সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

বেহালায় এত বছর থেকেও জানতাম না যে, রাজা বসন্ত রায়ের রাজধানী ছিল সরশুনা। এখানে আমি বহুবার গিয়েছি, কিন্তু কেউ এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আমাকে দেয়নি যে, রাজা বসন্ত রায়ের রাজধানী ছিল সরশুনা। এতে আমাদের ইতিহাস বিমুখতা ও যথার্থ জ্ঞানের অভাব প্রকট হয়। সরশুনা আমার বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়, পাঁচ কিলোমিটার। আমার বন্ধু, আত্মীয়দের অনেকের বাস সেখানে বা আশপাশে। কিন্তু কেউ বলেননি।
রাজা বসন্ত রায়ের নামটা আরও একটি কারণে আমার কাছে পরিচিত। লেক মার্কেটের পিছন দিকে রাজা বসন্ত রায় রোড রয়েছে। আমার অনেক আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ওই এলাকায়। আমাদের বাড়ি থেকেও মাত্র সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে। আবার তার কাছাকাছি আছে সরদার শঙ্কর রোড। সর্দার শঙ্কর ছিলেন বসন্ত রায়ের সেনাপতি।
রাজা বসন্ত রায় যশোর থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসার পর তাঁর রাজধানী হয় বেহালার কাছে সরশুনা। একসময় সরশুনা ছিল বেহালা থানার অধীনে। পরে লোকসংখ্যা বাড়ায় বেহালা থানা ভেঙে গিয়ে একাধিক থানা হয়েছে। সরশুনা এখন সরশুনা থানার অধীনে।
যশোরের মহারাজা বিক্রমাদিত্য তাঁর রাজ্যকে ভাই বসন্ত রায় ও পুত্র প্রতাপাদিত্য রায়ের মধ্যে বণ্টন করেন। প্রতাপাদিত্য পেয়েছিলেন প্রায় ৬০% এবং বসন্ত রায় পেয়েছিলেন ৪০%। পূর্ব ভাগ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতাপাদিত্যের ভাগে পড়েছিল। আর পশ্চিমাংশ পেয়েছিলেন বসন্ত রায়। আজকের কালীঘাট, গড়িয়া, বারুইপুর, বড়িশা ও বেহালা থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত বসন্ত রায়ের ভাগে পড়েছিল। এই এলাকা আগে থেকেই উন্নত ছিল।
প্রতাপাদিত্য তাঁর রাজধানী যশোর থেকে ধুমঘাটে সরিয়েছিলেন। তিনি মোগল বাহিনীকে বাংলা থেকে হটাতে বিশাল স্থলবাহিনী ও নৌবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু রাজা বসন্ত রায় প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে সহমত ছিলেন না। তাই কাকা ও ভাইপোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। কাকার ওপর প্রতাপাদিত্যর তাঁর ক্ষোভ ছিল, কারণ তিনি ভাবতেন যে, মোগল দরবারে কিছুদিন তাঁর আটক থাকার পিছনে কাকা বসন্ত রায়ের হাত ছিল। উপরন্তু প্রতাপাদিত্য তাঁর কাকার কাছ থেকে খুলনা জেলার বাগেরহাট থেকে ৪ মাইল দূরে চাকশ্রী গ্রামটি চেয়েছিলেন। ওই জায়গাটি তাঁর দরকার ছিল, কারণ তিনি তাঁর নৌবাহিনীর জন্য সেটা একটি বন্দর হিসাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন, যাতে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিতাড়িত করতে পারেন। তারা ছিল তাঁর রাজত্বের পক্ষে আপদস্বরূপ। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও রাজা বসন্ত চাকশ্রী গ্রামটি দেননি। তাতে প্রতাপাদিত্য খুব ক্ষুব্ধ হন।
প্রথমে বসন্ত রায় যশোর থেকেই তাঁর শাসনকাজ চালাতেন। যথাসময় প্রতাপাদিত্য তাঁর রাজধানী ধুমঘাটে স্থানান্তরিত করলে বসন্ত রায় স্থির করেন, তিনিও তাঁর রাজ্য বাংলার পশ্চিম ভাগের কোথাও রাজধানী সরাবেন। সে সময় বেহালা ও বড়িশা ছিল সমৃদ্ধ গ্রাম। বসন্ত রায় এখানেই তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করবেন বলে মনস্থ করেন। তিনি কালীঘাট মন্দিরের বিখ্যাত পুরোহিত ভুবনেশ্বর ব্রহ্মচারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। ওই পুরোহিত তাঁকে পরামর্শ দেন কালীঘাটের কাছে কোথাও তাঁর রাজধানী স্থাপন করতে। বসন্ত রায় সরশুনা গ্রামের উত্তরাংশে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করবেন বলে নির্বাচন করেন এবং এখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করান, যার নাম রায়গড় দুর্গ। সেই দুর্গের এখন কিছু অবশিষ্ট নেই। তিনি সেই দুর্গের পাশে একটি বিশাল দিঘি খনন করিয়েছিলেন। সেটা রায়দিঘি নামে পরিচিত। এখনও সেই দিঘি রয়েছে। সরশুনার ৭ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে উত্তর মুখে হাঁটলে পাঁচ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যায় রায়দিঘি। এদিকে বেহালা চৌরাস্তা থেকে শকুন্তলা পার্ক বা ডাকঘরের দিকে গেলে বকুলতলা, ঝাউতলা ও তার পর রায়দিঘি বাসস্টপ। সেখান দিয়েই বসন্ত রায় নির্মিত সেইপ্রাচীন দিঘি রায়দিঘি যাওয়া যায়। তবে এদিক দিয়ে এভাবে বাড়ি তৈরি হয়েছে যে, রায়দিঘি দেখা যায় না।
সরশুনায় রাজধানী সরানোর ফলে বসন্ত রায়ের কিছুটা স্বস্তি মিললেও কাকা-ভাইপোর মধ্যে বস্তুগত দূরত্ব মানসিক দূরত্ব তৈরি করেছিল। এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, দু’জনে একে অপরকে পৃথিবী থেকে সরাতে চান। সরশুনার রায়গড় দুর্গে থাকতেন বসন্ত রায় এবং তিনি তাঁর বাবা বিক্রমাদিত্য রায়ের বার্ষিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতেন। সঙ্গে থাকতেন সাধারণত তাঁর পাটরানি। তিনি আবার প্রতাপাদিত্যর পালিকা মা। তিনি সেবার যশোরেই ছিলেন। প্রতাপ ও তাঁর তুতো ভাইদের মধ্যে মনোমালিন্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, স্ত্রী বসন্ত রায়কে বুঝিয়ে পাটরানিকে আমন্ত্রণ করতে নিষেধ করেন। বসন্ত রায় শুধু প্রতাপাদিত্যকে নিমন্ত্রণ জানান।
মাকে এভাবে তাচ্ছিল্য করার কারণে প্রতাপাদিত্য ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকেন। তিনি নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। নির্দিষ্ট দিনে তিনি প্রহরীবেষ্টিত হয়ে সশস্ত্র অবস্থায় রায়গড়ে আসেন। তিনি ওইদিন চরম মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। বসন্তর বড় ছেলে গোবিন্দ ভাবেন যে, প্রতাপাদিত্য তাঁদের খুন করতে এসেছেন। এটাই কাল হয়। গোবিন্দ প্রাসাদের দোতলার বারান্দা থেকে দু’টি তির ছোড়েন প্রতাপাদিত্যকে তাক করে। প্রতাপাদিত্য মারা যেতে পারতেন, কিন্তু তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। প্রতাপাদিত্য তরোয়াল বের করে সঙ্গে সঙ্গে গোবিন্দকে হত্যা করন। গোবিন্দর গর্ভবতী স্ত্রী কোথা থেকে সেখানে এসে পড়েছিলেন। প্রতাপাদিত্য তাঁকেও হত্যা করেন। প্রাসাদ রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বসন্ত শ্রাদ্ধের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বৃদ্ধ হলেও তিনি ছিলেন সাহসী যোদ্ধা। তাঁর একটি বিখ্যাত তরোয়াল ছিল। নাম গঙ্গাজল। তিনি গোবিন্দর মৃত্যুর খবর পেয়ে গঙ্গাজল (তরোয়াল) আনতে বলেন পরিচারককে। কিন্তু পরিচারক ভুল বুঝে সত্যিকারের গঙ্গাজল নিয়ে আসেন কলসিতে করে। প্রতাপাদিত্য বুঝতে পারেন যে, তরোয়াল ‘গঙ্গাজল’ আনলে বসন্ত তাঁকে খুন করতেন। তিনি বসন্তর ঘরে ঢুকে এক কোপে তাঁর শিরশ্ছেদ করেন। বসন্তর স্ত্রী ছোট ছেলে রাঘবকে বাঁচাতে তাঁকে কচুর জঙ্গলে লুকিয়ে রাখেন। তাই তাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল কচু রায়।
অনুমান, প্রতাপাদিত্য বসন্তর অন্য সন্তানদেরও হত্যা করেছিলেন। তবে তেমন জোরালো প্রমাণ নেই। এই দুঃখজনক ঘটনার সময়কাল ১৫৯০-‘৯১ সাল অর্থাৎ আকবরের সময়। প্রতাপাদিত্য সেই কাটামুণ্ড বয়ে নিয়ে যান ধুমঘাটে। তার আগে তিনি রায়গড় প্রাসাদ ও নবার্জিত অঞ্চলে তাঁর আধিকারিকদের বসিয়ে যান। কচু রায়কেও সঙ্গে নিয়ে যান।
প্রতাপাদিত্যর মা সরশুনার ঘটনা শুনে ভেঙে পড়েন। প্রতাপাদিত্য কীভাবে এই নারকীয় কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, তিনি বুঝতে পারেননি। দুঃখে, রাগে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যান। বসন্তর মাথা চিতায় চড়ানো হলে তিনি সেই আগুনে প্রবেশ করে তাঁর জীবন শেষ করেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থল রক্ষার্থে ঐতিহাসিকদের এগিয়ে আসা দরকার। এ বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিলে বাঙালির এই ঐতিহ্যমণ্ডিত স্মরণীয় স্থানের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হবে।
