কাজল মুখার্জি

হিন্দু ধর্মে দেবী সরস্বতী জ্ঞান, বিদ্যা, সংগীত, শিল্প ও বুদ্ধিমত্তার দেবী হিসাবে পূজিতা হন। তাঁর আরাধনা মূলত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচলিত হলেও সৃজনশীল ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরস্বতীকে বিদ্যার দেবী বলা হয় মূলত তাঁর বৈশিষ্ট্য, পৌরাণিক কাহিনি ও প্রতীকী গুরুত্বের কারণে।
পৌরাণিক উৎস ও দেবী সরস্বতীর পরিচয়: দেবী সরস্বতীর উল্লেখ প্রাচীন বেদ ও পুরাণে পাওয়া যায়। তিনি ব্রহ্মার মানসকন্যা এবং জ্ঞান ও সৃষ্টির শক্তি রূপে পরিচিত। ঋগ্বেদে সরস্বতী দেবীকে নদীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে। যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে তিনি বাগ্দেবী হিসাবে চিহ্নিত হন, যিনি বাক্শক্তি ও বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী। ব্রহ্মাপুরাণে সরস্বতী ব্রহ্মার সৃজনশক্তি হিসাবে আবির্ভূতা হন এবং তাঁকে জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার উৎস বলা হয়।
দেবী সরস্বতীর প্রতীকী ব্যাখ্যা: দেবী সরস্বতীর মূর্তির প্রতিটি অংশ তাঁর বিদ্যা ও জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত। শ্বেত বসন পবিত্রতা, নির্লোভ ও সত্যজ্ঞান প্রকাশ করে। বীণা সংগীত ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। এটি মানবজীবনে ভারসাম্য ও সমন্বয়ের প্রতীকও বটে। পুস্তক বেদ ও জ্ঞানের আধার। এটি শিক্ষার গুরুত্ব বোঝায়। অক্ষমালা ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক, যা জ্ঞানের গভীরতাকে প্রকাশ করে। হংস (রাজহংস) বিশুদ্ধতা ও সত্য উপলব্ধির প্রতীক।
সরস্বতী পুজোর গুরুত্ব ও তাৎপর্য: ভারতে বিশেষ করে বসন্ত পঞ্চমীতে দেবী সরস্বতীর পুজো করা হয়। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন, কারণ এই দিনে তারা লেখাপড়ার জন্য দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। শিক্ষার্থীদের জন্য দেবী সরস্বতীর পুজো নতুন জ্ঞান অর্জনের প্রতীক। শিল্পীদের জন্য সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা ও সাহিত্যচর্চাকারীদের মধ্যে দেবী সরস্বতীর বিশেষ স্থান রয়েছে। সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে ভূমিকা: হিন্দু দর্শনে সরস্বতী জ্ঞানের উৎস, যা সমাজের অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। অন্যান্য ধর্ম ও সংস্কৃতিতে সরস্বতীর প্রভাব: দেবী সরস্বতীর প্রতিচ্ছবি ভারতীয় সংস্কৃতির বাইরেও দেখা যায়। বৌদ্ধ ধর্মে তাঁকে মঞ্জুশ্রী বোধিসত্ত্বের রূপে দেখা হয়, যিনি জ্ঞান ও শিক্ষা সংরক্ষণ করেন। জাপানি সংস্কৃতিতে ‘বেনজাইতেন’ নামে তিনি জল ও জ্ঞানের দেবী হিসাবে পূজিতা হন। জৈন ধর্মে সরস্বতী জ্ঞান ও ধর্মের প্রতীক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দেবী সরস্বতী শুধু শিক্ষার দেবী নন, বরং মানবজীবনের প্রতিটি সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার প্রতীক। তাঁর পুজো ও আরাধনা জ্ঞান, বিবেক ও আত্মজাগরণের পথকে প্রশস্ত করে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিদ্যা ও জ্ঞানের গুরুত্বের কথা বোঝাতে সরস্বতীকে বিদ্যার দেবী হিসাবে মান্য করা হয়েছে।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে এ বছর (২০২৫) সরস্বতী পুজো এবং বসন্ত পঞ্চমী তিথি শুরু ২ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, সকাল ৯টা ১৪ মিনিটে এবং শেষ হবে ৩ ফেব্রুয়ারি, সোমবার, সকাল ৬টা ৫২ মিনিটে। গুপ্তপ্রেস এবং বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা অনুসারে, পঞ্চমী তিথি ২ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, বেলা ১২টা ৩৪ মিনিটে শুরু হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি, সোমবার, সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে শেষ হবে। ৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল পর্যন্ত পঞ্চমী তিথি থাকবে। ২ বা ৩ ফেব্রুয়ারি, যে কোনও একদিন সরস্বতী পুজো করা যেতে পারে পঞ্চমী তিথির সময় মেনে।
