Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

তর্পণে সবার তৃপ্তি কামনা করা হয়

Share Links:

ভাস্কর সেনগুপ্ত

এ বছর আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২১ সেপ্টেম্বর তর্পণ করার সময়। সাধারণত লোক শেষ দিন অর্থাৎ মহালয়ায় তর্পণ করে থাকে। তর্পণ হল হিন্দু ধর্মানুসারে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় জল ও অন্যান্য উপকরণ নিবেদন করার একটি প্রথা। এটি সাধারণত পিতৃপক্ষের সময় করা হয়, যখন বিশ্বাস করা হয় যে, পূর্বপুরুষরা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং তাঁদের উদ্দেশে তর্পণ করলে তাঁরা সন্তুষ্ট হন।

তর্পণ একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ ‍তুষ্ট বা সন্তুষ্ট করা। হিন্দু ধর্মে এটি দেবতা, ঋষি এবং বিশেষ করে মৃত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে জল ও অন্যান্য উপকরণ নিবেদনের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর আচার। এ আচারের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি ও পরকালে মুক্তিকামনা করা হয়।

তর্পণে সাধারণত জল, তিল, যব এবং দূর্বা ঘাস ব্যবহার করা হয়। পিতৃপক্ষের সময় পুত্র বা পরিবারের সদস্যরা এই উপকরণগুলি দিয়ে মন্ত্রপাঠ করে পূর্বপুরুষদের তর্পণ করেন। তর্পণ হল, পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি পবিত্র প্রথা, যা হিন্দু ধর্মানুসারে তাঁদের শান্তি ও মুক্তির জন্য পালন করা হয়।

ছোটবেলা থেকে অনেককেই বলতে শুনেছি, ‍‘আমি শ্রাদ্ধ মানি না। আমি তর্পণ করি না। ওসব কুসংস্কার। আমি মরার পরে দেহ দান করব।’ এরকম আরও অনেক কথা। হিন্দু বাঙালির কাছে এটা প্রায় প্রগতির প্রতীক বলে মনে করা হয়। কিন্তু কোনও দিন কি আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে, শ্রাদ্ধ আসলে কী? বহু বছর আগে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ কর্তা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ‘তোমরা অনুন্নত, বর্বর, কুসংস্কারাছন্ন।’ আমরা নিজেদের এখনও সেরকমই ভাবি। আজও আমরা ‍সুসংস্কার আর কুসংস্কারের মধ্যে তফাত করতে চাইলাম না। যে সংস্কার দেশ ও দশের ক্ষতি করে, তাই ‍‘কু’। আর যে সংস্কার তা করে না, সেটা ‍‘কু’ হতে পারে না।

শ্রাদ্ধকাণ্ডে চেয়ে দেখুন, কী অপূর্ব ভাবব্যাঞ্জনা! শ্রদ্ধা জানানোর ক্রিয়াই শ্রাদ্ধ। মৃত ব্যক্তি অর্থাৎ যাঁর নামে শ্রাদ্ধ, তাঁর উদ্দেশে ক্রিয়া তো আছেই, তাছাড়াও আছে সমস্ত মৃত জীবের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। শ্রাদ্ধের তিনটি পিণ্ডের একটি দেওয়া হয় অপূর্ব কবিতা পাঠ করে, ‍‘যাঁরা আমার কুলে জন্মে মৃত্যুবরণ করে অগ্নিতে দাহ হয়েছেন, যে যে ব্যক্তি অগ্নিলাভ করেননি অর্থাৎ দাহ হননি, তাঁদের সবাই তৃপ্তি লাভ করুন। যাঁর মা নেই, যাঁর পিতা নেই, যাঁর বন্ধু নেই, সেসব নির্বান্ধব ব্যক্তিও আমার এ পিণ্ডে তৃপ্তিলাভ করুন।’

তর্পণকালে কী অপূর্ব ভাব! তর্পণকারী জলে দাঁড়িয়ে অখিল ব্রহ্মাণ্ডের প্রতি তাঁর নিবেদন জানান, ‘ব্রহ্মা যেন তৃপ্ত হন, বিষ্ণু যেন তৃপ্ত হন, রুদ্র যেন তৃপ্ত হন। প্রজাপতি, দেবতাগণ, যক্ষ, নাগ, গন্ধর্ব, অপ্সরা, সুর এবং অসুর, যারা নিষ্ঠুর অত্যাচারী ব্যক্তি, যারা পাপিষ্ঠ এবং যারা পুণ্যবান ধার্মিক, আকাশের জীবকুল, পক্ষিকুল, সর্পসমূহ, সমস্ত উদ্ভিদ, তরুলতা, যারা খেতে পায়নি এবং যে সমস্ত জীব জলের অভ্যন্তরে থাকে, তারা সবাই যেন আমার এ নিবেদনে তৃপ্তিলাভ করে। কপিল মুনি, মরীচি, অত্রি, অঙ্গীরা, ক্রতু, পুলস্ত্য পুলহ, প্রচেতা, বশিষ্ঠ, ভৃগু, নারদরা যেন আমার এ নিবেদনে তৃপ্ত হন। যে সমস্ত পূর্বপুরুষ রাগী প্রকৃতির, তাঁরা যেন তৃপ্তিলাভ করেন। যে সমস্ত পূর্বপুরুষ শান্ত, সৌম্য প্রকৃতির, তাঁরাও যেন তৃপ্তিলাভ করেন। যম, ধর্মরাজ, চিত্রগুপ্ত এবং অনন্ত প্রবহমান সময়ের প্রতীক এ কাল যেন তৃপ্ত হয়। শান্তনুপুত্র ভীষ্ম অপুত্রক ছিলেন বলে তাঁর জন্য আমি এ নিবেদন করছি। তিনি যেন তৃপ্তিলাভ করেন। আমার পিতামহ, প্রপিতামহ, মাতামহ, প্রমাতামহ-সহ ছয় পুরুষ অবধি যেন তৃপ্তিলাভ করে। যাঁরা আমার জীবনে পিতার মতো, তাঁরা যেন তৃপ্ত হন। আমার মামা, পিসি, মাসি, ভাই, বোন, শ্বশুর-শাশুড়ি, যিনি যেখানে অতৃপ্ত রয়েছেন, তাঁরা সবাই যেন তৃপ্ত হন। ব্রহ্মলোক থেকে শুরু করে সাতলোকে যেখানে যে জীব অতৃপ্ত অবস্থায় আছে, সবাই যেন তৃপ্ত হয়। সমস্ত দেবর্ষি, মানব এবং সপ্তদ্বীপের অধিবাসীরা যেন তৃপ্ত হন। এ তিন ভুবনের তৃণ থেকে কীটাণু অবধি প্রতিটি প্রাণী যেন তৃপ্তিলাভ করে। যে সমস্ত ব্যক্তির সন্তানসন্ততিহীন বলে ক্রিয়া করার লোক নেই, তাঁরাও যেন আমার এ নিবেদনে তৃপ্ত হয়ে পরম গতি অর্থাৎ পরম জ্ঞান লাভ করেন। যে সমস্ত ব্যক্তির গোত্র-পরিচয় হারিয়ে গিয়েছে, তাঁরাও যেন আমার দ্বারা তৃপ্ত হয়ে পরম গতি লাভ করেন।’

এরকম অপূর্ব ভাব পৃথিবীর আর কোথায় পাবেন, যেখানে শুধু মৃত ব্যক্তি নয়, তাঁদের উপলক্ষ করে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের হয়ে প্রার্থনা জানানো হয়? শুধু নিজের ধর্ম, নিজের দেশ, নিজের কাল, নিজের প্রজাতির উদ্দেশে নয়, সমস্ত জীবের তৃপ্তি কামনা করা হয়। শুধু ধার্মিক পুণ্যবান নয়, অধার্মিক পাপিষ্ঠদের উদ্দেশেও প্রার্থনা জানানো হয়। ভাবা যায়! আজমল কাসভ মানবতার শত্রু হলেও হিন্দুর মানবতার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে না। কারণ হিন্দু জানে, পাপিষ্ঠও একটি জীব। বুঝুক কিংবা না বুঝুক, সেও ‍‘অমৃতস্য পুত্রা’। রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে রাজধর্ম পালন করতে। আমরা তাদের শুভকামনা করব আমাদের স্বধর্ম পালন করতে। এভাবেই ধর্মের চাকা চলবে। এ ভাব ভারতীয় সভ্যতার নিজস্ব সম্পদ।

পিতৃতর্পণের সঙ্গে রামায়ণের রামচন্দ্র এবং মহাভারতের মহাবীর কর্ণ সম্বন্ধীয় দু’টি কাহিনি প্রচলিত আছে। রামচন্দ্র মহালয়ার দিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করেছিলেন। অনেকের ধারণা, তখন থেকেই পিতৃতর্পণের প্রচলন হয়েছে। কর্ণ সম্বন্ধীয় কাহিনিতে বলা হয়, কর্ণ চিরকাল মানুষকে স্বর্ণ, রত্ন ইত্যাদি দান করে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে কখনও জল বা খাদ্য দান করেননি। কারণ তিনি নিজের পিতৃপুরুষের পরিচয় জানতেন না। তবে এটা ছিল কর্ণের অনিচ্ছাকৃত একটি ভুল। তবুও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর মহাবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেওয়া হয় শুধুই সোনা আর ধনরত্ন। তখন কর্ণ তার কারণ জিজ্ঞাসা করেন দেবরাজ ইন্দ্রকে। উত্তরে ইন্দ্র কর্ণকে বলেন, কর্ণ সারাজীবন মানুষকে সোনাদানাই দান করেছেন, পিতৃপুরুষকে কখনও জল দেননি, তাই তাঁর সঙ্গে এমন করা হয়েছে। তখন কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে তাঁর অনিচ্ছকৃত ভুলের কথা জানালে ইন্দ্র কর্ণকে এক পক্ষকালের জন্য মর্তে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দেন। ইন্দ্রের কথামতো এক পক্ষকাল ধরে কর্ণ মর্তে অবস্থান করে তাঁর পিতৃপুরুষকে অন্নজল দেন। ফলে কর্ণের পাপস্খালন হয় এবং যে পক্ষকাল কর্ণ মর্তে এসে পিতৃপুরুষকে জল দেন, তা পরিচিত হয় পিতৃপক্ষ নামে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए