পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
বলিউডে প্রতিদিন জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন, নায়ক-নায়িকা এবং গল্প। কিন্তু এই বিশাল শিল্পের ইতিহাসে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়, বাঙালি শিল্পীদের অসাধারণ অবদান। পরিচালনা, অভিনয়, সংগীত, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা, প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাঙালিরা বলিউডকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা সংস্কৃতির সাহিত্য, সংগীত ও নাট্যচর্চা এই শিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
বাংলা সাহিত্য ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। এই সাহিত্য থেকেই বহু সিনেমার গল্পের উৎস তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস বহুবার চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘দেবদাস’ ভারতীয় ক্লাসিক সিনেমাগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা। একইভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও মানবতাবাদী চিন্তাধারা ভারতীয় চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধরনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
বলিউডে বাঙালি পরিচালকদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান নাম বিমল রায়। তিনি বাস্তববাদী চলচ্চিত্র নির্মাণে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত ‘দো বিঘা জমিন’ ভারতীয় কৃষকের দারিদ্র ও সংগ্রামের এক মর্মস্পর্শী কাহিনি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘বন্দিনী’, যেখানে নারীর মানসিক জটিলতা ও সমাজের বাস্তবতা অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তীকালে বলিউডে মানবিক গল্প বলার জন্য পরিচিত হন হৃষিকেশ মুখার্জি। তাঁর সিনেমা সাধারণ মানুষের জীবন, হাসি-কান্না এবং সম্পর্কের গল্প নিয়ে তৈরি। তাঁর পরিচালিত ‘আনন্দ’ এবং ‘গোলমাল’ আজও জনপ্রিয়।
বলিউডে অভিনয়ের ক্ষেত্রে বাঙালি শিল্পীদের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। ছয়ের দশকে হিন্দি সিনেমায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভিনীত রোমান্টিক চলচ্চিত্রগুলি সে সময় বেশ সাড়া ফেলেছিল। তারপর আটের দশকে কলকাতা থেকে গিয়ে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেন মিঠুন চক্রবর্তী। তাঁর অভিনীত ‘ডিস্কো ডান্সার’ সিনেমা আন্তর্জাতিকভাবে বিপুল সাফল্য অর্জন করে এবং তাঁকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে। নয়ের দশকে বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা হয়ে ওঠেন কাজল। তাঁর অভিনীত ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে’ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় চলা সিনেমাগুলির একটি। একইভাবে রানি মুখার্জি তাঁর অভিনয় দক্ষতা ও শক্তিশালী চরিত্র নির্বাচনের মাধ্যমে বলিউডে একটি বিশেষ জায়গা তৈরি করেছেন।
বলিউডের সংগীত জগতের ইতিহাসে বাঙালি শিল্পীদের অবদান অসামান্য। এই তালিকার প্রথমেই আসে কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমারের নাম। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া বহু গান আজও মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে রয়েছে। সংগীত পরিচালনায় অসাধারণ অবদান রেখেছেন এস ডি বর্মণ। তাঁর সুরে লোকসংগীত ও আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। তাঁর ছেলে আর ডি বর্মণ বলিউড সংগীতে আধুনিকতার নতুন যুগের সূচনা করেন। বাপ্পি লাহিড়ির অবদানও অনস্বীকার্য। এছাড়াও বাংলা সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় হিন্দি সিনেমায় বহু জনপ্রিয় গান গেয়েছেন এবং সংগীত পরিচালনাও করেছেন। গেয়েছেন মান্না দেও। বলিউডে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হলেন শ্রেয়া ঘোষাল, যিনি বহু ভাষায় বহু সুপারহিট গান গেয়েছেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য বলিউডকে প্রভাবিত করেছে। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ভারতীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে তুলে ধরেছিলেন। তিনি মূলত বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে তাঁর কাজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সামগ্রিক ভাষাকে প্রভাবিত করেছে। একইভাবে তপন সিনহা তাঁর মানবিক গল্প ও বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভারতীয় সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
যেসব বাঙালি বলিউড চলচ্চিত্র জগতে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য— মিঠুন চক্রবর্তী, কিশোর কুমার, হৃষিকেশ মুখার্জি, উৎপল দত্ত, শর্মিলা ঠাকুর, সলিল চৌধুরী, বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জি, রাহুল দেব বর্মণ, বিমল কর, বাপ্পি লাহিড়ি, নবদ্বীপ হালদার, শচীন দেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, জয়া ভাদুড়ি বচ্চন, সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, শ্রেয়া ঘোষাল, বিপাশা বসু, কঙ্কনা সেনশর্মা, রাইমা সেন, রিয়া সেন, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, অনুরাগ বসু, বাকি থাকল আরও বহু নাম।
বলিউডে বাঙালির এত প্রভাবের পিছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ—
১) সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য: বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা অত্যন্ত শক্তিশালী, যা চলচ্চিত্রের গল্প ও ভাবনার উৎস তৈরি করে।
২) থিয়েটারের শক্তিশালী ভিত্তি: বাংলায় নাটক ও থিয়েটারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই থিয়েটার চর্চা অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
৩) সংগীত ও শিল্পকলার গভীর অনুরাগ: বাংলা সংস্কৃতিতে সংগীত ও শিল্পকলার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও বাঙালিরা এগিয়ে।
বলিউডে বাঙালির প্রতিপত্তি কেবল কয়েকজন তারকার সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। মুম্বইয়ের ঝলমলে আলোয় যখন নতুন সিনেমা তৈরি হয়, তখন তাতে কোথাও না কোথাও জড়িয়ে থাকে বাংলার সাহিত্য, সংগীত এবং শিল্পচেতনার গভীর প্রভাব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলিউডের রূপ বদলালেও একটি বিষয় স্পষ্ট— ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই বিশাল আকাশে বাঙালি প্রতিভার আলো আজও সমান উজ্জ্বল এবং আগামী দিনেও তা ভাস্বর থাকবে।

