ডা. সতীনাথ ভট্টাচার্য

খ্যাতনামা প্রাবন্ধিক ও কবি অধ্যাপক দেবযানী চক্রবর্তী ভৌমিক লিখেছেন, ‘আদিকাল থেকে বয়ে চলা শুধু/ ধুয়ে দিতে যত পাপ/ আজ নদী তুমি ক্লান্ত বড়োই,/ সকলে নিরুত্তাপ।’ কিন্তু সকলেই বোধহয় নিরুত্তাপ নন। যেমন, দুই বন্ধু অঙ্কিত আগরওয়াল ও প্রতীক কুমার ২০১৫ সালে মকরসংক্রান্তির কুয়াশামাখা শীতসকালে কানপুরে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে নদীর হতশ্রী অবস্থা দেখে চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। তাঁরা সমাজের নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে ২০১৭ সাল থেকে বিভিন্ন মন্দির থেকে পুজোয় ব্যবহৃত ফুল সংগ্রহ করে তা দিয়ে ধূপকাঠি, আবির, সার প্রভৃতি সামগ্রী তৈরি শুরু করেন। তাঁদের হাত ধরে এখন প্রায় ৩০০ মহিলা স্বনির্ভর হয়েছেন। এর ফলে যেমন প্রকৃতি (নদী) খানিক স্বস্তি পাচ্ছে, ঠিক তেমনই প্রকৃতির (নারীর) ক্ষমতায়ন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘জলঙ্গি দিবস’-এ এ তথ্য সগৌরবে জানালেন কৃষ্ণনগর অক্ষয় বিদ্যাপীঠ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সাগরিকা দাশগুপ্ত।
বিগত পাঁচ বছর ধরে নদীপ্রেমী অরাজনৈতিক নাগরিক সংগঠন ‘সেভ জলঙ্গি’ রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মদিবসে (১৭ ফেব্রুয়ারি) পালন করে আসছে ‘জলঙ্গি দিবস’’। এই উপলক্ষে ‘সেভ জলঙ্গি’ সন্ধ্যায় জেলাজুড়ে জলঙ্গি, অঞ্জনা, ভাগীরথী ও সুরধুনী নদীর ঘাটে ঘাটে প্রদীপ প্রজ্বলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ওইদিন দুপুরে কৃষ্ণনগর দ্বিজেন্দ্রলাল কলেজের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে একটি আন্তর্দেশীয় সেমিনারের আয়োজন করে। বিষয়, বাংলার নদনদীর পুনরুজ্জীবন ও স্থায়ী পরিবেশমুখী অভ্যাস গড়ে তোলা।
কৃষ্ণনগরের বুকে পুজোয় ব্যবহৃত ফুল থেকে আবির, ধূপকাঠি, প্রসাধনী দ্রব্য প্রভৃতি প্রস্তুত করে ছবি চ্যাটার্জি মিত্র এবং দিগন্তিকা চৌধুরী এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। পরিবেশের এই দুর্দিনে পুজোর ফুল প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নদীতে ফেলা যেমন বিজ্ঞানসম্মত নয়, ঠিক তেমনই শাস্ত্রসম্মতও নয়, এ বিষয়েও আলোকপাত করা হয় সেমিনারে।
ওইদিনের অন্যতম বক্তা অধ্যাপক দেবযানী চক্রবর্তী ভৌমিক বলেন, ‘এই নশ্বর পৃথিবীতে একমাত্র অবিনশ্বর প্লাস্টিক।’ জীবনানন্দের জন্মদিনে তিনি উচ্চারণ করলেন কবির কথা, ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন।’ ইকোফেমিনিজমের কথাও শোনা গেল তাঁর মুখে। তিনি বলেন, ‘নারী যেমন পুরুষের হাতে আক্রান্ত হয়, তেমনই প্রকৃতিও প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হয় মানুষের হাতে। এখন মাত্র ১ শতাংশ প্লাস্টিক রি-সাইক্লিং করা হয়। তাহলে বাকিটা কোথায় যায়?’
সেমিনারে রাজ্য প্রাণিসম্পদ বিকাশ দফতরের সহ-অধিকর্তা ডা. সারিকুল ইসলাম জানান, ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে প্রাণিসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ।’ অধ্যাপক জলি চ্যাটার্জি জানান, ‘কীভাবে আমরা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করতে পারি আর মাটির কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত সঠিকভাবে বজায় রাখতে পারি।
প্রণয়কুমার ঘোষ দৃঢ়কণ্ঠে জানান, গরিব মানুষের ঠিকমতো রুটিরুজির ব্যবস্থা না হলে পরিবেশের ওপর আঘাত আসবেই। সুস্মিত হালদারের কথায়, জনপ্রতিনিধিরা সুশিক্ষিত না হলে এবং তাঁদের মনে যথাযথ পরিবেশ ভাবনা না জন্মালে পরিবেশের উন্নতি কখনওই সম্ভব নয়।
ভূগোলের শিক্ষক সুরজিৎ সাহা বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানোর কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানী জেমস হাটনের কথা, ‘Present is the key to the past’, অর্থাৎ বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে, অতীতে তার কিছু চাবিকাঠি আছে। আগামী প্রজন্মের সাপেক্ষে আমরা অতীত। তাই আগামী প্রজন্ম যেন ভাবতে পারে, অতীতে নিশ্চয়ই কিছু ভাবনাচিন্তা হয়েছে, আর তার ফলে তারা একটি সুস্থ পরিবেশ পেয়েছে। এ কথাকে পুরোপুরি মান্যতা দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তীব্র জলকষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে জলঙ্গি ও অঞ্জনা-সহ নদিয়ার প্রতিটি নদী ও জলাশয়কে বুক দিয়ে আগলে রাখতে বিগত পাঁচ বছর ধরে ‘সেভ জলঙ্গি’ লাগাতার আন্দোলন করে চলেছে।

Excellent
অসাধারণ লেখা। সামগ্রিক আয়োজন এখানে প্রতিফলিত।