অজয় ভট্টাচার্য

জীবজগতে শব্দের যেমন প্রয়োজন আছে, তেমন নৈঃশব্দ্যেরও। শব্দের সুরময় হয়ে ওঠার আবশ্যিক সঙ্গী হল নৈঃশব্দ্য। শব্দ আর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বিচরণ করে সমগ্র জীবজগৎ তথা আমাদের এই প্রকৃতি। আর এ দুইয়ের ছন্দবদ্ধ সমন্বয়ে আসে আমাদের মানসিক প্রশান্তি।
কিন্তু এই মানসিক প্রশান্তি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। শব্দের যথেচ্ছচার ব্যবহার দুর্বিষহ করে তুলেছে জনজীবন। এমনকী অতি ব্যবহারে সুরযুক্ত শব্দকেও মাঝেমধ্যে সুরবর্জিত ঠেকে। নগরায়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত প্রগতি, পরিবহণের প্রসার এবং মানুষের জীবনযাপনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনই মুখ্যত শব্দদূষণের কারণ। মানব সভ্যতা যত আধুনিক হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে ততই বাড়ছে শব্দদূষণ। মেলা, খেলা, বনভোজন, সর্বত্র ডিজের শব্দের প্রবল উপস্থিতি বুকে কশাঘাত করে। শব্দদানবের অত্যাচারে বাদ যায় না হাসপাতাল, স্কুল, কলেজও। মোহময় শব্দজগৎ মানুষের জীবন থেকে মুছে যেতে বসেছে। পরিবর্তে সর্বত্র গেড়ে বসেছে অবাঞ্ছিত সুরবর্জিত শব্দের হুঙ্কার। মাইক্রোফোনের অপব্যবহারে মানুষ যেন আজ বলপূর্বক শ্রোতায় পরিণত হয়েছে।
একসময় কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় শব্দদানবকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে তাঁর এক রায়ের মধ্য দিয়ে শব্দদানবকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল বটে, কিন্তু প্রশাসনের শিথিল মনোভাবে তা আবার লাগামছাড়া হয়ে বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ৯০ ডেসিবেলের শব্দের যে মাপকাঠি প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বলবৎ ছিল, রাজ্যের বাজি ব্যবসায়ী, একধরনের মধ্যস্বত্বভোগী, রাজনীতিবিদ এবং আধিকারিকদের একাংশের সম্মলিত প্রচেষ্টায় সে আইনকে সহজ করে শব্দদানবের রাজ্যপাট ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপরন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে সবুজ বাজির নাম করে বাজার জাঁকিয়ে বসেছে বেআইনি কারবার। ফলে গত বছর দীপাবলিতে কলকাতা শহরে বায়ুর গুণমান সূচক (একিউআই) ৩০০ অতিক্রম করেছিল।
১৯৯৬ সালের এপ্রিলে বিচারপতি এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। সে রায় ছিল সুরের অসুর নিধনের মতো এক অব্যর্থ নিদান। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সেই ঐতিহাসিক রায়কে দু’হাত তুলে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ঘোষিত হয়েছিল, কেউ যেমন একজন মানুষকে বন্দি শ্রোতা বা দাস শ্রোতায় পরিণত করতে পারবেন না, তেমনই বলপূর্বক দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য করতে পারবেন না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানসম্মত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শুনতে না চাওয়ার স্বাধীনতা থাকবে না। অপছন্দের কিছু শুনতে না চাওয়াটাও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়। পাশাপাশি দূষণমুক্ত পরিবেশের অধিকারও সংবিধানসম্মত। জীবনের জন্য শব্দের প্রয়োজন, নৈশঃব্দেরও।
