Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

শিকাগো বিশ্বধর্ম মহাসভায় স্বামীজির ভাষণ এক আলোকবর্তিকা

Share Links:

কাজল মুখার্জি

১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। শিকাগোর ‍‘পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ডস রিলিজিয়নস’-এ দাঁড়িয়ে তরুণ ভারতীয় সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ উচ্চারণ করেছিলেন ঐতিহাসিক শব্দমালা ‍‘Sisters and Brothers of America’। মুহূর্তেই করতালির ধ্বনিতে তাঁকে অভিবাদন জানান উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী। ছ’-সাত মিনিট ধরে চলেছিল সে অভ্যর্থনা। ভারতের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি পশ্চিমের দার্শনিক-ধর্মীয় মহলে প্রথম পরিচয় করান ভারতীয় আত্মা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার দর্শনের। এ বছর ১১ সেপ্টেম্বর সে ভাষণের ১৩২তম বর্ষপূর্তির দিনে আমরা যদি ফিরে তাকাই, তবে স্পষ্ট হয়, বিবেকানন্দের চিন্তা শুধু ইতিহাস নয়, বরং আজকের বিশ্বের জন্যও এক জ্বলন্ত দিশারী।

উনিশ শতকের শেষভাগে ভারত ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন। সামাজিক বিভাজন, দারিদ্র, কুসংস্কার, সব মিলিয়ে হতাশায় আচ্ছন্ন ছিল দেশ। সে সময় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্য হিসাবে বিবেকানন্দের আত্মপ্রকাশ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ভারতকে আত্মবিশ্বাস জোগাতে হবে, তাকে বুঝতে হবে নিজের ঐতিহ্য, দর্শন ও শক্তিকে। শিকাগো বিশ্বধর্ম মহাসভায় তাঁর বক্তৃতা ছিল একদিকে পশ্চিমি দুনিয়ার সামনে ভারতের আত্মপরিচয় ঘোষণা, অন্যদিকে সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি সর্বজনীন বার্তা।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, সব ধর্মই মানুষকে সত্য ও পরমেশ্বরের কাছে নিয়ে যায়, তাই ধর্মগুলিকে বিরোধী না ভেবে সমান্তরাল পথ হিসাবে দেখা উচিত। ‍‘আমেরিকার ভাই ও বোনরা’, এ সম্বোধনই প্রমাণ করে দেয়, মানুষকে ধর্ম, জাতি বা ভাষার ভিত্তিতে বিভক্ত না করে আত্মীয়তার সূত্রে বাঁধা সম্ভব। বিবেকানন্দের বক্তব্যের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, ধর্মচর্চা কেবল আচার বা দর্শনে সীমাবদ্ধ নয়, তা পরীক্ষিত হয় মানুষের সেবার মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন, ‍‘ওঠো, জাগো, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত থেমো না।’ যুবসমাজকে আত্মবিশ্বাস ও শক্তি জোগানো ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।

১৩২ বছর কেটে গিয়েছে, কিন্তু পৃথিবীর সংকটগুলি যেন স্বামীজির ভাষণের প্রতিটি ছত্রে প্রতিধ্বনিত হয়। আজকের বিশ্বে ধর্মের নামে সংঘাত, যুদ্ধ, বিদ্বেষ ও সন্ত্রাস নিত্যদিনের খবর। বিবেকানন্দ দেখিয়েছিলেন, ধর্ম মানে মিলনের সেতু, বিভেদের দেওয়াল নয়। তাঁর ভাষণ আজকের আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এখনও একইভাবে প্রেরণা জোগায়। শিকাগোর বিশ্বধর্ম মহাসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির কথা, যেখানে বহু ধর্ম, জাতি ও জাতিগোষ্ঠী আশ্রয় পেয়েছিল। আজকের বিশ্বায়নের যুগে, যেখানে অনেক জাতি-রাষ্ট্র নিজেদের শিকড় হারিয়ে ফেলে, সেখানে তাঁর এ বক্তব্য জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত।

আধুনিক পৃথিবী অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে বটে, কিন্তু এখনও দারিদ্র, বেকারত্ব, বৈষম্য বিরাট সমস্যা। বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‍‘দরিদ্র-দুঃখী, অসহায় মানুষই আসল ঈশ্বর।’ এ বাণী আজও মানবকল্যাণকেন্দ্রিক নীতির দাবি তোলে। বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর হলেও হতাশা, বেকারত্ব, মূল্যবোধের সংকট প্রবল। বিবেকানন্দের যুবকদের উদ্দেশে আহ্বান আজও চিরন্তন, ‍‘শক্তি, উদ্যম ও আত্মবিশ্বাস দিয়েই সমাজ গড়ে উঠতে পারে।’ দ্রুতগতির জীবনে উদ্বেগ, হতাশা, মানসিক চাপ বেড়েই চলেছে। তাঁর শিক্ষা, ধ্যান, আত্মসংযম ও অন্তর্দৃষ্টি আজকের মানুষকে মানসিক সুস্থতা ও আত্মশান্তি দিতে সক্ষম। তাঁর দর্শন প্রয়োগ করা সহজ নয়। ধর্মীয় সহনশীলতার বার্তা প্রায়ই রাজনৈতিক স্বার্থে বিকৃত হয়। বিশ্বায়নের ভোগবাদী সমাজে আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিকতার আহ্বান অনেকে গ্রহণ করতে চায় না। তবু এসব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই তাঁর শিক্ষা প্রয়োগযোগ্য হয়ে ওঠে, কারণ তা কেবল তত্ত্ব নয়, এক গভীর মানবিক সত্য।

স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতা শুধু ভারতীয় ইতিহাসের এক গৌরবময় মুহূর্ত নয়, বরং বিশ্বমানবতার ইতিহাসে মাইলফলক। ধর্মীয় সহনশীলতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, আত্মশক্তির জাগরণ, এ মূল্যবোধগুলি আজও বৈশ্বিক শান্তি, ন্যায় ও মানবকল্যাণের জন্য অপরিহার্য। আজ এ ঐতিহাসিক বক্তৃতার ১৩২তম বর্ষপূর্তিতে আমরা যদি তাঁর শিক্ষা আমাদের বিবেকে গ্রহণ করি, তবে হয়তো বিভাজনের বদলে ঐক্য, ঘৃণার বদলে ভালোবাসা, হতাশার বদলে আত্মবিশ্বাস দিয়ে এক নতুন পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
অজয় ভট্টাচার্য
অজয় ভট্টাচার্য
9 months ago

দারুন লেখা। বিবেকানন্দের ভাবনা সর্বদাই যুগোপযোগী।

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए