কাজল মুখার্জি

বেলুড় মঠের ঘরে নিঃশব্দে অনন্তের পথে যাত্রা করলেন এক যাজ্ঞিক পুরুষ। মাত্র ৩৯ বছরের জীবন, কিন্তু ভাবনা, দর্শন, কর্মে যুগযুগান্তরকে ছুঁয়ে গিয়েছেন। ৪ জুলাই তাঁর প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা প্রশ্ন করি, স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের কী দিয়ে গেলেন? শুধু একটি চিন্তাধারা, নাকি এক চিরন্তন জাগরণ?
নরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রখর বুদ্ধি, যুক্তিবাদী মন আর এক মানবদরদি আত্মা। ঈশ্বরে সন্দেহ ছিল, ধর্মে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্নেহ, সারল্য এবং আত্মজ্ঞান তাঁর সমস্ত সংশয় ভেঙে দিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন, ধর্ম কেবল উপাসনার বিষয় নয়, মানবসেবাই আসল ধর্ম।
১৮৯৩ সালে শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে বিবেকানন্দের বলা ‘Sisters and Brothers of America…’ শুধু একটি ভাষণের শুরু নয়, তা ছিল বিশ্বমানবতার উদ্দেশে এক দুর্দান্ত আহ্বান। তিনি বলেছেন,
‘ধর্ম কোনও একান্ত বিশ্বাস নয়, তা হওয়া উচিত সহিষ্ণুতা, সহানুভূতি এবং কর্মের মাধ্যম।’ তিনি যখন বলেছিলেন, ‘যতদিন লক্ষ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত, অশিক্ষিত, ততদিন ঈশ্বরের খোঁজ বৃথা’, তখন তিনি ভারতের আত্মাকে মানবতার বৃহত্তর প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
স্বামীজির শিক্ষা ছিল আত্মপ্রত্যয়ের। তিনি বলতেন, ‘নিজেকে দুর্বল ভাববে না। ঈশ্বর তোমার ভিতরেই রয়েছেন। Rise, awake and stop not till the goal is reached.’
আজ যখন তরুণ প্রজন্ম হতাশায় ভুগছে, আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে, তখন স্বামীজির বাণী তাদের আত্মার খোঁজ করতে বলে, সাহসে ভর করে এগোতে শেখায়। ধর্মের নামে বিভেদ, জাতপাত, হানাহানি, তিনি এসবের ছিলেন তীব্র বিরোধী। বলেছিলেন, ‘যে ধর্ম মানুষকে ভয় দেখায়, সেটা ধর্ম নয়। ধর্ম হল এমন এক শক্তি, যা মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়।’ আজ যখন বিশ্বজুড়ে হিংসা, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতিগত বিদ্বেষে রক্ত ঝরছে, তখন স্বামীজির দর্শন আমাদের মনে করায়, মানবতার চেয়ে বড় কিছু নেই।
১৯০২ সালের ৪ জুলাই, সন্ধ্যা ৯টা ১০ মিনিট। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় চুপচাপ চলে গিয়েছেন এক যাত্রিক। তাঁর দেহ শেষ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু বাণী, ভাবনা আজও আমাদের আলোর দিশা দেয়। আজ যখন আমাদের চারপাশে এত অস্থিরতা, বিভাজন এবং অনিশ্চয়তা, তখন স্বামী বিবেকানন্দের বাণী যেন এক তীব্র দীপ্তিতে আমাদের মনে করায়, মানুষ জাতির শ্রেষ্ঠ ধর্ম হল, পরের জন্য বাঁচা। Serve man as God. That is the highest worship. প্রয়াণ দিবসে তাঁকে স্মরণ করব শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, নিজের জীবন ও মননে ধারণ করে। আজও তিনি আছেন, যেখানে কেউ দরিদ্র, অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ায়, যেখানে একজন তরুণ বা তরুণী নিজেকে নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখে, যেখানে ধর্ম মানে হয় ভালোবাসা, সেখানেই এক দীপ্ত শিখা হয়ে জ্বলে ওঠেন স্বামী বিবেকানন্দ।
