প্রফেসর (ড.) রাজকুমার মোদক

বিদ্যাসাগর তাঁর সারাটা জীবন মানুষের উপকারে কাটিয়ে দিলেও বিশেষ করে কলকাতার উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যবহারে তিনি ছিলেন ক্ষুব্ধ। আসলে তিনি ছিলেন এতটাই স্বাধীনচেতা যে, তাঁর পাশাপাশি অবস্থানকারী হীনমনা, কপট মানুষদের তির্যক ব্যবহার তাঁকে বরাবরই কষ্ট দিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘এদেশে তিনি তাঁর সহযোগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভোগ করিয়া গিয়াছেন। তিনি সুখী ছিলেন না। নিজের মধ্যে তিনি যে এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন, চারিদিকের জনমণ্ডলীর মধ্যে তাহার আভাস দেখিতে পান নাই।’ কিন্তু তিনি তাঁর মনের শান্তি খুঁজে পেতেন কলকাতা থেকে বহু যোজন দূরে কার্মাটাঁড়ে সাঁওতালদের মধ্যে। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহের পর এটা তাঁদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, কলকাতার বাবু মানেই দিকু বা মিথ্যাবাদী একমাত্র বিদ্যাসাগরকে বাদ দিয়ে। তাঁরা এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, তাঁদের সবজি, মাছ ইত্যাদিও দিকুবাবুদের কাছে বেচতেন না। কার্মাটাঁড়ে এক ব্যক্তি মারফত বিদ্যাসাগর যখন এ খবর পান, তখন তিনি বেশ কিছু পরিবারকে ওই সাঁওতালদের কাছ থেকেই মাছ কিনে পাঠান। সাঁওতালরা ছিলেন বিদ্যাসাগরের কাছে নিষ্পাপ, সরলতা ও সাহসের প্রতীক।
কোনও এক ভূমিলোভী জমিদার যখন হাজার প্রলোভন দেখিয়েও একজন সাঁওতালকেও তাঁর হয়ে হাইকোর্টে সাক্ষী দেওয়াতে পারেননি, তখন বিদ্যাসাগর মন্তব্য করেন, ‘দেখো ইহারা এখনও কেমন সাধাসিধে আছে। সত্যটা কোনওরকমে গোপন রাখিতে পারে না।’
কার্মাটাঁড়ে সাঁওতালদের মধ্যে এটাও প্রচলিত ছিল যে, বাঙালিরা তাঁদের খাটিয়ে মজুরি মেরে দেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর তাঁদের এই বিশ্বাস যে ভুল, তা প্রমাণ করে ছাড়েন। কার্মাটাঁড়ে তাঁর ঘর মেরামত করার জন্য বেশ কয়েকজন লোককে কাজে লাগান। তাঁরা ভয়ে ভয়েই ছিলেন, এই বুঝি তাঁদের টাকা মার যায়! গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো মাঝপথে নামে তুমুল বৃষ্টি। তার ফলে তাঁরা নিজেরাই সে আশা ছেড়ে দেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর প্রত্যেককে দু’আনার বদলে চার আনা দিয়ে তাঁদের ভ্রান্ত বিশ্বাস দূর করেন। বিদ্যাসাগর আস্তে আস্তে তাঁদের এমন আস্থা অর্জন করেন যে, তাঁরা ভাবতেন যে, অন্ততপক্ষে একজন বাঙালি আছেন, যিনি কিনা তাঁদের মতোই।
এ প্রসঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কয়েকটি কথা না লিখলেই নয়। তিনি লখনউ যাওয়ার পথে ব্রেক জার্নি করার জন্য বিদ্যাসাগরের কার্মাটাঁড়ের গৃহে কয়েকদিন ছিলেন। সে সময় তিনি বিদ্যাসাগরকে তাঁর গৃহে দেখতে না পেয়ে গৃহের পিছনের দিকে বাগানে গিয়ে দেখেন যে, বাগানের গেট হাট করে খোলা। বিদ্যাসাগর হন্তদন্ত হয়ে একটি পাথরবাটি নিয়ে আসছেন। তিনি শাস্ত্রীমশাইকে জানান, একজন বাচ্চা ছেলের নাক দিয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের চিকিৎসার জন্য তিনি গিয়েছিলেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষায়, ‘ওরে, খানিকক্ষণ আগে একটা সাঁওতালনি আসিয়াছিল। সে বলিল, আমার ছেলেটার নাক দিয়ে হু-হু করে রক্ত পড়ছে। তুই এসে যদি তাকে বাঁচাস। তাই আমি একটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এই বাটিতে করে নিয়ে গেছলাম। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, এক ডোজ ওষুধে তার রক্ত পড়া বন্ধ হল।’ তিনি যে শুধু তাঁদের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন, তাই নয়, প্রতিবছর কলকাতা থেকে তিনি তাঁদের জন্য উৎসব ও শীতের জন্য কাপড়চোপড়ের পাশাপাশি শুকনো ফলমূলও কিনে নিয়ে যেতেন। বিদ্যাসাগর মাঝেমধ্যেই তাঁর ওই কার্মাটাঁড়ের বাড়িতে তাঁদের নেমন্তন্ন করে খাওয়াতেন। তাঁরাও খাওয়াদাওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বিদ্যাসাগরকে নাচ-গান শোনাতেন। মাঝেমধ্যেই বিদ্যাসাগরকে তাঁরা তাঁদের দেবতা মারাংবুরু মনে করে তাঁর কাছে মোরগ উৎসর্গ করতে চাইলে বিদ্যাসাগর পৈতে দেখিয়ে না করতেন। তখন তাঁরা বিদ্যাসাগরকে মাঝখানে রেখে এমনভাবে নাচ-গান করতেন, যেন তাঁরা তাঁদের দেবতাকে ঘিরে নাচ-গান করছেন। বিদ্যাসাগর অবশ্য তাঁদের সঙ্গে খুনসুটিও করতে ছাড়তেন না।
কার্মাটাঁড়েই কোনও একদিন দুই সাঁওতাল রমণী এসে বিদ্যাসাগরের কাছে শাড়ি চাইলে তিনি তাঁদের শাড়ি নেই বললে তাঁরা জোর করে চাবি কেড়ে নিয়ে আলমারি খুলে সেখানকার অনেক শাড়ি থেকে মাত্র দু’টি শাড়ি নেন। তিনি তাঁদের এরকম সততায় অবাক হয়ে যান। তবে বিদ্যাসাগর একদিন এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে গিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়ে যান। তাঁরা জোর করে চাবি কেড়ে নিয়ে দু’টি শাড়িই নিয়ে যান। কিন্তু ওই দু’জনের মধ্যে একজন বিদ্যাসাগরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন যে, বিদ্যাসাগরকে তিনি বলতে চান, ‘হ্যাঁরে, তুইও কিনা শেষে…।’
অন্য পোস্ট: সুন্দরবনের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র
বিদ্যাসাগর কার্মাটাঁড়ে সাঁওতালদের পঠনপাঠনের জন্য একটি স্কুল চালু করে নিয়মিত বই-খাতা-কাগজ-পেনসিল জোগান দিতেন। তাছাড়া তিনি বেশ কিছু বয়স্ক সাঁওতাল ব্যক্তিকে মাসোহারাও পাঠাতেন। বিদ্যাসাগরের আর একটি কর্ম দেখে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অবাক হয়ে যান। সেপ্টেম্বর মাসে যখন সাঁওতালরা ভাতের বদলে ভুট্টা খেতে বাধ্য হতেন, তখন বিদ্যাসাগর সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাজার থেকে বেশি দাম দিয়ে ভুট্টা কিনতেন। আবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই ভুট্টাই ক্ষুধার্ত সাঁওতালদের মধ্যে বিলি করতেন আর নিজেও তাঁদের সঙ্গে খেতেন। সে দৃশ্য দেখে শাস্ত্রীমশাই এতটাই মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, কার্মাটাঁড় ত্যাগ করার সময় বলেন, ‘আমরা যেন কোনও মহর্ষির আশ্রম হইতে বাহির হইতেছি।’
আসলে বিদ্যাসাগর ও সাঁওতালদের মধ্যেকার সম্পর্ক ছিল অতি পবিত্র। তা বর্ণনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, ‘সরল সত্য প্রিয় সাঁওতালরা যে অংশে মনুষ্যত্বে ভূষিত, সেই অংশে বিদ্যাসাগর তাঁর স্বজাতীয় বাঙালির অপেক্ষা সাঁওতালের সহিত আপনার অন্তরের যথার্থ ঐক্য অনুভব করিতেন।’ বিদ্যাসাগর নিজেও তাঁদের সান্নিধ্যে থাকতে খুব পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, ‘পূর্বে বড় মানুষের সহিত আলাপ হইলে বড় আনন্দ হইত। কিন্তু এখন তাহাদের সহিত আলাপ করিতে প্রবৃত্তি হয় না। সাঁওতালদের সহিত আলাপে আমার প্রীতি। তাহারা গালি দিলেও আমার তৃপ্তি। তাহারা অসভ্য বটে, কিন্তু সরল ও সত্যবাদী।’
শম্ভুচন্দ্র লিখেছেন, ‘তাহাদের কুটিরে যাইলে তাহারা সমাদরপূর্বক বলিত, তুই আসেছিস! তাহাদের কথা অগ্রজর বড় ভালো লাগিত। আমায় তৎকালে বলেন, বড়লোকের বাড়ি যাওয়া অপেক্ষা এ সকল লোকের কুটিরে যাইতে আমার ভালো লাগে। ইহাদের স্বভাব ভালো। ইহারা কখনও মিথ্যা কথা বলে না। ইত্যাদি কারণে এখানে থাকিতে ভালোবাসি।’
১৮৮৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের সঙ্গে কার্মাটাঁড়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলেও তাঁর স্ত্রী দিনময়ীদেবীর মৃত্যুর পর তিনি চন্দ্রনগরের ফরাসডাঙায় বসবাস করলেও মন পড়ে থাকত কলকাতা থেকে অনেক দূরে, ওই সহজ-সরল সাঁওতালদের মধ্যে, যাঁরা তাঁকে কোনওদিন ঠকাননি। কোনও আঘাত দেননি। শুধুই দিয়েছেন ভালোবাসা ও জুগিয়েছেন বাঁচার অক্সিজেন। প্রকৃতপক্ষে বিদ্যাসাগর শহরে বসবাসকারী অগণিত মানুষকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে সাহায্য করার বিনিময়ে যে সামাজিক পটপরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলেন, সেটা না দেখতে পেয়ে বেশ কিছুটা হতাশাগ্রস্তই হয়ে পড়েছিলেন। এই হতাশা অস্তিত্ববাদী দর্শনের জীবনের মানে খুঁজে না পাওয়া থেকে উদ্ভূত, যাকে ইংরেজিতে despair বা anguish বলা যেতে পারে। মেধাবী, সৃজনশীল মানুষ এই হতাশায় জর্জরিত। আর এটা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যই তিনি কার্মাটাঁড়ের সহজ-সরল-নিষ্পাপ আদিবাসী সাঁওতালদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতেন।
অন্য পোস্ট: সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (শেষ পর্ব)
তবে শুধু হতাশা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্যই কার্মাটাঁড়ের সহজ-সরল-নিষ্পাপ আদিবাসী সাঁওতালদের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের একাত্ম হওয়া— এরকম ভাবনা পুরোপুরি গ্রহণ না করাই ভালো। কেননা তাঁর ছিল মানুষের প্রতি, বিশেষত নারীজাতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অগাধ বিশ্বাস। ১৮৬৫ সাল থেকে ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি যখন বর্ধমানে রসিককৃষ্ণ মল্লিকের বাসায় ভাড়া থাকতেন, তখন তাঁর কাছে এক রমণী সাহায্যপ্রার্থী হয়ে দ্বিতীয়বার দেখা করতে এলে তাঁর রাঁধুনি হরকালী চৌধুরী তাঁকে খেদিয়ে দেন। হরকালী চৌধুরী বিদ্যাসাগরের ২৫ বছরের রাঁধুনি থাকায় তিনি ভেবেছিলেন, যে মহিলা এই কয়েকদিন আগেই সাহায্য নিয়ে গিয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই তাঁর মনিবকে ঠকাতে এসেছেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর এ খবর পেয়ে অনতিবিলম্বে আর দ্বিতীয়বার চিন্তার ফুরসত না দিয়ে হরকালীর পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিয়ে বরখাস্ত করেন। কিন্তু তিনি হরকালীর মাসিক পেনশনটা দিতে ভুলে যাননি। এই ঘটনাটি শম্ভুচন্দ্র বিদ্যাসাগর- জীবনচরিত-এ লিপিবদ্ধ করেন এভাবে— ‘কোনও কোনও স্ত্রীলোক বারংবার আসিয়া প্রতারণা করিয়া লইয়া যাইত। এক দিবস উক্ত পাচক হরকালী একটি স্ত্রীলোককে বলেন যে, মাগী, বিদ্যাসাগরকে কি তোরা লেদা আম গাছ পাইয়াছিস। হরকালীর প্রমুখাৎ উক্ত কথা শুনিয়া অগ্রজ মহাশয় হরকালীকে বলেন, তুমি বহুকাল আমার বাটীতে আছ, তোমার বেতন কি আছে বল ফেলিয়া দিই এবং তুমি এই মুহূর্তেই আমার বাটী হইতে বিদায় হও।’
জীবনের শেষদিকে বিদ্যাসাগর যখন চন্দননগরের মেজর কুঠিতে অবস্থান করছেন, তখন তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য ভাঙতে শুরু করেছে। একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী সেখানে বিদ্যাসাগর বাড়িতে আছেন কি না জানতে চাওয়ায় তাঁরই এক নাতি ওই জনৈক সাক্ষাৎপ্রার্থীকে ভাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে এসে বলেন যে, রাতেই তিনি কলকাতা থেকে ফিরেছেন, যা তাঁর নাতির জানার কথা নয়। কিন্তু তাঁর নাতিও দাদুকে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সাক্ষাৎপ্রার্থী বিদায় নিতেই সে দাদুকে বলে, ‘আপনি কেবল নাকে কাঁদেন যে, আর পারি না। লোকের জ্বালায় যাই কোথা?’ এর প্রত্যুত্তরে বিদ্যাসাগর বলেন, ‘আর অমন করে লোক ভাগাসনে। ভাইরে, যতদিন বেঁচে থাকি, যথাসাধ্য পরের জন্য যা পারি, করার চেষ্টা করব।’
আসলে বিদ্যাসাগর এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি শুধু বিলিয়েই গিয়েছেন। সূর্য তার রশ্মি বিকিরণ না করলে আমরা বেঁচে থাকতে পারি না, আবার বাতাস না বইলেও আমরা প্রাণশক্তি পাই না। অতিরিক্ত সূর্যরশ্মির বিকিরণ বা অতিরিক্ত বাতাস বওয়া জীবন-সংকটের কারণ হতে পারে, কিন্তু বিদ্যাসাগরের সবটাই ছিল নিষ্কলঙ্ক।
নারী অধিকারের বীজ বপন এই বাংলাতেই হয়েছিল। আর বিদ্যাসাগরের হাত ধরে সেটি কালক্রমে মহিরুহের আকার ধারণ করে। আর এখানেই যদি নারীর অধিকার নিয়ে তাঁরই জন্মের দু’শো বছর পর মানুষকে পথে নামতে হয়, তাহলে তা কতটা লজ্জাজনক! এর জন্য শুধু সিস্টেমকেই দায়ী করা যায় না। আমরাও দায়ী। তাই অন্ততপক্ষে আমরা বাঙালিরা তাঁকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য আমাদের প্রতিটি কর্মের মাধ্যমে তাঁর স্মরণ, মনন ও নিদিধ্যাসন যদি না করি, তাহলে আমাদের মনুষ্যজীবন বৃথাই হয়ে যায়।
