পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোয় এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা অনেক বছর ধরে পরদার আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তাঁদের কাজের ফলাফল কখনও জাতীয় নিরাপত্তায়, কখনও রাজনৈতিক সমঝোতায়, আবার কখনও সাংবিধানিক পদে উঠে আসে। আর এন রবি সে ধরনেরই এক প্রশাসক, যাঁর কর্মজীবন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত রাজ্যপালের আসনে পৌঁছেছে। গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, নিরাপত্তা কূটনীতি এবং সাংবিধানিক প্রশাসন— এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ অধ্যায়। ১২ মার্চ তিনিই পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
রবি ১৯৫২ সালের ৩ এপ্রিল বিহারের একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় ভারতীয় সমাজের পরিবর্তন, রাজনীতির উত্থান-পতন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মধ্যে তাঁর শৈশব কেটেছে। ছাত্রজীবনে তিনি মেধাবী ও বিশ্লেষণধর্মী ছিলেন। বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কাজ করা। সে লক্ষ্য নিয়েই তিনি কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নেন এবং শেষ পর্যন্ত ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসে নির্বাচিত হন।
রবি ১৯৭৬ সালে ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস (IPS)-এ যোগ দেন। তাঁর ক্যাডার ছিল কেরালা। কেরালায় কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি পুলিশ প্রশাসনের নানা দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন— আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সামাজিক সমস্যার মোকাবিলা। সে সময়েই তাঁর বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং গোয়েন্দা কাজে দক্ষতা প্রশাসনের নজরে আসে। ফলে খুব দ্রুতই তাঁকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোয় নিয়ে যাওয়া হয়।
ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোয় কাজ করা মানে দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নানা জটিল দিক নিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। আর এন রবি দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নিয়ে কাজ করেন। এই অঞ্চলটি ভারতের জন্য সব সময়ই সংবেদনশীল। নানা জাতিগত আন্দোলন, সীমান্ত সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গোয়েন্দা বিশ্লেষক হিসাবে রবি এই সমস্যাগুলির গভীর পর্যবেক্ষণ করেন এবং নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পর রবিকে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে তিনি ভারতের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসার হিসাবে নিযুক্ত হন। তখন তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে কাজ করেন। এই পদে তাঁর কাজ ছিল নিরাপত্তা নীতি বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল নাগা বিদ্রোহ। বহু দশক ধরে এই আন্দোলন চলেছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ছিল সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় সরকার আর এন রবিকে নাগা শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসাবে নিযুক্ত করে। সেই আলোচনার লক্ষ্য ছিল বিদ্রোহী সংগঠনগুলির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি করা এবং দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটানো। আলোচনা প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। বহুবার মতভেদ দেখা দিয়েছে। তবু প্রশাসনিক দক্ষতা এবং কঠোর অবস্থানের জন্য তিনি আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।
২০১৯ সালে রবিকে নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল নিযুক্ত করা হয়। সেখানে তাঁর দায়িত্ব ছিল দ্বিমুখী— একদিকে সাংবিধানিক প্রশাসন পরিচালনা করা, অন্যদিকে শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া। তারপর ২০২১ সালে তাঁকে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল করা হয়। দক্ষিণ ভারতের ওই গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে তাঁর ভূমিকা দ্রুত জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসে। সেখানে তাঁর সঙ্গে রাজ্য সরকারের সম্পর্ক একাধিকবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ দেখা যায়। বিধানসভায় সরকারের ভাষণ পড়তে অস্বীকার করা, কিছু বিল অনুমোদনে বিলম্ব এবং রাজ্যের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মন্তব্য— এসব ঘটনায় রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। রাজ্যের শাসক দল অভিযোগ করে যে, তিনি সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করছেন। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকরা বলেন, তিনি সংবিধানের রক্ষক হিসাবে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন।
আর এন রবির প্রশাসনিক চিন্তাধারা মূলত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, রাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর প্রশাসন গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করে। তাঁর বক্তৃতা ও লেখালেখিতে প্রায়ই দেখা যায় জাতীয় ঐক্য, নিরাপত্তা এবং সাংবিধানিক কাঠামোর গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া।
আর এন রবির ব্যক্তিত্ব নিয়ে মতভেদ সব সময়ই ছিল। একদল মানুষ তাঁকে কঠোর, কিন্তু দক্ষ প্রশাসক হিসাবে দেখেন। তাঁদের মতে, তিনি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নীতিতে স্পষ্ট অবস্থান নেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বিতর্ককে বাড়িয়ে দেয়। এই দ্বৈত মূল্যায়নই তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
গোয়েন্দা সংস্থার অদৃশ্য জগৎ থেকে রাজ্যপালের দৃশ্যমান রাজনৈতিক পরিসর— আর এন রবির যাত্রা ভারতীয় প্রশাসনের এক বিশেষ অধ্যায়। তিনি একইসঙ্গে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নীতি বিশ্লেষক এবং সাংবিধানিক প্রশাসক। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন দেখায়, ভারতের মতো বহুমাত্রিক গণতন্ত্রে প্রশাসনের ভূমিকা শুধু আইন প্রয়োগ নয়, কখনও তা রাজনৈতিক সমঝোতা, কখনও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আবার কখনও সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার মধ্যেই প্রকাশ পায়। আর সে কারণেই তিনি আজও ভারতীয় প্রশাসনের এক আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম।
