Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সালে ভর উৎসবে তরবারির উপর সন্ন্যাসীদের শয়ন

Share Links:

শ্রীমন্ত পাঁজা

আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসাবে রাজ্যে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের নানা ধরনের উৎসব পালিত হতে দেখি। শিবের গাজন তথা চড়ক উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় সন্ন্যাসীদের ঝাঁপ দেখি। কোথাও আবার বাণফোঁড়া, খেজুর গাছে নাচ, আগুনের উপর দিয়ে হাঁটা, পিঠে বড়শির মতো বিদ্ধ করে ঝুলন্ত অবস্থায় ঘোরা, বঁটির উপর ঝাঁপ প্রভৃতি লক্ষ করা যায়।

হাওড়ার গঙ্গাধরপুরে নিজের চোখে দেখা এক রোমহর্ষক গাজনে সন্ন্যাসীদের ব্রত পালনের অগ্নিপরীক্ষা দেখলাম, যা সত্যি খুবই কষ্টকর ও কঠিনতর। অগ্নিপরীক্ষা মানে কিন্তু আগুনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া নয়। ধারালো তরবারির বিছানার উপর নিজেকে শায়িত করার এক  চরমতম কঠিন পরীক্ষা সন্ন্যাসীদের দিতে হয়। হাওড়া জেলার প্রত্যন্ত গঙ্গাধরপুর গ্রামে ধর্ম ঠাকুরের পুজো তথা ‍‘সালে ভর’ উৎসব প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বলে স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানতে পারা যায়।

এ উপলক্ষে দশ দিনব্যাপী ধর্মমন্দির প্রাঙ্গণে ধর্মমঙ্গল কাব্যের পালাগানের দলের সদস্যরা ধর্ম ঠাকুরের নামগান করেন। পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে পালাগান শুনতে ও দেখতে হাজির হন বহু ভক্ত। গ্রামবাসীর সম্মতিক্রমে জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসের কোনও এক শনিবার ধর্ম উৎসব তথা সালে ভরের আয়োজন হয়ে থাকে। ধর্ম ঠাকুরের অন্য একটি রূপ হল কুমির। তাই সন্ন্যাসী ও পূজারীরা মহাজাঁকজমক করে মন্দির প্রাঙ্গণে এক সপ্তাহব্যাপী একটি পাথর নির্মিত কুমিরের পুজোর আয়োজন করে থাকেন।

যাই হোক, এবার আসা যাক মূল সালে ভর অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে। সালে ভর শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সাল অর্থাৎ তরবারির বিষয়টি। তরোয়ালের উপর নিজের দেহ চাপানোর এক কঠিনতম পরীক্ষাই হল সালে ভর উৎসব। এই সাল তথা তরবারির বিছানা প্রস্তুত করতে লাগে দক্ষ কারিগর। বহু অভিজ্ঞ ও দক্ষ কারিগর এই সাল তৈরির কাজে যুক্ত। সাল তৈরি দেখার জন্য বহু দূর-দূরান্তের মানুষ ছুটে আসেন এখানে। প্রথমে  গাছের বাঁশ ও কলাগাছ কেটে আনা হয়। পরে কাঁটা বাঁশটি দিয়ে পাটের দড়ির সাহায্যে  মৃতদেহ বহনকারী খাটুলির মতো কাঠামো প্রস্তুত করা হয়। এবার কলাগাছটি লম্বালম্বি চিরে কামারশাল থেকে শান দিয়ে আনা ধারালো তরবারিগুলি ৬ থেকে ৭ ইঞ্চি ব্যবধানে বাঁশের উপর পাটের দড়ির সাহায্যে মইয়ের মতো করে শক্তভাবে বাঁধা হয়। এই তরবারির তৈরি মই আকৃতির বিছানার উপরেই সন্ন্যাসীরা নিজেদের শায়িত করেন। এই তরবারির তৈরি বিছানাকে সাল বলা হয়। সাল তৈরি হওয়ার পর তা ধর্মমন্দিরের প্রতিষ্ঠিত পুকুরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

সাধারণত সন্ধ্যা নাগাদ শুরু হয় ‍‘সালে ভর’ অনুষ্ঠান। বাবা ধর্মরাজের কাছে মানতকারী সন্ন্যাসীরা পুরোহিতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত পুকুরে ডুব দিয়ে প্রস্তুত হন তরবারির বিছানায় শায়িত হওয়ার জন্য। ভাসিয়ে রাখা তরবারির বিছানা পুকুর থেকে তুলে আনা হয় পাড়ে। এ দৃশ্য চাক্ষুষ করতে হাজার হাজার মানুষ উৎসুক হয়ে থাকে।  ঢাক, ঢোল ও কাঁসর বাজতে থাকে। মানতকারী সন্ন্যাসীদের পরিবার ও প্রতিবেশীরা বাবা ধর্মরাজকে তুষ্ট করতে বাজনার ছন্দে ছন্দে নিজেরাও নাচতে থাকেন। পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে মই আকৃতির তরোয়ালের তৈরি বিছানার পুজো করেন। তারপর দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানুষ সম্মিলিতভাবে সন্ন্যাসীদের ধরে তরবারির বিছানায় শায়িত করেন। এক একজন সন্ন্যাসীকে কাঁধে বহন করার জন্য চারজন করে সবল যুবক প্রতিষ্ঠিত পুকুর থেকে ডুব দিয়ে ধুতি, গেঞ্জি ও গামছা পরে প্রস্তুত হয়ে থাকেন। ধীরে ধীরে শায়িত সন্ন্যাসীর বিছানা কাঁধে নেন চারজন হৃষ্টপুষ্ট ব্যক্তি। এছাড়াও দু’জন করে বাড়তি যুবক প্রস্তুত থাকেন কোনওরকম অসুবিধা হলে তাঁরা কাঁধে নেওয়ার জন্য। তরবারির তৈরি বিছানায় নিজের দেহ চাপানো অর্থাৎ ভর দেওয়াই হল ‍সালে ভর। এ দৃশ্য দেখে অনেকের হাড়হিম হয়ে যায়। এগিয়ে চলে সন্ন্যাসীর তরবারির রথ। সন্ন্যাসীকে গরম থেকে মুক্তি দিতে তরবারির তৈরি বিছানার নীচে চলে তালপাতার তৈরি পাখায় বাতাস দেওয়া। এ দৃশ্য দেখতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এ সত্যিই রোমহর্ষক ঘটনা। অনেকেই ক্যামেরাবন্দি করতে থাকে দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া এবং পরে নিজেরা উপভোগ করার জন্য। সন্ন্যাসীকে তরবারির তৈরি বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার পর কাঁধে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দির প্রাঙ্গণে। তিনবার মন্দির প্রদক্ষিণ করার পর ধীরে ধীরে মন্দিরের নাটমঞ্চে নামিয়ে দেওয়া হয় সন্ন্যাসীকে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনা, দীর্ঘ ২০০ বছর ধরে এ কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছেন সকল সন্ন্যাসী। কোনও সন্ন্যাসীর দেহে তরবারির একটুও আঘাত লাগেনি বা রক্তপাত হয়নি। এভাবেই তরবারির উপর ২০ থেকে ২৫ জন সন্ন্যাসীর শয়নযাত্রা  চলতে থাকে। যে সন্ন্যাসীর সালে ভর কর্মকর্তাদের বেশি উৎকৃষ্ট মনে হয়, তাঁকে দেওয়া হয় বিশেষ পুরস্কার।

সালে ভর উৎসবে মন্দির প্রাঙ্গণে বসে রকমারি দোকান। জিলিপি, পাপড়, ঘুগনি, বাদাম, আইসক্রিম, ফুচকা এবং শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকে। মন্দির চত্বর ফুল ও আলোকমালায় ভরে ওঠে। ভিড় সামলানোর জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए