প্রিয় সরকার
কলকাতার এক সচ্ছল পরিবারের ছেলে থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী অধিনায়ক হয়ে ওঠা সৌরভ গাঙ্গুলির সংগ্রামের পথটি মোটেই সহজ ছিল না। বিতর্ক, অপমান, প্রত্যাখ্যান— সবকিছুকে অতিক্রম করেই তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় ক্রিকেটের ‘দাদা’।
সৌরভ গাঙ্গুলির পরিবার ব্যবসায়িক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ ছিল। ছোটবেলায় ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলই তাঁকে বেশি আকর্ষণ করত। তাঁর দাদা স্নেহাশিস গাঙ্গুলি ছিলেন বাংলার একজন পরিচিত ক্রিকেটার। দাদার অনুপ্রেরণাতেই সৌরভের হাতে প্রথম ওঠে ক্রিকেট ব্যাট। স্কুল ও কলেজ ক্রিকেটে তাঁর প্রতিভা দ্রুত নজর কাড়ে নির্বাচকদের। ১৯৯২ সালে তিনি সুযোগ পান ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলে। প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু সে সফরে তিনি বড় কিছু করতে পারেননি। নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যে তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এই তরুণের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার হয়তো এখানেই শেষ।
চার বছর পর ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে সৌরভ ফের সুযোগ পান। ক্রিকেটের মক্কা বলে পরিচিত লর্ডস ক্রিকেট মাঠে নিজের টেস্ট অভিষেকেই তিনি করেন দুর্দান্ত শতরান। ওই ইনিংস শুধু তাঁর কেরিয়ার নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসও বদলে দেয়। পরের ম্যাচেও শতরান করে প্রমাণ করেন, তিনি বড় মঞ্চের জন্যই তৈরি।
২০০০ সালে ভারতীয় ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারির পর বড় সংকট তৈরি হয়। সে সময় অধিনায়ক করা হয় সৌরভ গাঙ্গুলিকে। বিসিসিআইয়ের সেই সিদ্ধান্ত ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্য বদলে দেয়। সৌরভ গাঙ্গুলি সাহসের সঙ্গে তরুণদের সুযোগ দেন। তাঁর হাত ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠা পান বীরেন্দ্র সেহবাগ, যুবরাজ সিং, হরভজন সিং, জাহির খান। সে দলই পরবর্তীকালে ভারতীয় ক্রিকেটকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত করে। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নাটকীয় জয়ের পর লর্ডসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে জার্সি খুলে ঘোরানোর দৃশ্য ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত মুহূর্ত। এ দৃশ্য শুধু একটি উদ্যাপন নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের ঘোষণা।
২০০৫ সালে ভারতের কোচ গ্রেগ চ্যাপেলের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে সৌরভ গাঙ্গুলিকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। সে সময়টিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। সমালোচনার ঝড়, মিডিয়ার চাপ— সব কিছুই তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। তবে ২০০৬ সালে আবার ভারতীয় দলে ফিরে এসে তিনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন। তাঁর ব্যাটে ফের রান আসে। সেই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে, সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন কখনও হার মানেন না। সৌরভ ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। কিন্তু ক্রিকেট থেকে দূরে যাননি। ২০১৯ সালে তিনি নির্বাচিত হন বিসিসিআইয়ের সভাপতি হিসেবে। প্রশাসক হিসাবেও তিনি নতুন উদ্যোগ ও সংস্কারের জন্য প্রশংসিত হন।
সৌরভ গাঙ্গুলি শুধু একজন ক্রিকেটার নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের মানসিকতার পরিবর্তনের প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় দল শিখেছিল, বিদেশের মাটিতেও জেতা সম্ভব, প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করা সম্ভব। আজও যখন ভারতীয় ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের কথা বলা হয়, তখন দাদার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক বড় ব্যাটসম্যান ও অধিনায়ক এসেছেন, কিন্তু এমন নেতা খুব কমই আছেন, যিনি একটি দলের মানসিকতা বদলে দিয়েছেন। এ কারণেই সৌরভ আজও শুধু একজন ক্রিকেটার নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের এক যুগের নাম।
