Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

জগৎবাসীর কাছে কর্নেল কুরেশির পরিচয় অপারেশন সিঁদুরের মহান সেনাপতি হিসাবে

সোফিয়া কুরেশি।

Share Links:

ড. গৌতম সরকার

সঙ্গিনীরা যখন খেলনাবাটি নিয়ে খেলা করত, মায়েদের ড্রেসিং টেবিল অধিকার করে রূপচর্চায় মশগুল থাকত, স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে এক্কা-দোক্কা, গোল্লাছুটের মজা নিত, তখন মেয়েটি ঠাকুরদার কোল ঘেঁষে বসে যুদ্ধের গল্প শুনত। বাবার কাছে শুনত ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা। আর ঠাকুমার কাছে শুনত রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের নারীবাহিনীতে তাঁর লড়াই করার বর্ণনা। শৈশব থেকেই খেলনা পুতুল, রূপটান, সখীদের সঙ্গে মেয়েলি গল্পগুজব ছিল তাঁর না-পসন্দ। ছোট্ট মেয়েটি স্বপ্ন দেখত সেনাবাহিনীর উর্দি পরে দেশের হয়ে যুদ্ধ করছে, আর দেশমাতা তার বীরত্বে খুশি হয়ে মাথায় আশীর্বাদের হাত রাখছে। স্বপ্ন দেখবে নাই বা কেন! সে যে এক সৈনিক পরিবারের মেয়ে! যে ঠাকুরদা তাকে যুদ্ধের গল্প শোনাতেন, তিনি ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক। মেয়েটির বাবা তাজ মহম্মদ কুরেশি সেনাবাহিনীর ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কর্পে কর্মরত ছিলেন, যিনি ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। পড়াশোনায় মেধাবী মেয়েটি জৈবরসায়নে স্নাতকোত্তর শেষ করে গবেষণা করছিলেন, তবে মনেপ্রাণে সযত্নে লালন করে চলেছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্বপ্ন। তাই সুযোগ পাওয়ার পর দ্বিতীয়বার ভাবেননি। পাশে ছিল পরিবারের মানুষদের আন্তরিক উৎসাহ আর অকুণ্ঠ সহযোগিতা। মেয়েটির নাম কর্নেল সোফিয়া কুরেশি। গত বছরের ৭ মে ঘটে যাওয়া ভারত-পাকিস্তানের মিনিযুদ্ধের প্রেস ব্রিফিংয়ে তাঁকে দেশের মানুষ প্রথমবার দেখে তাঁর সাহস, নিষ্ঠা ও ত্যাগের পরিচয় পেয়ে আবেগ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে গিয়েছে।

সোফিয়া কুরেশি ভাদোদোরায় এক সামরিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৯ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সিগন্যাল কর্পসে অফিসার হিসাবে যোগদান করেন। উত্তর-পূর্ব ভারতে কর্মরত থাকার সময় সেখানে এক ভয়াবহ বন্যা হয়। সেই বিপর্যয়ের সময় উদ্ধার এবং ত্রাণকাজে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত নেতৃত্ব ঊর্ধ্বতন অফিসারদের নজর কাড়ে। তারপর তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। যদিও সেনাবাহিনীতে মহিলা হিসাবে তাঁকে বহু প্রতিকূল পরিস্থিতি, এমনকী আইনি সংঘাতের সম্মুখীন হতে হয়েছে, তবে সাহস, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস তাঁকে কালক্রমে সেনাবাহিনীর একজন বিশিষ্ট অফিসার করে তুলেছে।

২০০৬ সালে জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষা অভিযানের অংশ হিসাবে সোফিয়াকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পোস্টিং দেওয়া হয়। সেখানে তিনি একদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছেন, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন৷ এছাড়া যুদ্ধকালীন বিভিন্ন মানবিক মিশনে তিনি শামিল হন, যার মধ্যে যুদ্ধোন্মত্ত পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো পুণ্যকর্ম ছিল। তারপর আসে ২০১৬ সাল। তাঁর সামরিক জীবনে এক গর্ব ও উত্থানের অধ্যায়। সে বছর শান্তিরক্ষা এবং মাইন ক্লিয়ারিং অ্যাজেন্ডাকে সামনে রেখে বিশ্বের ১৮টি দেশের সামরিক মহড়া এক্সারসাইজ ফোর্স-১৮ প্রোগ্রামে ভারতীয় ৪০ সদস্যের দলকে পরিচালনা করার জন্য সোফিয়া কুরেশিকে নির্বাচন করা হয়েছিল। ওই মহড়ায় তিনিই একমাত্র মহিলা, যিনি কোনও একটি দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

তারপর ২০২০ সালে সামরিক প্রোভোস্ট ইউনিটের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কর্নেল কুরেশি বিদ্রোহ বিরোধী অঞ্চলে মোতায়েন করা মহিলা সামরিক পুলিশের প্রথম ব্যাচকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তবে তামাম জগৎবাসীর কাছে কর্নেল কুরেশির পরিচয় অপারেশন সিঁদুরের মহান সেনাপতি হিসাবে। এই অপারেশনে ভারতীয় সেনাদের উল্লেখযোগ্য অবদান ও সাফল্যের খতিয়ান প্রকাশের জন্য তাঁকে এবং বায়ুসেনার আর এক মহিলা উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংহকে সাংবাদিক সম্মেলনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার পরেই দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে এই দুই নারী, দেশবাসীর চোখের মণি সোফিয়া আর ব্যোমিকা।

সাধারণ মানুষ নিজেদের নিয়েই সব সময় মশগুল থাকে— নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবারের ভালোমন্দ, খুব জোর কাজের জায়গা নিয়ে। দৈনন্দিন ঘুরপাকে ঘুরতে ঘুরতে মনে করে ফেলে নিজেদের সব দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পন্ন করা হয়ে গিয়েছে। আবার কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা অন্যরকম ভাবেন। তাঁরা নিজের কথা না ভেবে সর্বজনীন, আত্ম ছেড়ে সর্বাত্ম, পরিবার ছেড়ে দেশ, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন। সোফিয়া কুরেশি সেরকমই একজন মানুষ। দুই সন্তানের জননী একদিকে মা-ঠাকুমার মতো সংসার সামলেছেন, সন্তানদের বড় করছেন, আবার জলপাই রঙা ইউনিফর্ম গায়ে অবলীলায় শত্রুর মোকাবিলায় নেমে পড়েছেন। পরিবারের চৌহদ্দি থেকে যুদ্ধের ময়দানে এই অনায়াস যাতায়াত রক্তে যাঁদের দেশসেবা ও দেশ মাতৃকার প্রতি পরম দায়বদ্ধতা থাকে, তাঁদের পক্ষেই সম্ভব।

২০১৭ সালে একটি প্যানেল আলোচনায় তাঁর কর্নেল হওয়ার যাত্রাপথের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সোফিয়া কুরেশি বলেছেন, ‘ফৌজি পরিবারের সন্তান আমি। সেনাবাহিনীর সঙ্গে আজন্ম পরিচয়। শৈশব থেকে কঠোর অনুশাসনে বন্দি আমার বেড়ে ওঠা। ঠাকুরদা ও বাবা ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্রিয় সদস্য।’

বৈবাহিক সূত্রে সেনা পরিবারে এসে সোফিয়ার মায়ের মধ্যেও তৈরি হয়েছিল দেশ ও দেশের মানুষের সেবা ও সুরক্ষার প্রতি নিষ্ঠা। তাই তিনি চাইতেন দুই মেয়ের মধ্যে অন্তত একজন সেনাবাহিনীতে যোগ দিক। সোফিয়া মায়ের ইচ্ছে পূরণ করেছেন। শুধু পূরণই নয়, মাকে গর্বিত করেছেন সোফিয়া। অপারেশন সিঁদুরের ব্রিফিংয়ে মেয়েকে টিভিতে দেখে মায়ের প্রতিক্রিয়া, ‘আমাদের মেয়ে দেশের জন্য যা করেছে, তাতে আমরা খুশি। প্রত্যেক বাবা-মায়ের তাঁদের সন্তানদের, বিশেষ করে কন্যাসন্তানদের শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী করে তোলা উচিত। তাদের এমনভাবে গড়া উচিত, যাতে তাদের মধ্যে দেশসেবার ইচ্ছে তৈরি হয়।’

সোফিয়ার বাবার কথায়, ‘ঠাকুরদার কাছে যুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছে আমার মেয়ে। স্বপ্ন দেখত সেনার উর্দি পরে দেশের হয়ে যুদ্ধ করবে। তার সে স্বপ্ন সফল হয়েছে। আমি বাবা হিসাবে চাই আমার মেয়ে এভাবেই আগামী বহু বছর দেশের সেবা করে চলুক। এটাই আমাদের পরিবারের শিক্ষা ও দীক্ষা।’

কর্নেল সোফিয়া কুরেশি, আপনি এগিয়ে চলুন। তামাম দেশবাসীর শুভেচ্ছা, ভালোবাসা আপনার সঙ্গে। ভুবনমোহিনী দনুজদলনী ত্রিনয়নী মা দুর্গা হয়ে দশ হাতে আপনি দেশরক্ষা করুন। গোটা দেশ আপনাকে স্যালুট জানাচ্ছে। চরৈবতি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए