Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

কলকাতার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে অনন্য ইন্টার্নশিপ সাবর্ণ সংগ্রহশালায়

Share Links:

দেবর্ষি রায়চৌধুরী
সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক ও সাবর্ণ সংগ্রহশালার কিউরেটর

কলকাতার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পরিষদ এবং সাবর্ণ সংগ্রহশালা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে শহরের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলিকে কেন্দ্র করে গবেষণামূলক কাজ করানো হচ্ছে।

ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি ২০২০ অনুযায়ী, প্রতিটি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোনও সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করতে হয়, যার ন্যূনতম সময়সীমা প্রায় ৬০ ঘণ্টা। এই ভাবনা থেকেই সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ এবং সাবর্ণ সংগ্রহশালা সিদ্ধান্ত নেয় যে, এমন একটি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম শুরু করা হবে, যা শুধু কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু হবে একটি শহর— আমাদের এই কলকাতা। এই শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সারা পৃথিবীতে সুপরিচিত এবং বহুমাত্রিক। তাই কলকাতার ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাচীনত্ব, সমাজব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সময় নানা মানুষ ও সংগঠন কীভাবে এই শহরকে গড়ে তুলেছেন, সেসব বিষয়কে সামনে রেখে ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৫ সালে ‘সাবর্ণ সংগ্রহশালা ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম’ শুরু হয়েছে। বর্তমানে এই কর্মসূচির প্রথম বর্ষের ইন্টার্নশিপ চলছে। ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলবে। এরপর এপ্রিলের শেষ থেকে দ্বিতীয় সেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

এ বছর দেড়শোরও বেশি ছাত্রছাত্রী এই ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে বা করছে। এই কর্মসূচিতে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে— কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

এই ইন্টার্নশিপের অংশ হিসাবে শিক্ষার্থীদের দিয়ে কলকাতার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ধর্মীয় স্থানের ওপর গবেষণার কাজ করানো হচ্ছে— যেমন, বিখ্যাত মন্দির, গির্জা, মসজিদ এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রার্থনাস্থল। পাশাপাশি পুরোনো স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা, হেরিটেজ ওয়াক এবং সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য সম্পর্কেও তাদের কাজ করানো হচ্ছে।

এছাড়াও কলকাতার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিয়ে গবেষণার কাজ করানো হচ্ছে— যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সত্য চৌধুরী, স্বামী যোগানন্দ, উত্তম কুমার, রানি রাসমণি, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন— যেমন, মহাবোধি সোসাইটি, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ— এই সবকিছুর ইতিহাসও গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জীবনীমূলক গবেষণাও করানো হচ্ছে, যেমন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, রোনাল্ড রস, অবনীনন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী প্রমুখ।

এ সমস্ত গবেষণার মাধ্যমে কলকাতার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক দিকগুলি ছাত্রছাত্রীদের সামনে তুলে ধরাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। একইসঙ্গে এই ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে কলকাতার প্রকৃত ইতিহাস— জব চার্নক যে এর প্রতিষ্ঠাতা নয়, এটি ইংরেজদের তৈরি শহর নয়, বরং বহু শতাব্দীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ফল— এ সত্যও সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

এই কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিবার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। যেমন, রানি রাসমণির পরিবার, সত্য চৌধুরীর পরিবার, মহানায়ক উত্তম কুমারের শিল্পী সংসদের সদস্যরা। পাশাপাশি নন্দন  ঘিরে যাঁরা কাজ করেন, সেই বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরাও যুক্ত রয়েছেন এই গবেষণামূলক প্রকল্পে।

বর্তমানে মোট ৬৮ জন ছাত্রছাত্রী এই ইন্টার্নশিপ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে। তারা মূলত রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের। এই ইন্টার্নশিপের ক্লাস শুরু হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। চলবে ২৩ মার্চ পর্যন্ত। এরপর পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে এবং সফল ছাত্রছাত্রীদের সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে। আগামী সেশন এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে শুরু হবে, যা সারা বছর ধরে চলবে।

এই উদ্যোগকে বিশ্বের অন্যতম ব্যতিক্রমী ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি হিসাবে উল্লেখ করেছেন কলকাতায় জাপানের কনসাল জেনারেল ইশিকাওয়া ইয়োশিহিসা। গত বছর সাবর্ণ সংগ্রহশালায় এসে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, একটি শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের এভাবে কাজ করানোর উদ্যোগ ইউরোপ বা পশ্চিমি বিশ্বেও কল্পনার বাইরে।

এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু ইতিহাস জানা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইতিহাস সচেতনতা এবং নিজের শেকড়ের সন্ধান জাগিয়ে তোলা। আমি এই ইন্টার্নশিপে রিসোর্স পার্সন হিসাবে রয়েছি। কোর্স কো-অর্ডিনেটর হিসাবে কাজ করছেন সঞ্জয় রায়চৌধুরী ও তনিমা রায়চৌধুরী। পাশাপাশি শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা ও মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করছেন।

সব মিলিয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জীবন্ত করে তোলার এ প্রয়াস ইতিমধ্যেই এক অনন্য নজির তৈরি করেছে। আমাদের বিশ্বাস, আগামী দিনে ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে অতীতের শেকড়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করার এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए