দোলা দে
রাস্তাঘাটে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ে— কেউ হাঁটার ফাঁকে নাকে আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করছেন। কারও আবার বাসে বসে, সিগন্যালের অপেক্ষায়, এমনকী দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একই অভ্যাস। দৃশ্যটি বিরক্তিকর হলেও আমরা এতই দেখেছি যে, তা নিয়ে আর বিশেষ প্রতিক্রিয়া জন্মায় না।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এটা কি কেবল একটা খারাপ অভ্যাস, নাকি সমাজের গভীরতর সমস্যার লক্ষণ? অনেকের এই আচরণ গড়ে ওঠে ছোটবেলায়। পরিবারে যদি শিষ্টাচার শেখানো না হয়, বড় হওয়ার পরও অভ্যাসটি থেকে যায়। শিক্ষা ও পারিবারিক নিয়ম না থাকলে শিশুরা আচরণটি স্বাভাবিক মনে করে।
আমাদের শহর ও গ্রামীণ পরিবেশে ধুলো একটি স্থায়ী সঙ্গী। নাকে শুষ্কতা বা অ্যালার্জি হলে মানুষ দ্রুত অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করে এবং শরীর তখন আঙুলকেই ‘সবচেয়ে কাছে থাকা যন্ত্র’ হিসাবে ব্যবহার করে।
যে সমাজে পাবলিক প্লেসের প্রতি সম্মান কম, সেখানে ব্যক্তিগত শারীরিক পরিচর্যাও প্রকাশ্যে করাকে ভুল মনে হয় না। ফলে নাকে আঙুল দেওয়া সামাজিকভাবে সহনীয় আচরণে পরিণত হয়।
অনেকে অজান্তেই স্ট্রেস, একঘেয়েমি বা উদ্বেগে নাকে খোঁচায়। এটি একধরনের repetitive self-soothing behavior, যা দীর্ঘদিন ধরে চললে অভ্যাস পোক্ত হয়।
এতে স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও কম নয়। নাকে বারবার আঙুল ঢোকানোর ফলে নাসারন্ধ্রের সূক্ষ্ম আবরণের ক্ষতি হতে পারে, নখের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটাতে পারে, রক্তপাত বা প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে, অন্যের মাঝে জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। ব্যক্তিগত পরিচর্যার এই ছোট কাজটি আসলে জনস্বাস্থ্যের দিক দিয়ে একটি উচ্চঝুঁকির অভ্যাস।
পাবলিক প্লেসে নাকে আঙুল দেওয়া সরাসরি অন্যের সম্মানবোধে আঘাত করে। আমাদের সমাজে শিষ্টাচারবোধ কমে গেলে তা ধীরে ধীরে নোংরা পরিবেশ, বিশৃঙ্খল আচরণ এবং অপরের প্রতি উদাসীনতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
সামাজিক আচরণ বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে ছোট আচরণগুলি নিয়ন্ত্রণহীন, সেখানে বড় নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে পরিবহণ, স্কুল, অফিসে ছোট ছোট বার্তা বা পোস্টার দেওয়া উচিত— পাবলিক প্লেসে ব্যক্তিগত পরিচর্যা নয়। এ ধরনের বার্তা আচরণ পরিবর্তনে কার্যকর। রুমাল সঙ্গে রাখা আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি ছিল। এটি ফিরিয়ে আনলে এ ধরনের আচরণ অনেক কমতে পারে। অ্যালার্জি, সর্দি বা নাকের শুষ্কতা থাকলে চিকিৎসার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। শরীর অসুবিধায় থাকলে আচরণও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শিশুকে শেখাতে হবে, পাবলিক প্লেসে নাকে আঙুল দেওয়া মানে অন্যকে অস্বস্তিতে ফেলা। এ ধরনের ছোট শিষ্টাচারই ভবিষ্যতে বড় সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
নাকে আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করা শুনতে তুচ্ছ আচরণ মনে হলেও এটি আমাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবোধ, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা, সব কিছুর মধ্যেই একধরনের ভাঙনকে স্পষ্ট করে। ছোট ছোট আচরণ বদলানোই সমাজে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।

