির মেয়ে রিচা ঘোষ প্রথম বাঙালি ক্রিকেটার, যাঁর মুকুটে ২২ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ জেতার অনন্য সম্মান। কিংবদন্তি ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী বাংলারই মেয়ে। তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেললেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। আর ‘প্রিন্স অব ক্যালকাটা’ সৌরভ গাঙ্গুলি অনেক ট্রফি পেলেও বিশ্বকাপ জেতার ট্রফি নেই।

একসময় ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের কোনও স্পনসর ছিল না বা বলা ভালো, স্পনসর আসত না। তখন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা ছিল ওমেন ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া। ১৯৭৩ সালে ভারতের মহিলা ক্রিকেট পরিচালনার জন্য এই সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহিলা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ছিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া। আর মহিলা ক্রিকেটের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে, যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কমিটি মহিলা ক্রিকেটকে তাদের অধীনে নিয়ে আসে। সব দেশের মহিলা ক্রিকেটকে তাদের মূল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কমিটি (ICC)। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট, ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (BCCI) সঙ্গে মিশে যায় ২০০৬-’০৭  ক্রিকেট বর্ষে। তখন থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটকে।

গত ২ নভেম্বর সারা ভারতের মানুষ যে আগ্রহ নিয়ে মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার দিকে চেয়ে ছিল এবং নবি মুম্বাইয়ের ডি ওয়াই স্টেডিয়ামে দর্শকরা ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের হয়ে চিৎকার করেছেন, তাতে মহিলা ক্রিকেটকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না।

শেষে যাঁর কথা না বললে এই প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ থাকবে, তিনি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের কোচ অমল মজুমদার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১১,০০০-এর বেশি রানের মালিক, আটবার মুম্বইয়ের হয়ে রঞ্জি ট্রফি খেলা এবং অধিনায়ক হিসাবে মুম্বইকে রঞ্জি ট্রফি দেওয়া মানুষটি কোনও দিন পরতে পারেননি ভারতীয় দলের জার্সি। তাঁর সব অপূর্ণতা মুছে দিয়েছেন ১১ জন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए